‘মামা, আমি শায়েখ… কিতা করলায়… আজিজে কিতা করলো… আর গেম অইতো না… যদি তোমরা আমারে জিন্দা দেখতে চাও, আমারে ইকান থাকি নেওয়াও…’ ক্ষুদে বার্তায় পরিবারের কাছে পাঠানো এই কথাগুলোই ছিল শায়েখ আহমদ জয়ের শেষ আর্তি। এরপর আর কোনো খবর নাই। কয়েকদিন পর আসে মৃত্যুসংবাদ। শায়েখ আহমদ আর ফিরে আসেননি। এমনকি তার নিথর দেহটিও না।
বিজ্ঞাপন
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার টিয়ারগাঁও গ্রামের একটি সাধারণ পরিবারে জন্ম শায়েখ আহমদ জয়ের। ছোটবেলা থেকেই সংসারের অভাব-অনটন দেখে বড় হওয়া এই তরুণের স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানো। সেই স্বপ্ন পূরণের আশাতেই চার মাস আগে দেশ ছাড়েন তিনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দালালের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা খরচ করে বিভিন্ন দেশ পাড়ি দিয়ে লিবিয়ায় পৌঁছায় শায়েখ। সৌদি আরব, কুয়েত, দুবাই ও মিশর হয়ে তার এই যাত্রা ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও পরিবারের মুখে হাসি ফোঁটানোর আশায় সব কষ্ট সহ্য করছিল সে। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরই বদলে যায় পরিস্থিতি। ইউরোপে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দালালচক্র আবারও সাড়ে ৭ লাখ টাকা দাবি করে। ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে শেষ সম্বল জমি বিক্রি করে সেই টাকা জোগাড় করেন বাবা আখলুস মিয়া।
শায়েখের সঙ্গে পরিবারের শেষ কথা হয় চলতি মাসের ২০ তারিখে। ফোনের ওপারে আতঙ্কিত কণ্ঠে সে জানায়, ‘গেইমে’ (যেখানে জিম্মি করে টাকা আদায় করা হয়) ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে সে। খাবার ও পানির অভাব, প্রতিনিয়ত মারধর আর অমানবিক পরিবেশে দিন কাটছিল তার।
বিজ্ঞাপন
সে বাবাকে অনুরোধ করে জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলা হবে। আর যদি ‘গেইম’ না হয়, তাহলে যেন দ্রুত তাকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। না হলে সে আর বাঁচবে না এমন করুণ আর্তিও জানায় সে।
বাবা আখলুস মিয়া বলেন, ‘বিদেশ যাওয়ার লাগি পাগল অইগেছিল। পরে কয়, টেকা না দিলে গাড়ির তলে পইড়া মরমু। আমরা গরু-জমি বিক্রি কইরা, সুদে টাকা আইন্না সাড়ে ৭ লাখ পাঠাইছি। কিন্তু সেই টাকাও বাঁচাতে পারেনি শায়েখকে।’
গত শনিবার (২৮ মার্চ) বিকেলে তার সঙ্গীদের কাছ থেকে পরিবার জানতে পারে, শায়েখ আর বেঁচে নাই। তারা জানান, তার (শায়েখের) মরদেহ ভূমধ্যসাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
খবর শোনার পর থেকেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বাবা আখলুস মিয়া। মাঝে মধ্যেই ভেঙে পড়ছেন কান্নায়। ঘরের ভেতর-বাইরে এখন শুধু শোকের ছায়া।
চাচা আঙ্গুর মিয়া বলেন, ‘কয়দিন ধইরা ফোন ধরে না। পরে তার লগের একজন ফোন কইরা কয়, হে আর নাই।’
একটি পরিবারের স্বপ্ন এভাবেই শেষ হয়ে গেল অজানা সাগরের ঢেউয়ে। শায়েখের মতো হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের আরও কত তরুণ নিজের ভবিষ্যৎ রাঙ্গানোর আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পা বাড়াচ্ছে বিদেশের পথে। কিন্তু তাদের সবার গল্প কি নিরাপদে ফেরার, নাকি শায়েখের মতোই হারিয়ে যায় এমন ভয়ানক মৃত্যুতে।
তামিম রায়হান/এএমকে
