উত্তরের নদীবিধৌত জেলা গাইবান্ধার চরাঞ্চলে সোনালি ভুট্টা চাষে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে। চরবাসীর কঠোর পরিশ্রম ও উর্বর পলিমাটির কারণে ভুট্টা এখন জেলার অন্যতম লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে বদলে যাচ্ছে কৃষকদের জীবনমান।
বিজ্ঞাপন
জেলার সাতটি উপজেলাতেই ভুট্টা চাষ হলেও সদর, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি উপজেলার ১৬৫টি ছোট-বড় চরে সবচেয়ে বেশি আবাদ হচ্ছে। বর্তমানে হাজারো কৃষকের প্রধান জীবিকা হয়ে উঠেছে এই ফসল।
কৃষি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উর্বর পলিমাটি ও বিস্তীর্ণ জমি ভুট্টা চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় গত এক দশকে এ অঞ্চলে ভুট্টার আবাদ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় উৎপাদন খরচ কম এবং ফলন বেশি হওয়ায় কৃষকরা ভুট্টা চাষে ঝুঁকছেন। পাশাপাশি পোল্ট্রি ও মৎস্য খাদ্য শিল্পে চাহিদা থাকায় বাজারেও ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে জেলায় ১৭ হাজার ৮২৫ হেক্টর (১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৭ বিঘা) জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় ২৩৬ হেক্টর বেশি এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬৮৩ হেক্টর বেশি।
বিজ্ঞাপন

উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সদরে ১,১৯০ হেক্টর, সাদুল্লাপুরে ১,১০০, পলাশবাড়ীতে ১,০০০, গোবিন্দগঞ্জে ১,৩৮৫, সাঘাটায় ২,০০৫, সুন্দরগঞ্জে ৪,৪০৫ এবং ফুলছড়িতে ৫,৯৪০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৬৮২ মেট্রিক টন।
সম্প্রতি ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের চর রসুলপুর, গুপ্তমনি, উরিয়া ইউনিয়নের রতনপুর ও কাবিলপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সবুজে ভরা ভুট্টাক্ষেত। অধিকাংশ জমিতে গাছে কলা এসেছে, যা ভালো ফলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কৃষকরা সেচ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, এক বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষে খরচ হয় প্রায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। আর উৎপাদন হয় ৩৫ থেকে ৪০ মণ। গত বছর প্রতি মণ ভুট্টা বিক্রি হয়েছে প্রায় ১,১৫০ টাকায়। ফলে খরচ বাদ দিয়েও উল্লেখযোগ্য লাভ করা সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
চরের কৃষক মাজের আলী বলেন, চার বিঘা জমিতে ভুট্টা লাগিয়েছি। সবই বর্গা নেওয়া। এই ফসলই আমাদের পরিবারের একমাত্র ভরসা।
আরেক কৃষক ফুল মিয়া জানান, ভুট্টা লাভজনক ফসল। গাছ কাঁচা অবস্থায় গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে এবং শুকনা অবস্থায় জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।

চরের কৃষকদের ভাষ্য, ভুট্টা মাড়াই মৌসুমে এত বেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হয় যে স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে তা সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে শহরাঞ্চল থেকে নারী-পুরুষ শ্রমিক এসে কাজ করেন।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জও। প্রাকৃতিক দুর্যোগ—রোদ, বৃষ্টি, বন্যা, খরা ও ঝড়ের ঝুঁকি নিয়ে চাষ করতে হয়। অনেক সময় উৎপাদন ভালো হলেও সংরক্ষণ ও বিপণন সমস্যার কারণে ন্যায্যমূল্য পান না কৃষকরা।
কৃষকদের দাবি, চরাঞ্চলে আধুনিক সংরক্ষণাগার ও গুদাম নির্মাণ করা হলে ফসল দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি চরভিত্তিক বাজার বা সংগ্রহ কেন্দ্র গড়ে তোলারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
গাইবান্ধার কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক সাদেকুল ইসলাম বলেন, উন্নত জাতের বীজ, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ভুট্টার উৎপাদন বাড়ছে। এটি লাভজনক হওয়ায় চরাঞ্চলে এর আবাদ প্রতিবছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, উৎপাদিত ভুট্টা দেশের বিভিন্ন ফিড মিল ও খাদ্য শিল্পে সরবরাহ হওয়ায় এর চাহিদাও বাড়ছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) যাদব সরকার বলেন, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। গাইবান্ধার চরাঞ্চলের কৃষকরা জেলার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ভুট্টা ও মরিচ এই জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো উচ্চ পর্যায়ে জানানো হবে।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই (Access to Information) প্রোগ্রামের উদ্যোগে গাইবান্ধার তিনটি পণ্য ভুট্টা, মরিচ ও রসমঞ্জুরী জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
এসএইচএ
