উৎসবের সামষ্টিক অর্থনীতি

ঈদ কেবল মুসলিম জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবই নয়, এই উপলক্ষে অর্থনীতিতে সরবে ও নীরবে পরিচালিত হয় বিশাল কর্মকাণ্ড, যার সঠিক ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান কখনোই পাওয়া যায় না। উন্নত বিশ্বের সংগঠিত বাজার ব্যবস্থায় এই পরিসংখ্যান পাওয়া সম্ভব হলেও আমাদের দেশের অসংগঠিত নগদ-নির্ভর বাজারে সেটি কেবল দুরূহই নয়, অসম্ভবও বটে। তারপরও কিছু বিশেষ কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিলে মোটামুটি ধারণা পাওয়া সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে বিস্তৃত প্রভাবটি পড়ে ভোগ্যপণ্যের বাজারে, আর এটি কেবল ঈদকে কেন্দ্র করেই নয়, এটা শুরু হয় রোজার শুরু থেকে, যা চলতে থাকে পুরো মাসজুড়ে। সুতরাং ঈদকে উপলক্ষ করে যে বাজার, সেটি আবর্তিত হয় রোজার শুরু থেকেই। মুসলিম জনগোষ্ঠী সকালের নাশতা ও দুপুরের খাবার পরিহার করে বটে, কিন্তু সেহরি ও ইফতারের আয়োজন ও খরচ এই দুই বেলার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হয়।
সুতরাং রোজার পুরো মাসজুড়ে তেল, চিনি, গুড়, ছোলা, মুড়ি, ডাল, মসলা, নারকেল, লেবু, শসাসহ বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিজাত পণ্যের ভোগ ও বিক্রি যে হারে বেড়ে যায়, তা বাকি এগার মাসের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। কেবল রোজার সঙ্গে সম্পর্কিত পণ্যই নয়, ঈদ উপলক্ষে বাজার বিস্তৃত হয় সেমাই, নুডলস, মিষ্টি, পিঠা, চিনি, দুধ, মাংস-ইত্যাদি খাদ্যপণ্যেরও।
তবে ঈদকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় বাজারটি হয় পোশাকের। ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষই ঈদ উপলক্ষে সাধ্যমতো একটা নতুন পোশাক কেনার চেষ্টা করে। পায়জামা, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, শাড়ি, লুঙ্গি ও টুপি, শার্ট-এসবের বাজারে থাকে বছরের সবচেয়ে বেশি চাহিদা। কেবল নতুন পোশাকই নয় জুতা, গয়না, প্রসাধনী সমাগ্রীর বাজারের বিক্রিও থাকে তুঙ্গে।
বিজ্ঞাপন
ঈদে চাকরিজীবীদের হাতে বোনাসের টাকা আসে বলে এসময় চাঙা হয়ে ওঠে ফার্নিচার, ফ্রিজ, টিভি, কম্পিউটার, মুঠোফোনসহ নানা ইলেকট্রনিক সামগ্রীর বাজারও। এতগুলো খাতের বাজারে যখন বিশাল চাহিদা সৃষ্টি হয়, তার একটা বিরাট প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে, যা ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য খাতেও।
আমরা জানি, অর্থনীতির ভাষায় চাহিদা বলতে কোনো কিছু পাওয়ার জন্য নিছক আকাঙ্ক্ষাকে বোঝায় না। কোনো পণ্যের চাহিদা হিসেবে গণ্য হওয়ার জন্য তিনটি প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হতে হয়। শর্তগুলো হচ্ছে—পণ্যটি কেনার প্রবল ইচ্ছা, কেনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ তথা সামর্থ্য এবং পণ্যটি কেনার জন্য সেই অর্থ ব্যয় করার সদিচ্ছা।
অর্থাৎ একজন কৃপণের হাতে টাকা থাকলেও পছন্দের পণ্যটি তিনি হয়তো কেনেন না, সুতরাং সেই বস্তুটি পাওয়ার ইচ্ছেকে তার চাহিদা বলা যাবে না। একইভাবে একজন নিম্ন-মধ্যবিত্তের একটা গাড়ির খুব দরকার, কিন্তু এটাকেও তার চাহিদা বলা যাবে না, কারণ গাড়ি কেনার সামর্থ্য তার নেই। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, এই তিনটি শর্ত পূরণ হয় বলেই ঈদের বাজারে প্রবল চাহিদা সৃষ্টি হয়।
বিজ্ঞাপন
ঈদ উৎসবে বিশেষ প্রণোদনা আসে মূলত ছোট ও মাঝারি শিল্পখাতে। রোজা ও ঈদ উপলক্ষে ওপরের পণ্যগুলোর বেশিরভাগই উৎপাদন করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান। ফলে স্থানীয় কারিগরদের জন্য ঈদ উৎসব হয়ে পড়ে তাদের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। এতে তাদের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রচারও ঘটে, একই সঙ্গে বেড়ে যায় স্থানীয় অর্থনৈতিক তৎপরতা। পণ্যোৎপাদনের কাঁচামাল সরবরাহ থেকে শুরু করে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত কর্মী, শ্রমিক, সরবরাহকারী, পরিবহনকারীসহ সব মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি ঘটে।
সরকারি ও বেসরকারি সব দপ্তর, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ঈদ উপলক্ষে উৎসব বোনাস দেয়। এই বাড়তি এককালীন আয়বৃদ্ধির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার সুবাদে বাড়তি কেনাকাটা থেকে শুরু করে ভ্রমণের মতো চিত্তবিনোদনের সুযোগও সৃষ্টি হয়। ফলে অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই একটা চাঙাভাব পরিলক্ষিত হয়।
ঈদ ও রোজার প্রসারিত বাজারকে কেন্দ্র করে যে কেবল মৌসুমি চাহিদার কারণে বাড়তি উৎপাদন হয়, তা নয়, এসময় শিল্প, সরবরাহ ব্যবস্থা, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পর্যটন খাতে অস্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়। ফলে একটিমাত্র খাতকে ঘিরে শুরু হয় ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের একটা বাড়তি তৎপরতা।
রোজা ও ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে সরবরাহ ব্যবস্থায় শুরু হয় এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। বাজারের বাড়তি চাহিদাকে সামাল দেওয়ার জন্য গড়ে তোলা হয় পর্যাপ্ত মজুত (প্রতিবছর রোজা শুরু হওয়ার আগে থেকেই রমজান মাসজুড়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারি উদ্যোগের কথা স্মরণ করা যায়), যাতে চাহিদার তুঙ্গ মুহূর্তেও সরবরাহ ব্যবস্থা অটুট থাকে। এই প্রক্রিয়াতেও অর্থনীতিতে সৃষ্টি হয় বাড়তি প্রণোদনা।
রোজার পুরো মাসজুড়ে তেল, চিনি, গুড়, ছোলা, মুড়ি, ডাল, মসলা, নারকেল, লেবু, শসাসহ বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিজাত পণ্যের ভোগ ও বিক্রি যে হারে বেড়ে যায়, তা বাকি এগার মাসের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। কেবল রোজার সঙ্গে সম্পর্কিত পণ্যই নয়, ঈদ উপলক্ষে বাজার বিস্তৃত হয় সেমাই, নুডলস, মিষ্টি, পিঠা, চিনি, দুধ, মাংস-ইত্যাদি খাদ্যপণ্যেরও।
বাজারের এমন বাড়তি চাহিদা মেটানোর জন্য চাঙা হয় নগদ লেনদেনের পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেন ও ই-কমার্স কার্যক্রম, যা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় সৃষ্টি করে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের তিনটি প্রধান মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ঈদের আগের সপ্তাহে দৈনিক গড় লেনদেন হয়েছিল ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।
ঈদ উপলক্ষে প্রবাসীদের স্বজনদের জন্য পাঠানো বাড়তি টাকার কারণে একদিকে যেমন বেড়ে যায় রেমিট্যান্স প্রবাহ, তেমনি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে সৃষ্টি করে বাড়তি চাহিদা। একই সঙ্গে দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে বাড়তি রেমিট্যান্স।
চলতি বছরের ঈদ মৌসুমের হিসাব এখনো পাওয়া না গেলেও ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান থেকে ঈদ উপলক্ষে এই বাড়তি রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সে বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি, দুই মাসেই রেমিট্যান্স এসেছিল ২১০ কোটি ডলার করে। মার্চে (ঈদের মাস) এই পরিমাণ দাঁড়ায় ৩২৯ কোটি ডলারে। অর্থাৎ কেবল ঈদকে সামনে ঈদ উপলক্ষে বাড়তি রেমিট্যান্স এসেছিল ১১৯ কোটি ডলার। এই বাড়তি রেমিট্যান্সের প্রায় পুরোটাই সঞ্চালিত হয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে, যার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া সহজেই অনুমেয়।
ঈদ উৎসবকে উপলক্ষ করে স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকা ছেড়ে যান। যেমন ২০২৩ সালে মোবাইল ফোনের সিমকার্ড ব্যবহারকারীদের গমনাগমনের তথ্য অনুযায়ী, সেবার ঈদুল ফিতরের ছুটিতে পাঁচ দিনে এক কোটির বেশি মানুষ ঢাকা ছেড়েছিলেন। একই সময় ঢাকায় ঢুকেছিলেন ২৮ লাখের মতো মানুষ। তাদের সঙ্গে মোবাইল ফোন না থাকা পরিবারের সদস্যদের কোনো হিসাব পাওয়া সম্ভব হয়নি।
একই সূত্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫ সালের ঈদের ছুটির সাত দিনে ঢাকা ছেড়েছিলেন ১ কোটি ৭ লাখ মানুষ। বিপরীতে ঢাকায় এসেছেন ৪৪ লাখ। এই সংখ্যার সঙ্গে মুঠোফোন ব্যবহার করেন না, পরিবারের এমন সদস্য সংখ্যা যদি গড়ে দুজন করেও হয়, তাহলে মোট সংখ্যা হবে প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ। সুতরাং এই বিশাল জনগোষ্ঠীর যাতায়াতের কারণে কেবল পরিবহন খাতে কী বিশাল কর্মচাঞ্চল্য ও আর্থিক লেনদেন ঘটে, সেটা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না।
আরও পড়ুন
রোজা ও ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে বর্ধিত বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সরাসরি প্রভাব পড়ে সরকারি রাজস্ব আদায়ের ওপর। এসময় ভ্যাট ও অন্যান্য শুল্ক ও কর আদায় বৃদ্ধি পায়, যার প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী হয় জাতীয় অর্থনীতি। ফলে এই সাংবৎসরিক কর্মকাণ্ড ও আয়োজন হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম এক চালিকাশক্তি।
দেশ ও অর্থনীতির প্রতিটি খাতে যে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তার একটা অতিসরলীকৃত হিসাব অনুমান করা যায়। ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশের সাড়ে সতের কোটি জনসংখ্যার প্রত্যেকেই যদি মাথাপিছু গড়ে এক হাজার টাকাও খরচ করে, তাহলে বাজারে সঞ্চালিত হবে মোট পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা। কিন্তু আমরা জানি মাথাপিছু গড় খরচ আরও বেশি হয়। কারণ বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালে তাদের মোট বিক্রির পরিমাণ ছিল দুই লাখ কোটি টাকা।
ওপরের আলোচনা, হিসাব ও পরিসংখ্যান সীমাবদ্ধ ছিল কেবল রোজা ও ঈদুল ফিতরের অর্থনৈতিক প্রভাবের মধ্যে। উৎসবের অর্থনীতির হিসাব করতে হলে মুসলিমদের ঈদুল আজহা, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজা এবং সর্বজনীন উৎসব বাংলা নববর্ষকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
ধারণা করা হয়, ঈদুল আজহাকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে কমপক্ষে এক লাখ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটে। এই কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হয় গরুর খামার, পোশাক বিপণী, ঘরমুখো মানুষ এবং পশু পরিবহন, গবাদি পশুর হাট, দা, ছুরি, চাপাতির মতো কোরবানির সরঞ্জাম, মসলা-পাতি, ভোজ্য তেল, আটা ময়দা, চালের বাজার পর্যন্ত।
২০২৫ সালের হিসাবে দেখা গেছে, সে বছর ঈদে কোরবানির জন্য দেশে গরু-মহিষ, ছাগল ও ভেড়া মিলিয়ে মজুত পশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ। সে হিসাবে কেবল পশু বিক্রিতেই লেনদেন হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা। পশু পালন খাতে খামারি, পশু খাদ্য বিক্রেতা, প্রাণী চিকিৎসক, পরিবহন শ্রমিক, হাটের ইজারাদার কর্মী ও শ্রমিক মিলিয়ে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল প্রায় ৮০ লাখ মানুষ। তাদের আয়টা যুক্ত হয়েছে জিডিপিতে।
একটা গরুকে কোরবানির উপযুক্ত করার জন্য মাসে খরচ হয় প্রায় ৪-৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। সুতরাং কোরবানির ঈদের আগে পশুখাদ্য ও পরিচর্যা, ভেটেরিনারি ওষুধ কোম্পানি, খামারের নানান উপকরণ, পরিবহন শ্রমিকের মাধ্যমে একটা বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। এই উপলক্ষে চামড়া শিল্পে গড়ে ওঠে কমপক্ষে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বাজার। মৌসুমি কর্মসংস্থানও হয় বিপুল মানুষের।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষকে ঘিরে ঠিক কী পরিমাণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। তারপরও অর্থনীতিবিদদের ধারণা এই অর্থনীতির আকার আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। গ্রাম-বাংলার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বৈশাখী মেলা উপলক্ষে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাত চাঙা হয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এনে দেয় নতুন জোয়ার। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোতে বৈশাখী বোনাস বা নববর্ষ ভাতা অন্তর্ভুক্ত রাখার কারণে আসবাব, তৈজসপত্র, ছোটদের খেলনা, প্রসাধন সামগ্রী এবং সর্বোপরি পোশাকের বাজারে তৈরি হয় নতুন চাহিদা।
একইভাবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজাতেও চাঙা হয়ে ওঠে পোশাক ও আনুষঙ্গিক পণ্যের বাজার। সারা দেশে প্রায় ৩৩ হাজার মণ্ডপকে ঘিরে কয়েক মাস আগে থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। প্রতিমা গড়া, মণ্ডপের সাজসজ্জা, অলঙ্করণ ও নকশা, আলোকসজ্জা, প্রসাদ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা-এসব কাজে যুক্ত হয় অসংখ্য মানুষ-কারিগর, শ্রমিক ও স্বেচ্ছাসেবক, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান। ফলে এই কর্মকাণ্ডে যুক্ত সবারই বাড়তি রোজগারের সুযোগ ঘটে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুর্গাপূজাকে ঘিরে আমাদের অর্থনীতির আকার আনুমানিক সাড়ে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা।
বছরব্যাপী এই উৎসবগুলো ঘিরে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তার প্রভাবের মাত্রা অনুমান করা যায় অর্থের গতিশীলতার ভেতর দিয়ে, অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় অর্থের গতিবেগ বা Velocity of Money। কোনো একটি অর্থনীতিতে যে হারে টাকা হাতবদল হয়, সেটাই হচ্ছে সেই অর্থের গতিবেগ।
কোনো নির্দিষ্ট সময়কালের মধ্যে একই অর্থ মোট কতজনের কাছে কিংবা কতবার যাচ্ছে, সেটাই হিসাব করা হয় এই মানদণ্ড দিয়ে। এই হাতবদল হওয়ার কাজটি ঘটে মূলত খরচ করার মাধ্যমেই, তাই এই হিসাব দিয়ে বোঝা যায়, দেশের মানুষ মোট কী পরিমাণ অর্থ খরচ করছে।
উচ্চ গতিবেগ থাকলে অর্থের তারল্যও বেশি থাকে, যার কারণে বেশি কেনাবেচা ও দ্রুত লেনদেন সংঘটিত হয়। অর্থের এই হাতবদল হওয়াকে আরও দ্রুতগতি দেয় ডিজিটাল লেনদেন ও ই-কমার্স সুবিধা।
ধরা যাক, একটা অর্থনীতিতে শুধু দুইজন মানুষ বসবাস করেন। একজন গাড়ি-বিক্রেতা রাম এবং আরেকজন বাড়ি-বিক্রেতা রহিম, দুজনের হাতেই আছে ১০০ টাকা করে। এখন, রামের কাছ থেকে রহিম একটা গাড়ি কেনেন ১০০ টাকা দিয়ে। এই লেনদেনের ফলে রামের কাছে হয়ে গেল ২০০ টাকা। এবার রাম, রহিমের কাছ থেকে ২০০ টাকা দিয়ে একটি বাড়ি কিনলেন। এখন, রহিমের কাছে আবার ২০০ টাকা হয়ে গেল। এরপর, রহিম আবার রামের থেকে ১০০ টাকা দিয়ে আরও একটা গাড়ি কিনলেন।
এই ৩টি লেনদেনের পর দুজনের হাতেই ১০০ টাকা করে রয়ে গেল। এখান থেকে আমরা পাবো জিডিপি, মানি সাপ্লাই এবং অর্থের গতিবেগ। একটা অর্থনীতির জিডিপি হচ্ছে, উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট মূল্য। সুতরাং এক্ষেত্রে জিডিপি (প্রথমবার গাড়ি কেনা ১০০ + বাড়ি কেনা ২০০ + দ্বিতীয়বার গাড়ি কেনা ১০০) = ৪০০ টাকা। দুজনের হাতেই ১০০ টাকা করে ছিল বলে অর্থনীতিতে মোট অর্থের সরবরাহ কিংবা মানি সাপ্লাই ছিল মোট ২০০ টাকা।
এখন জিডিপিকে মানি সাপ্লাই দিয়ে ভাগ করলে আমরা পাবো অর্থের গতিবেগ কিংবা ভেলোসিটি অফ মানি পেয়ে যাবো। তার মানে এই অর্থনীতিতে অর্থের গতিবেগ হবে ২।
অর্থের গতিবেগ আমাদের দেখায় বিভিন্ন কেনাকাটায় কতবার কী পরিমাণ টাকা হাতবদল হয়। এটা দিয়েই বোঝা যায় মুদ্রাস্ফীতি এবং মুদ্রানীতির কার্যকারিতার মতো অর্থনৈতিক সূচকগুলো। উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন একটা দৃঢ় অর্থনীতিতে অর্থের গতিবেগ বেশি থাকবে।
অন্যদিকে একটা অর্থনীতি স্থবির এবং মন্দ্রাক্রান্ত অর্থনীতিতে এই গতিবেগ থাকবে কম। তবে অর্থের অতিরিক্ত গতির ফলে বাড়তি চাহিদার কারণে মুদ্রাস্ফীতিও সৃষ্টি হতে পারে, যদি না বাড়তি চাহিদাকে সামাল দেওয়ার জন্য বাড়তি সরবরাহ নিশ্চিত করা না হয়। এর বিপরীত অবস্থায় দেখা দেয় অর্থনৈতিক মন্দা। উচ্চ গতিবেগ থাকলে অর্থের তারল্যও বেশি থাকে, যার কারণে বেশি কেনাবেচা ও দ্রুত লেনদেন সংঘটিত হয়। অর্থের এই হাতবদল হওয়াকে আরও দ্রুতগতি দেয় ডিজিটাল লেনদেন ও ই-কমার্স সুবিধা।
তাহলে অর্থের গতিবেগ দিয়ে আমরা বুঝতে পারি একটা অর্থনীতিতে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কতখানি সম্পদ সৃষ্টি হতে পারে (যদি মুদ্রাস্ফীতি না থাকে)। এটা দিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার করণীয় ঠিক করতে পারে। যদি দেখা যায় জিডিপি বাড়ার কারণে অর্থের গতি কমে গেছে, তাহলে বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
ওপরের উদাহরণ থেকে আমরা বুঝতে পারি উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন একটা সচ্ছল বাজারের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের মতো দেশের বিভিন্ন উৎসবে সৃষ্টি হওয়া চাহিদা ও বৃদ্ধি পাওয়া অর্থের পরিমাণ অর্থনীতিতে কী অবদান রাখতে পারে। উৎসবের এই সামগ্রিক চিত্র থেকে আমরা আরেকটা ধারণা পাই যে, উচ্চ চাহিদা এবং অর্থের উচ্চ গতিবেগ থেকে সৃষ্টি হতে পারে মুদ্রাস্ফীতি, যদি সরবরাহ ব্যবস্থা উচ্চ চাহিদার সঙ্গে তাল মিলাতে না পারে।
ব্যবসায়ীদের কারসাজি ছাড়াও ঈদ কিংবা বিভিন্ন উৎসবের বাজারের দুর্মূল্যের এটাও একটা কারণ। কারসাজির মাধ্যমে সরবরাহ কমিয়ে দিলেও মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। সে কারণে টাকার দ্রুতগতি কিংবা শ্লথগতির চেয়ে স্বাভাবিক গতি থাকাই শ্রেয়, কারণ এতে একটা স্থিতিশীল এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি বিরাজ করার মতো পরিস্থিতি থাকে। উৎসবের মারদাঙ্গা বাজারে এই ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে, যার আঁচ টের পাওয়া যায় ঈদের বাজারে গেলে।
ফারুক মঈনউদ্দীন : গল্পকার, অনুবাদক, অর্থনীতি বিশ্লেষক