‘তৃণমূল মানুষের সাথে, তৃণমূল মানুষের পাশে’ এই প্রতিশ্রুতিকে ধারণ করে উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করা দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি উন্নয়নসংস্থা ইকো-সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) পা রাখল প্রতিষ্ঠার ৩৮তম বছরে।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সকাল ৯টায় ঠাকুরগাঁও শহরের গোবিন্দনগরস্থ প্রধান কার্যালয় চত্বরে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান। এসময় উপস্থিত ছিলেন পরিচালক (প্রশাসন) এবং ইকো পাঠশালা অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. সেলিমা আখতার, বিভিন্ন বিভাগের পরিচালক ও কর্মকর্তারা।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে জয়নাল আবেদীন মিলনায়তনে ৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটা হয়। এতে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন বিভিন্ন জেলা শাখার কর্মকর্তারা। পরে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে বক্তব্য দেন ইএসডিও নির্বাহী পরিষদের চেয়ারম্যান সফিকুল ইসলাম।

বক্তব্য রাখেন ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. গোলাম ফেরদৌস, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. খোদাদাদ হোসেন, পরিচালক ড. সেলিমা আখতারসহ অন্যান্য অতিথিরা। সভায় নির্বাহী পরিষদ, সাধারণ পরিষদের সদস্য ও সহস্রাধিক উন্নয়নকর্মী অংশ নেন।
বিজ্ঞাপন
ইএসডিও কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ের একদল তরুণ ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সহায়তার উদ্দেশ্যে ইকো সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) প্রতিষ্ঠা করেন। বন্যার ত্রাণ কার্যক্রম থেকে যাত্রা শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তারা উপলব্ধি করেন স্থানীয় সুবিধাবঞ্চিত, ভূমিহীন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীসমাজ, দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার বাইরে রয়ে গেছে। তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নকে প্রধান লক্ষ্য ধরে ইএসডিও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেয়।
স্থানীয় মানুষের স্বপ্ন, চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব রূপ দিতে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুতই একটি জাতীয় সামাজিক উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত হয়। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF)-এর সহযোগিতায় ক্ষুদ্রঋণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা উন্নয়ন ও সবুজ পরিবেশ নির্মাণের মতো জনপ্রিয় কর্মসূচির মাধ্যমে ইএসডিও অল্প সময়েই দেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে ঠাকুরগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় স্থানীয় উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সংস্থাটি।
ইএসডিওর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৮টি বিভাগে ৫৩৭টি আঞ্চলিক ও ব্রাঞ্চ অফিসের মাধ্যমে ১ কোটি ৫৭ লাখ ৩০ হাজার মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ইএসডিওর কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ৩৪ লাখ ৯০ হাজার পরিবার। পাশাপাশি ৫৬ জেলা, ৪২২ উপজেলা, ৪০৩২ ইউনিয়ন, ১৬২ পৌরসভা এবং ৭টি সিটি করপোরেশন এলাকায় সংস্থাটি কাজ করছে। মানবসম্পদের দিক থেকেও ইএসডিও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে ৫ হাজার ৮০৮ জন স্থায়ী কর্মী সংস্থাটিতে কর্মরত যার মধ্যে পুরুষ ২ হাজার ৯১১ জন এবং নারী ২ হাজার ৮৯৭ জন। এছাড়া আরও ১ হাজার ৯৯৬ জন স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
বিজ্ঞাপন

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ইএসডিওর বাৎসরিক রাজস্ব বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি ১৭ লাখ ৮৬ হাজার ১৩ টাকা। বর্তমানে সংস্থাটি ১০৭টি চলমান প্রকল্প পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ৭৬টি উন্নয়ন প্রকল্প এবং ৩১টি মাইক্রোফাইন্যান্স কম্পোনেন্ট। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশি-বিদেশি ৪২টি উন্নয়ন অংশীদার কাজ করছে।
সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান বলেন, তৃণমূল মানুষের সাথে, তৃণমূল মানুষের পাশে এটি আমাদের মূলমন্ত্র। আজ আমরা ৩৮ বছরের দীর্ঘ পথচলা সম্পন্ন করেছি। এই শুভ দিনে আমি সকলকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাই। বিশেষভাবে অভিনন্দন জানাই সেই সকল মানুষকে, যারা প্রতিনিয়ত জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার চেষ্টা করছেন এবং কখনও হাল ছাড়েননি। ইএসডিও যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের ঠাকুরগাঁও জেলার এক প্রান্তিক জনপদ থেকে। আজ ৩৮ বছরের অভিযাত্রায় আমাদের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে দেশের ৫৬টি জেলায়, যেখানে অসংখ্য মানুষের জীবনযুদ্ধের গল্প আমাদের আরও বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।
তিনি আরও বলেন, আমি ধন্যবাদ জানাই আমাদের সকল তৃণমূল মানুষকে, যারা এই যাত্রা সম্ভব করেছেন। গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই আমাদের সহকর্মী, বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও অংশীদার প্রতিষ্ঠানকে, যারা অব্যাহতভাবে সমর্থন ও সহায়তা প্রদান করছেন। আমাদের সহকর্মীরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থেকে প্রতিনিয়ত মানুষদের জীবনযুদ্ধের গল্পগুলোকে বাস্তবে রূপান্তরিত করছেন। আমি তাদের প্রত্যেককে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাই।

ইএসডিও’র পরিচালক (প্রশাসন) ড. সেলিমা আখতার বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও প্রাণঢালা অভিনন্দন। আজ আমাদের জন্য এক বিশেষ আনন্দের দিন। ইএসডিও ৩৮ বছর ধরে তৃণমূল মানুষের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, গৃহনির্মাণ, পরিবেশ উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যক্রম পরিচালনা করছি। বিশেষভাবে ইএসডিও শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি এবং আশা করি, এগুলো ঠাকুরগাঁওকে একটি শিক্ষার নগরী হিসেবে গড়ে তুলবে, ইনশাআল্লাহ।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. গোলাম ফেরদৌস বলেন, ইএসডিও ৩৮ বছর ধরে দেশের সর্বপ্রান্তে মানুষের পাশে থেকে তৃণমূল সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিক্ষার প্রসার, স্বাস্থ্যসেবা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং পরিবেশ সংরক্ষণসহ নানা ক্ষেত্রে সংস্থাটির অবদান অনস্বীকার্য। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে যে ধারাবাহিকতা এবং নিষ্ঠা ইএসডিও দেখিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সংস্থার সহকর্মীরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে কাজ করে মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনছেন, যা আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। আমরা আশা করি, ইএসডিও আগামী দিনেও দেশের প্রতিটি প্রান্তে মানুষের কল্যাণ ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে অবিরত কাজ চালিয়ে যাবে এবং আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, ইএসডিও দেশের সর্বত্র মানুষের পাশে থেকে দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন ও পরিবেশ সংরক্ষণে সংস্থার ধারাবাহিক কার্যক্রম সত্যিই প্রশংসনীয়।
সংস্থার কর্মীরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে থেকে মানুষের জীবনযুদ্ধে সহায়তা প্রদান করে আসছেন, যা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আমরা আশা করি, ইএসডিও ভবিষ্যতেও এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে এবং দেশের মানুষের কল্যাণে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এসএইচএ
