মেহেরপুরে জ্বালানি তেলের অপেক্ষায় মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন, ভোগান্তি

রোদ আর গরমের মধ্যে রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে চালকবিহীন অসংখ্য মোটরসাইকেল। চালকেরা কেউ দোকানে, কেউ গাছের ছায়ায় বসে অপেক্ষা করছেন- কখন তেল মিলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় সময় কাটছে তাদের। চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা। মেহেরপুরে জ্বালানি তেল সংকটে ফিলিং স্টেশনগুলোতে এমন চিত্র দেখা গেছে। প্রশাসনিক তদারকির অভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। অনেকে রাত ৩টা থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন মাত্র ২০০ থেকে ৫০০ টাকার তেলের আশায়। তবে কবে এই সংকট কাটবে সে বিষয়ে জানা নেই কারও।
বিজ্ঞাপন
গত কয়েকদিনে মেহেরপুর জেলার মেসার্স নূর ফিলিং স্টেশন, হক ফিলিং স্টেশন, জেড. কে ফিলিং স্টেশন, শতাব্দী ফিলিং স্টেশন, মেহেরপুর ফিলিং স্টেশন, মা ফিলিং স্টেশন, মুজিবনগর ফিলিং স্টেশন, গাংনী ফিলিং স্টেশন, কিবরিয়া ফিলিং স্টেশন, হোসেন ফিলিং স্টেশন এবং রূপক ফিলিং স্টেশন- সব জায়গাতেই একই চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয়দের মতে, এত বড় মোটরসাইকেলের লাইন মেহেরপুরে আগে কখনো দেখা যায়নি। তীব্র গরম ও রোদের মধ্যে চালকেরা রাস্তার পাশে গাড়ি রেখে আশপাশের দোকান, ছাউনি বা গাছের নিচে বসে থাকছেন। কেউ কেউ ছাতা মাথায় নিয়েও লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু কখন তেল পাবেন, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। এমনকি লাইনে থাকা সবাই তেল পাবেন কিনা, সে নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। পাম্পগুলোতে ২০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না।
অন্যদিকে, প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাবে মাঝে মধ্যেই চালকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। যদিও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, তবুও ড্রাইভিং লাইসেন্স, হেলমেট বা গাড়ির কাগজপত্র যাচাই করতে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
তেল নিতে আসা রাজু ইসলাম বলেন, এত ভোগান্তি আগে কখনো দেখিনি। সঠিক তদারকি না থাকায় মাঝেমধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। মোটরসাইকেলের এত বড় লাইন জীবনে দেখিনি। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিয়ে কর্মস্থলে পৌঁছানো আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কবে এর সমাধান হবে, সেটাও জানি না। এই সংকট কাটলে আমরা স্বস্তি পেতাম। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো চার-পাঁচ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খুব সীমিত পরিমাণ তেল পাওয়া যাচ্ছে। তবে গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স, হেলমেট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে তেল দিলে পরিস্থিতি আরও ভালো থাকত।
তেল নিতে আসা আকাশ ইসলাম বলেন, দীর্ঘ লাইন হবে ভেবে ভোরেই চলে এসেছি। তারপরও দেখি আমার আগেই অনেকেই এসে দাঁড়িয়ে আছে। ছয় থেকে সাত ঘণ্টা অপেক্ষার পর মাত্র ৩০০ টাকার তেল পেয়েছি। তীব্র রোদে দাঁড়িয়ে থাকা খুবই কষ্টকর। আমি একজন শিক্ষার্থী বলে হয়তো এতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছি, কিন্তু কর্মজীবী মানুষের জন্য এটি খুবই কষ্টসাধ্য। এই কষ্ট নিয়েই প্রতিটি তেল পাম্পে শত শত মোটরসাইকেল চালক তেলের জন্য অপেক্ষা করছে।
পাম্পে তেল নিতে আসা যুবক হালিম আলী বলেন, সাধারণ মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে রোদে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অনেকে লাইনে না দাঁড়িয়েই তেল নিয়ে চলে যাচ্ছে। যদি ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত থেকে তেল বিক্রি তদারকি করতেন, তাহলে এমনটা হতো না। শত শত মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও কিছু মানুষ পরিচয়ের জোরে লাইনে না দাঁড়িয়েই তেল নিয়ে যাচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক। প্রশাসনিক তদারকি না থাকায় কেউই নিয়ম-নীতি মানছে না।
বিজ্ঞাপন
তেল নিতে আসা কৃষক ছানোয়ার হোসেন, সুমন আলী ও হারন আলী বলেন, আমরা চাষি মানুষ, আমাদের অনেক কাজ থাকে। তেলের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে ধানের জমি শুকিয়ে যাচ্ছে, গম কাটা নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। সময়মতো গম কাটতে না পারলে বৃষ্টি বা ঝড়ে আমরা বড় ক্ষতির মুখে পড়ব। আমরা কখন মাঠে কাজ করব আর কখন তেল নিতে আসব, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। চাষিদের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে তেল দেওয়ার নিয়ম থাকা উচিত নয়। পাম্প কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের বিষয়টি বোঝা প্রয়োজন। চাষিরা যখন আসবে, তখনই ডিজেল দেওয়া উচিত, কারণ ডিজেলের তেমন সংকট দেখা যাচ্ছে না। আমরা ভোরে এসেছি, কিন্তু সকাল হয়ে গেলেও তেল দেওয়া শুরু হয়নি।
পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, সকাল সাড়ে ৮টার পর তেল দেওয়া হবে। তবে কিছু ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ চাষিদের কষ্ট বিবেচনা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দিচ্ছেন।
পাম্পকর্মী সুমন আলী, তারিক হোসেন ও সানজিদুল ইসলাম জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিটি গ্রাহককে সর্বোচ্চ ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে পেট্রোল বা অকটেন দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সীমিত পরিসরে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে। একদিন ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে, আরেকদিন পেট্রোল। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় সংকট তৈরি হয়েছে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে বড় ধরনের সংকটের শঙ্কা নেই। চাহিদা বেশি থাকায় তেল সরবরাহ করতে গিয়ে তারাও হিমশিম খাচ্ছেন।
মেসার্স গাংনী ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী ইয়ারুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত চাহিদার কারণে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। দাম বাড়ার আশঙ্কা, ধানের জমিতে নিয়মিত সেচ দেওয়া, মাঠে পাকা গম এবং ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা- সব মিলিয়ে চাষিরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চাষিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মোটরসাইকেল চালকদেরও পেট্রোল ও অকটেন দেওয়া হচ্ছে, যতক্ষণ মজুত আছে। তবে অনেক সময় কিছু গ্রাহকের কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক তদারকি জরুরি বলেও তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, রাস্তায় মোটরসাইকেলের এত বড় লাইন আগে কখনো দেখেননি।
মেহেরপুর জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাজওয়ার আকরাম শাখাপি ইবনে সাজ্জাদ (অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট) বলেন, যেসব ফিলিং স্টেশনে তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি জানান, জেলার সব ফিলিং স্টেশন নিয়মিত পরিদর্শন করা হচ্ছে এবং অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সবার সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
আরএআর