বিজ্ঞাপন

চিকিৎসকের মমতায় বেড়ে উঠছে জন্মের পর মা হারা শিশুটি

অ+
অ-
চিকিৎসকের মমতায় বেড়ে উঠছে জন্মের পর মা হারা শিশুটি

জন্মের সময় মারা যান মা যমুনা বেগম (২৪)। আর বাবা সোহেল মিয়া আগে থেকেই মানসিকভাবে অসুস্থ। তিনি গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষাবৃত্তি করেন। এমন অবস্থায় মা হারা নবজাতকের ঠাঁই হয় নানা জয়নাল আবেদীনের সংসারে। কিন্তু নবজাতকের শিশুখাদ্য নিয়ে বিপাকে পড়েন নানা-নানি। এভাবে কেটে যায় ১৫ দিন। তখনও শিশুটি ছিল নামহীন। পাশে ছিল না জন্মদাতা বাবা কিংবা বাপ-দাদার পরিবারের কেউ।

বিজ্ঞাপন

মাতৃদুগ্ধ না পাওয়া রুগ্ন শিশুটির বেঁচে থাকা নিয়ে চিন্তিত নানা-নানী। সামর্থ্য না থাকায় শিশুটির জন্য ফর্মুলা মিল্ক জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হয় ওই পরিবারের। এ অবস্থায় গত ২১ ফেব্রুয়ারি অসুস্থ শিশুটিকে নিয়ে রংপুরের পীরগাছায় চিকিৎসক মো. মাহফুজার রহমান বাঁধনের কাছে শরণাপন্ন হন অসহায় নানা-নানি।

প্রথম দেখায় গল্প জানার পর ওই চিকিৎসক নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে শিশুটির নাম রাখেন মাহফুজা আক্তার সুমি। শুধু তাই নয়, চিকিৎসা ছাড়াও শিশুটির জন্য শিশুখাদ্যের ব্যবস্থা করেন। সুমির পুষ্টিহীনতা দূর করতে দুধ মা (জন্মদাতা মা ছাড়াও অন্য কোনো শিশুর জন্মের পর যিনি তাকে নিজ স্তন্যপান করান) খুঁজে খুঁজে বের করেন ডা. মাহফুজার রহমান। নাম, পারিবারিক তথ্য ও ঠিকানাসহ তালিকাও তৈরি করেন তাদের। যাতে ভবিষ্যতে শিশুটিকে নিয়ে নতুন কোনো বিড়ম্বনা না ঘটে। এভাবেই শিশুটির নিয়মিত দুধের চাহিদা পূরণ করেছেন তিনি। এখন শিশুটির বয়স প্রায় ২ মাস। ডা. মাহফুজারের চেষ্টায় এবং দুধ মায়েদের দেওয়া দুধ পান করে শিশুটি এখন অনেকটা সুস্থ।

ডা. মাহফুজার রহমান বাঁধন গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি সংকটাপন্ন শিশুটির সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে আর্থিক সহায়তার জন্য সমাজের নিবেদিত মানুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। দেশবাসীর কাছে শিশুটির জন্য দোয়াও চান তিনি।

বিজ্ঞাপন

তার এ মানবিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই এগিয়ে আসেন। নাম-পরিচয় গোপন রেখে চিকিৎসা ও শিশুখাদ্যের জন্য আর্থিক সহায়তা দেন। গত ১৭ মার্চ শিশু মাহফুজার জন্য রক্তের প্রয়োজন হলে সেটিও দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা করেন এই  চিকিৎসক। বর্তমানে শিশু মাহফুজা আক্তার সুমি ভালো অবস্থায় আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নানা জয়নাল আবেদীন ও নানি মনোয়ার বেগমের কোলে এখন বেশ অনেকটা সুস্থ আছে সুমি। তারা রংপুরের পীরগাছা উপজেলার তাম্বুলপুর ইউনিয়নের রহমতের চর এলাকার বাসিন্দা। জয়নাল আবেদীন পেশায় একজন মাছ ব্যবসায়ী। দুই মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানের জনক জয়নাল আবেদীনের পরিবারের হাল ধরার কেউ নেই।

ছেলে বিয়ে করে বউসহ ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করছেন। আর ছোট মেয়ে আবিদা সুলতানা থাকেন স্বামীর সংসারে। এখন বড় মেয়ের রেখে যাওয়া চার বছর বয়সী নাতি জোনাব ও নাতনি শিশু মাহফুজাকে ঘিরেই তাদের শখ আহ্লাদ। যদিও যমুনার স্বামী সোহেল মিয়ার পরিবার থেকে মা হারা শিশুটিকে ফিরিয়ে নিয়ে বিক্রি করার চেষ্টা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

শিশুর নানা জয়নাল আবেদীনের সঙ্গে কথা হলে ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, আমি ছোটখাটো একটা ব্যবসা করি। যা আয়-রোজগার হয় তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর। তারপরও বড় মেয়ে যমুনার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া ছেলে-মেয়েকে অন্য কারো কাছে তুলে দেইনি। নাতনি সুমি জন্মের সময় ওর মা মারা যায়। দুধ, ওষুধ আর চিকিৎসা ছাড়া বাচ্চাটা বাঁচবে কিনা এ নিয়ে খুব টেনশনে ছিলাম। আমার তো তেমন সামর্থ্য নেই। আল্লাহর রহমতে পীরগাছায় ডাক্তার মাহফুজার সাহেবের চেম্বারে যাওয়ার পর অনেক উপকার হয়েছে। বাচ্চাটা এখন আল্লাহর রহমতে সুস্থ্য। এই ডাক্তারের ঋণ কোনোদিন শোধ করা যাবে না।

নানী মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘মা মারা ছাওয়ার কায়ো খোঁজ করে নাই। ছাওয়া বাঁচি আছে নাকি মরি গেইছে, এটা ওই ডাক্তার ছাড়া কোরো চিন্তাতে আচলো না। আল্লাহর রহমতে ডাক্তার হাত ধরি ছাওয়া কোনা এ্যালা ভালো আছে। ত্রিশ হাজার টাকা ডাক্তারের কাছ থেকে পাইছি, তাকে দিয়্যা চিকিৎসা, ওষুধপাতি, দুধসহ যা যা লাগে কেনা হইছে। এ্যালা ছাওয়াটা একনা সুস্থ হওয়ার পর বাপের বাড়ির লোকেরা নিবার চায়। ওমরা (বাবার বাড়ির লোকজন) ছাওয়াক বিক্রি করে দেবার চায়। কিন্তু হামরা তাক হবার দিবার নাই।’

শিশুটির চিকিৎসক মো. মাহফুজার রহমান বাঁধন ঢাকা পোস্টকে বলেন, নবজাতকের জন্মের ১৫ দিন পর ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম তাকে নিয়ে আমার চেম্বারে আসেন শিশুটির নানী। জন্মের পর থেকে মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে কৌটার দুধও (প্রক্রিয়াজাত করা শিশুখাদ্য) তেমন পায়নি। সামান্য একটু দুধ পানির সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াতো। সঙ্গে তাল মিছরির পানি, কখনো আবার গরুর দুধও খাওয়াতেন। তরল জাতীয় এসব খাবারে শিশুটি টিকে ছিল বটে কিন্তু শারীরিক অবস্থা একেবারে নিস্তেজ হয়ে ছিল।

তিনি বলেন, মা হারানো সুমি মুভমেন্ট এখন অন্যান্য সুস্থ শিশুর মতোই। প্রতিটা রিফ্লেক্স ভালো, ভাইটাল প্যারামিটারও দুর্দান্ত। সব থেকে বড় কথা, হেডবক্সের অক্সিজেন সাপোর্ট ছাড়াই শতভাগ সেচুরেশন মেইনটেইন করতে পারছে। আমি যতদিন বেঁচে আছি ওই শিশুর চিকিৎসার জন্য আমার পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ্।

ডা. মাহফুজার রহমান আরও বলেন, আমার কাছে প্রায় মুমূর্ষু অবস্থায় বাচ্চাটাকে নিয়ে আসা হয়। তখন ওজন ছিল ১৯ কেজির মতো। জ্বর-সর্দি কিংবা কাশিতে আক্রান্ত ছিল না। মূলত মায়ের দুধ না পাওয়াসহ ভুলভাল খাবারের কারণে বাচ্চাটা শারীরিক দিক থেকে একেবারে নিস্তেজ ছিল। আমি প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেই। কিন্তু তারা আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় রাজি হননি। বাচ্চাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। 

তিনি বলেন, এর তিন দিন পর ২৫ ফেব্রুয়ারিতে বাচ্চাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এর মধ্যে বাচ্চাটার জন্য আমি দুধ মা’র খোঁজে ফেসবুকে একটা পোস্ট করি। আল্লাহর রহমতে ১০-১২ জন মা এতে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসেন। তাদের প্রত্যেকের নাম, ঠিকানা এবং পারিবারিক তথ্য আমি সংরক্ষণ করে রেখেছি। তবে অনেক সময় মনে হতো বাচ্চাটাকে বাঁচানো যাবে না। কিন্তু আল্লাহর রহমতে প্রায় দেড় মাসের নিবিড় পর্যবেক্ষণ, মানুষের সহযোগিতা আর দুধ মায়ের আন্তরিকতায় বাচ্চাটা এখন অনেকটা সুস্থ রয়েছে। 

তাম্বুলপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. বজলুর রশিদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, শিশুটির ব্যাপারে আমার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। যদি পরিবারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়, আমি চেষ্টা করব পরিষদ কিংবা ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করার। মহান আল্লাহ তায়ালা যেন মা হারা এতিম এ শিশুকে সুস্থতাসহ দীর্ঘায়ু দান করেন।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরকে