৫ টাকায় ঈদ বাজারে অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাল ‘সহায়’

ক্রাচে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন ৭৫ বছর বয়সী সাহেরা বেগম। পাশে তার ছোট্ট নাতনি সাদিয়া এক হাতে দাদীর ক্রাচ, আরেক হাতে শক্ত করে ধরা দাদীর শাড়ির আচল। বয়সের ভার আর শরীরের অক্ষমতা যেন প্রতিটি পা ফেলাকেই কঠিন করে তুলেছে। তবুও থামেননি তিনি। কারণ সামনে ঈদ আর সেই ঈদের আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে চান না সাহেরা বেগম।
বিজ্ঞাপন
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে (বড় মাঠ) পৌঁছে যখন তার হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি মুরগি, এক কেজি চিনি, এক কেজি পোলাওয়ের চাল, আধা লিটার সয়াবিন তেল, সেমাই, দুধ, পেঁয়াজ ও আলু মাত্র ৫ টাকার বিনিময়ে, তখন যেন তার মুখে ফুটে ওঠে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। দন্তহীন সেই মুখের হাসি ছিল নির্মল, কৃতজ্ঞতায় ভরা। চোখের কোণেও চিকচিক করছিল আনন্দের অশ্রু।
বৃদ্ধা সাহেরা বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাবা এই বয়সে আর কিছু করার শক্তি নাই। কষ্টে দিন চলে। ঈদ আসলে মন খারাপ হয় কিছুই কিনতে পারি না। ছেলে-মেয়ে নাই। একা চলতেও পারি না। পাশের বাড়ির ছোট নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে আসছি বলেই আজ এই বাজার পাইছি। এবার আমার ইদ মনে হচ্ছে।
শুধু সাহেরা বেগমই নন, তার মতো শত শত অসহায়, দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষ ভিড় করেছেন এই মাঠে। কেউ লাঠিতে ভর দিয়ে, কেউ সন্তানকে নিয়ে, আবার কেউবা একাই হেঁটে এসেছেন। সবার চোখে একই প্রত্যাশা ঈদের আগে একটু স্বস্তি, একটু হাসি।
বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) দুপুরে আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সহায়’ প্রায় সাড়ে তিনশত অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের মাঝে প্রতীকী মূল্যে মাত্র ৫ টাকায় এই ঈদ বাজার বিতরণ করে।
বাজার নিতে আসা মাজেদা বেওয়া বলেন, আমাদের মতো মানুষের জন্য ঈদ মানেই চিন্তা। কীভাবে বাচ্চাদের কিছু দেব, সেই ভাবনা থাকে। কিন্তু আজকে এই সহায়তা পেয়ে অনেকটা দুশ্চিন্তা কমে গেছে।
বৃদ্ধ রমজান আলী বলেন, সারাদিন রিকশা চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলে। ভালো-মন্দ খাওয়াই হয় না। ঈদ নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলাম কীভাবে করব। শরীরও আগের মতো নেই। আজ সহায় সংগঠনের পক্ষ থেকে ৫ টাকার বিনিময়ে সেমাই, চিনি, মুরগি আরও অনেক কিছু পাইছি। এখন আর চিন্তা নাই, একটু স্বস্তি লাগতেছে।
বিজ্ঞাপন
সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৮ সালে জুলুম বস্তি নামে এই সংগঠনটির যাত্রা শুরু। স্থানীয় বেশ কয়েকজন যুবক সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করে। এরপর তেমন কোন কার্যক্রম না থাকলেও ২০২১ সালে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সময় মানুষ যখন ঘরবন্দী ছিল, তখন সাধারণ মানুষদের সুবিধার্থে স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্যের দোকান দেয় এই সংগঠনটির সদস্যরা। শুধু বাজার নয়, করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে অক্সিজেন সিলিন্ডার, পুষ্টিকর খাদ্য দিয়েও সহায়তা করেন তারা। পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সহায়’। সেই সময় থেকেই প্রতি বছর ঈদ ও শীত মৌসুমে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আসছে সংগঠনটি।
সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবক আলী আকবর জানান, আমরা চেয়েছি মানুষ যেন সাহায্য নিতে এসে ছোট মনে না করে। তাই প্রতীকীভাবে ৫ টাকা রাখা হয়েছে, যাতে তারা সম্মানের সঙ্গে বাজারটা নিতে পারেন, দানের অনুভূতি না হয়।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আরাফাত হোসেন সাগর ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের কাছে ঈদ মানে শুধু উৎসব নয়, এটা ভাগাভাগির সময়। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা সারা বছর সংগ্রাম করে বেঁচে থাকেন, কিন্তু ঈদের দিনটাতেও স্বস্তি পান না। আমরা চেয়েছি, অন্তত সেই দিনটায় তাদের মুখে একটু হাসি ফুটুক। তাদের ঘরেও যেন ঈদের আনন্দের আলো জ্বলে। সামর্থ্য সীমিত, তবুও চেষ্টা করছি মানুষের পাশে থাকার এই দায়বদ্ধতা থেকেই আমাদের পথচলা।
তবে সাহেরা বেগমদের মতো অনেকেই বাজার নিয়ে মাঠ থেকে বের হওয়ার সময় বারবার ফিরে তাকাচ্ছিলেন স্বেচ্ছাসেবীদের দিকে। হয়তো নীরবে দোয়া করছিলেন এই মানুষগুলোর জন্য, যারা তাদের মতো অসহায় মানুষের ঈদে একটু হলেও সুখের রং ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন।
অনুষ্ঠানে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খাইরুল ইসলাম, সদর থানার ওসি মনির হোসেন, জেলা বিএনপির অর্থ বিষয়ক সম্পাদক শরিফুল ইসলাম শরিফ, সহায় সংগঠনের উপদেষ্টা ডা. শুভেন্দ্রু কুমার দেবনাথ, আহমেদুর রহমান কাজল, সভাপতি ফখরুল আলম লিফাতসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
রেদওয়ান মিলন/এসএইচএ