ছেলের ইউনিভার্সিটিতে যাতায়াতের জন্য ঈদের আগে নতুন মোটরসাইকেল কিনেছেন খুলনার ফুলতলা দামোদর এলাকার বাসিন্দা আজাহার আলী। ভোগান্তি এড়াতে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বেলা ১১টার দিকে খুলনা বিআরটিএ অফিসে আসেন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন করাতে। আবেদনও করেছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
আজাহার আলী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ছেলে নর্দার্ন ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করে। তার যাতায়াতের সুবিধার্থে ঈদের কয়েকদিন আগে নতুন মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছি। বৈশ্বিক কারণে তেলের সংকটসহ পথঘাটে বাড়তি ঝামেলা এড়াতে দ্রুত গাড়ির রেজিস্ট্রেশন করার জন্য বিআরটিএ অফিসে এসেছি।
শুধু আজাহার আলীই নয়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য মানুষ ছুটছে বিআরটিএ অফিসে।
মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, বিআরটিএ অফিসের মূল ভবনের পাশে টিনসেডের ভিতরে দুই পাশে ক্লাসরুমের মতো সারিবদ্ধভাবে অসংখ্য মানুষ ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য পরীক্ষা দিতে এসেছেন। সেখানে কথা হয়, আরিফুল নামে এক ব্যক্তির সাথে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, কাগজপত্র ঠিক না থাকলে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বর্তমানে অনেক স্থানে কাগজপত্র দেখিয়ে তেল নিতে হচ্ছে। এ জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স করার জন্য পরীক্ষা দিতে এসেছি।
ইরান-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। যার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালকরা। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে চালকদের।
খুলনা বিআরটিএ অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের তিন মাসে ৫ হাজার ২০০ গ্রাহক শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ২ হাজার ২০০টি, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৪০০টি এবং মার্চে ১ হাজার ৬০০টি আবেদন করেছেন। এছাড়া একই সময়ে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন হয়েছে ২ হাজার ৭৯৭টি।
বিজ্ঞাপন
বিআরটিএ, খুলনা সার্কেলের সহকারী পরিচালক উসমান সরওয়ার আলম বলেন, লাইসেন্স এবং রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্রতিনিয়ত মানুষে অফিসে আসছে। আবেদন করছে। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে আবেদনও বাড়ছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের কারণে হয়তো মোটরসাইকেল বিক্রিতে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তবে আমাদের এখানে প্রচুর আবেদন আসছে।
এদিকে জ্বালানি তেল সংকটের প্রভাব পড়েছে খুলনার মোটরসাইকেল শোরুমগুলোতে, ব্যবসায় নেমেছে ধস।

খুলনার দৌলতপুর হোন্ডা শোরুমের সিইও আহনাফ সিরাজ মাহির ঢাকা পোস্টকে বলেন, তেল সংকটের প্রভাব আমাদের ওপরও পড়েছে। মোটরসাইকেল বিক্রি নেমে এসেছে অর্ধেকে। এক সপ্তাহে যেখানে ১০টি মোটরসাইকেল বিক্রি হতো। সেখানে গেল সপ্তাহে ৫টিতে নেমে এসেছে। তবে ঈদের সময় নানা অফার আর মানুষের কাছে টাকা থাকার কারণে মোটরসাইকেল বিক্রি ভালো ছিল। বর্তমানে বিক্রিতে ধস নেমেছে।
খুলনার সোনাডাঙ্গায় অবস্থিত সুজুকি মোটরসাইকেলের শোরুমের সেলস এক্সিকিউটিভ তন্বি বলেন, ঈদের নানা অফারের কারণে ভালো বিক্রি ছিল। তবে ঈদের পড়ে বিক্রি কমে এসেছে। জ্বালানি তেলের সংকটের প্রভাব পড়েছে মোটরসাইকেল বিক্রিতেও। পাঁচটির স্থানে বিক্রি হচ্ছে দুটি। বেচাকেনা অর্ধেকে নেমে এসেছে।
এদিকে মঙ্গলবার খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, অনেক পাম্পেই তেল নেই। যেসব পাম্পে তেল নেই, সেখানে মোটরসাইকেল চালকরা এসে ফিরে যাচ্ছেন। আর যেসব পাম্পে তেল রয়েছে, সেখানে মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ লাইন দিতে দেখা যায়।
খুলনা মেট্রোপলিটন ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা মোটরসাইকেল চালক নাজমুল হোসেন বলেন, কয়েকটি পাম্প ঘুরে তেল না পেয়ে এখানে এসেছি। এসে দেখি লম্বা লাইন। নিউ মার্কেটের অদূরে পাম্প থাকলেও জোড়াগেট পর্যন্ত দীর্ঘ লাইন দিতে হয়েছে। অবশেষে ২০০ টাকার তেল নিতে পেরেছি। কবে যে এই সংকট কাটবে। খুব দুর্ভোগে পড়তে হয়।
ফুলবাড়িগেট নগর ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মাহফুজুর রহমান বিশ্বাস বলেন, ডিপো থেকে চাহিদা মতো তেল পাচ্ছি না। ডিপোগুলো থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে আমাদের তেল দিচ্ছে। আর ক্রেতাদের চাহিদাও বেড়েছে। ফলে দীর্ঘ সারি দেখা দিচ্ছে।
এদিকে চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারকি এবং সমন্বয়ের লক্ষ্যে খুলনা জেলা ও মহানগরের পেট্রোল পাম্পগুলোতে ৩৫ জন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অনিয়ম খতিয়ে দেখতে চলছে জেলা প্রশাসনের অভিযানও।
খুলনার জেলা প্রশাসক আ. স. ম. জামশেদ খোন্দকার ঢাকা পোস্টকে বলেন, জ্বালানি তেলের তেমন কোনো সংকট নেই। আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু নেই। তবে ক্রেতা এবং মালিক পক্ষ কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে যাচ্ছে। নড়াইলে ট্রাক চাপা দেওয়ার কারণে পাম্প মালিকরা কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, কাস্টমার এবং মালিকদের আতঙ্কের কারণেই সরকার ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দিয়েছে। তারা নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে যাতে তাদের সাহস দেয়। এছাড়া পেট্রোল পাম্পগুলোতে জেলা প্রশাসনের মনিটরিং চলছে। প্রতিদিন অন্তত দুইটি টিম মনিটরিংয়ে কাজ করছে।
আরএআর
