রংপুরে চিড়িয়াখানাসহ বিনোদন কেন্দ্রে উপচে পড়া ভিড়

ঈদের আমেজে রংপুরের বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ভিড় জমিয়েছেন উৎসবপ্রিয় মানুষ। ঈদের দিনের মতো দ্বিতীয় দিনেও দুপুর গড়াতেই দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায় রংপুর চিড়িয়াখানায়। রোববার (২২ মার্চ) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রংপুর চিড়িয়াখানার প্রধান ফটকে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ লাইন ছিল। সেখানে পরিবার-পরিজন, বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে আসা মানুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
বিজ্ঞাপন
আবহাওয়া কিছুটা ঠান্ডা আর নির্মল-স্নিগ্ধ পরিবেশ থাকায় আনন্দে মেতেছে শিশু-কিশোররা। বাদ নেই তরুণ থেকে শুরু করে বয়স্করাও। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখা গেছে জেলার দর্শনীয় স্থান, পার্ক ও অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্রগুলোতেও।
ছোট-বড় সব বয়সী মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে রঙিন হয়ে উঠছে ঈদ উৎসব। দু-একটিতে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ থাকলেও বাকি বিনোদন কেন্দ্র ও পার্কে গুনতে হচ্ছে দর্শনীর বিনিময়।
রংপুর চিড়িয়াখানায় প্রবেশের পর এক খাঁচা থেকে আরেক খাঁচায় হেঁটে দর্শনার্থীরা বিভিন্ন পশু-পাখি দেখছেন। আর বড়রা তাদের শিশুসন্তানকে বিভিন্ন পশুপাখির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। যেন ঘুরতে এসে দ্বিগুণ হয়েছে ঈদের আনন্দ। আর দীর্ঘ কর্মব্যস্ততার পর চিড়িয়াখানার এই উন্মুক্ত পরিবেশ নগরবাসীর মনে অন্যরকম প্রশান্তি।
বিজ্ঞাপন
সরেজমিনে দেখা যায়, বাঘ, হরিণ, বানর, বক পাখি আর কুমিরে মজেছে শিশুরা।
বেশি ভিড় লক্ষ্য করা গেছে বানর, জেব্রা, বাঘ ও সিংহের খাঁচার সামনে। বানরের ভেংচি কাটা আর লাফালাফি দেখতে বানরের খাঁচার সামনেও ছিল দর্শনার্থীর ভিড়। এ ছাড়াও কুমির, ঘড়িয়াল, জলহস্তি, ঘোড়া, হনুমান, গাধা, ভাল্লুক, হরিণ, ময়ূর, উটপাখিসহ চিড়িয়াখানার সবগুলো খাঁচার সামনেই ছিল জটলা।
সুন্দরবনের বেঙ্গল টাইগার, সিংহ, গন্ডার, জলহস্তি, হরিণ, বানর, চিতাবাঘ, ভালুক, কুমির, অজগর, কচ্ছপ প্রভৃতিও রয়েছে এখানে। পাখির মধ্যে রয়েছে ময়না, টিয়া, ময়ূর, কাকাতুয়া, কবুতর, বক ইত্যাদি।
চিড়িয়াখানার ভেতরে অর্ধশতাধিক রাইডের সমাহার নিয়ে রয়েছে আলাদা শিশুপার্ক। আরও রয়েছে ভূতের গুহা। রয়েছে কৃত্রিম হ্রদ। কয়েক বছর থেকে শিশুপার্কের পরিধি বাড়ায় টিকিট নিয়ে প্রবেশ করতে লম্বা লাইন দেখা গেছে। পার্কের ভেতরে দলবদ্ধভাবে শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষকে ঘুরতে দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন

সেখানকার রাইডগুলো ব্যবহারে টিকেট কাটতেও ছিল ভিড় আর ভিড়। যার কারণে অনেকেই পছন্দের রাইডগুলো উঠতে পারেননি। গতবারের মতো এবারও বাড়তি আনন্দ যোগ করেছে রোস্টারে। সেইসঙ্গে গ্রামীণ চিত্রের অবয়ব ছবি তোলা আর আড্ডা দেওয়া সব মিলিয়ে আনন্দ বেড়েছে কয়েকগুণ। ভয় আর রোমাঞ্চের জন্য ভূতের ঘর-সংসার রয়েছে। যেখানে অনেকের প্রবেশে ভয় কাজ করলেও ভালোই শিহরণ জাগায় বলে জানিয়েছে একাধিক শিশু-কিশোর।
দর্শনার্থীরা বলছেন, দীর্ঘ ছুটিতে শিশুদের প্রকৃতি ও কোলাহল পরিবেশে বিনোদনের পাশাপাশি নিজেদের মানসিক সজীবতাও মিলছে ঘুরতে এসে। শঙ্কা নেই নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে আসা আতিক হাসান বলেন, ঈদের দিন দুপুর থেকে আকাশ কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন এবং মাঝেমধ্যে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ছিল। এ কারণে বাহিরে ঘুরতে যাইনি। আজও নির্মল বাতাস বইছে, চারপাশ শান্ত-স্নিগ্ধ, এ কারণে আমরা বের হলাম। টিকিট নেওয়া থেকে শুরু করে সবখানেই ভিড়। চিড়িয়াখানাতেও একই অবস্থা। এত বেশি মানুষ, কোথাও স্বস্তিতে চলাফেরাও করা যাচ্ছে না।
বাঘের খাচার সামনে কথা হয় কুড়িগ্রামের উলিপুর থেকে আসা মজিদুল ইসলামের সাথে। তিনি পুরো পরিবার নিয়ে এসেছেন রংপুর চিড়িয়াখানায়। ছোট বাচ্চাদের হাত ধরে ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছেন খাঁচাবন্দি একেকটি প্রাণিকে।
মজিদুল ইসলাম বলেন, বাচ্চাদের জন্যই এতদূর থেকে এখানে আসা। ঈদের এই সময়টা আনন্দময় করতে এটুকুতো করতেই হবে। বাচ্চারা বাঘ, বানর আর জলহস্তী দেখে খুবই আনন্দ পেয়েছে।
এদিকে ধর্ম যার যার উৎসব সবার, এমন প্রত্যাশায় ঈদের এই আনন্দে সামিল হয়েছে অন্য ধর্মের মানুষও। সামাজিক সম্প্রীতি ধরে রেখে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা তাদেরও।
নগরীর গোমস্তাপাড়া থেকে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আসা জীবন ঘোষ বলেন, ঈদে সবাই মিলে ঘুরতে আসার মজাই আলাদা। আকাশ মেঘলা থাকলেও পরিবেশটা বেশ উপভোগ্য। ঈদ-পূজা দুটোতেই আমরা এভাবে ঘুরে বেড়াই, আনন্দ করি। আমাদের মতো অনেকেই এসেছে পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে। উৎসব তো ধর্ম-বর্ণ দেখে হয় না, এটা মনের প্রশান্তির ব্যাপার।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, এবারের ঈদে দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ বাঘ দম্পতি রোমিও-জুলিয়েটের কোলজুড়ে আসা দুই সন্তান রাজা ও রানি। ছয় মাস বয়সী এই দুই শাবককে দেখার বিশেষ আগ্রহ ছিল দর্শনার্থীদের। বিশেষ করে শিশুদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। খাঁচার ভেতরে বানরের বাঁদরামি আর হরিণের ছোটাছুটি দেখে খুদে দর্শনার্থীরা মেতে ওঠে আনন্দে।
বিভাগীয় নগরী রংপুরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত রংপুর চিড়িয়াখানা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং উত্তরবঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে বড় চিড়িয়াখানা। চিড়িয়াখানাটি ২২ একর এলাকাজুড়ে রয়েছে।
রংপুর চিড়িয়াখানার ইজারাদার হযরত আলী জানান, ঈদ উপলক্ষ্যে দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি পানি পান ও নামাজের ব্যবস্থা এবং বিশ্রামের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত আসন। নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে পুলিশ সার্বক্ষণিক রয়েছে। তা ছাড়া পুরো চিড়িয়াখানা সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত।

এদিকে রংপুর চিড়িয়াখানা ছাড়াও তাজহাট জমিদার বাড়ি ও জাদুঘর, রূপকথা থিম পার্ক, চিকলি ওয়াটার পার্ক, প্রয়াস বিনোদন পার্ক, সিটি চিকলি বিনোদন পার্ক, আনান সিটি পার্ক, গঞ্জিপুরে ভিন্নজগত, পীরগঞ্জে আনন্দনগর ও কাউনিয়ায় তিস্তা পার্কসহ আশপাশের জনপ্রিয় কেন্দ্রগুলোতেও ঘুরতে বেরিয়েছেন দর্শনার্থীরা। এসব বিনোদন কেন্দ্রে প্রবেশ পথে গুনতে হচ্ছে শুভেচ্ছা মূল্য।
এছাড়াও উন্মুক্ত বিনোদন স্পট কালেক্টরেট সুরভি উদ্যান, পুলিশ পার্ক, টাউন হল চত্বর, কাউনিয়া তিস্তা রেলওয়ে সেতু, গঙ্গাচড়া মহিপুর তিস্তা সড়ক সেতু পয়েন্টেও উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এসব জায়গায় ছোট ছোট পরিসরে নিজেদের মধ্যে গান, গল্পে মেতে উঠেছেন সবাই। বেশ আনন্দ করছে শিশুরা। পরিবার, বন্ধু আর প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে মেতে উঠেছেন হাজারো মানুষ। কেউ প্রিয়জনদের সঙ্গে ছবি তুলছেন, আবার কেউ নিছক সময় কাটাচ্ছেন।
এদিকে বিনোদনপ্রেমীদের একটা অংশকে দেখা গেছে সিনেমা হলগুলোতেও। রংপুর নগরীর শাপলা টকিজ ও আকাশ সিনেমা হলে ঈদ উপলক্ষ্যে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র ঘিরে সিনেমাপ্রেমীদের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। সব মিলিয়ে, কর্মব্যস্ত জীবনের বাইরে এসে ঈদের ছুটিতে মানুষ খুঁজছে স্বস্তি, আনন্দ আর একটু নির্ভার সময়। পরিবার আর প্রিয়জনদের সঙ্গে এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই হয়ে উঠছে ঈদের আসল আনন্দ।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরএআর