তীব্র ডিজেল সংকটের কারণে নদীতে মাছ শিকারে যেতে পারছেন না পটুয়াখালীর হাজার হাজার জেলে। ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ট্রলারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে তাদের মৎস্য আহরণ কার্যক্রম। ফলে কষ্টে জীবনযাপন করছেন জেলেরা।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সদর উপজেলার পায়রা নদী সংলগ্ন বড়বিঘাই, ছোটবিঘাই, ইটবাড়িয়া, বদরপুর ও মাদারবুনিয়া ইউনিয়নসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জেলেরা নৌকা ঘাটে বেঁধে অলস সময় পার করছেন। একই চিত্র দেখা গেছে দুমকি, গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, বাউফল ও কলাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতেও। নদীতে মাছ ধরার পরিবর্তে অনেক জেলে ফসলি জমিতে শ্রম দিচ্ছেন, কেউবা গবাদিপশু চরাচ্ছেন।
স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এ সংকট চললেও গত ৩-৪ দিন ধরে পরিস্থিতি আরও বিকট আকার ধারণ করেছে। আগে স্থানীয় বাজারে তেল না পেয়ে দূর-দূরান্তে গিয়ে বিভিন্ন পাম্প থেকে ডিজেল সংগ্রহ করতেন তারা। কিন্তু বর্তমানে পাম্পগুলোতেও ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না।
জেলেরা অভিযোগ করেন, জ্বালানির অভাবে তাদের জীবিকা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকেই এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে মাছ ধরার সরঞ্জাম কিনেছেন। এখন আয় বন্ধ থাকায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন, চিকিৎসা ব্যয় মেটানোসহ দৈনন্দিন জীবনযাপন চালাতে চরম সংকটে পড়েছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের পায়রা নদীর তীর সংলগ্ন জেলে মো. বাবুল হাওলাদার (৫৫)। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে পায়রা নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। গত ৪ দিন ধরে ইঞ্জিনচালিত নৌকার জ্বালানি ডিজেলের অভাবে মাছ শিকারে যেতে পারছেন না নদীতে। এতে পরিবার নিয়ে পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে, কিস্তির টাকা মেটানোর জন্য তার চোখে মুখে এখন দুশ্চিন্তার ছাপ।
বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘নদীভাঙনে সব চইল্লা গ্যাছে আমাগো। এহন এই মাছ ধরেই সংসার চালাই। কিন্তু তেল কিনতে গিয়াই আমাগো মরণ। এহানের সব বাজারে তেল না পাইয়া চৌরাস্তার পাম্পে তেল খুঁজছি, তাও না পাইয়া পটুয়াখালীর পুরান বাজার যাইয়া ১ লিটার তেল আনছিলাম। ১২০ টাকার ডিজেল কিনতে ভাড়া গেছে প্রায় ২০০ টাকা। সেই তেলও দুইবার খেও দিয়া শ্যাষ। ট্রলার তো হাতে বাওন যায় না তাই তেল না পাইয়া গত ৪ দিন ধইররা আর জাল বাইতে পারি নাই। একই সমস্যা আশেপাশের প্রায় ৫-৬ হাজার জেলের। এইভাবে তেল না পাইলে আমরা চলমু কেমনে আর কিস্তি চালামু কেমনে?’
স্থানীয় আরেক জেলে মো. জাকির কাজী (৪২) বলেন, ‘অনেকদিন যাবত আমরা এই তেলের জন্য খেও দিতে পারছি না। নৌকা ধাবার-বন্যায় ( আবহাওয়ার প্রতিকূলতা) পড়লে তো আমরা হাতে বাইয়াও চলতে পারি না। তাই মাছ ধরা এখন বন্ধ। নদী থেকে ৫টা মাছ ধরতে পারলে আমাদের সংসার ভালো চলে, ছেলে-মেয়ে নিয়া ভালো চলতে পারি। এখন খুবই কষ্টে দিন কাটতেছে।’
বিজ্ঞাপন
সদর উপজেলার ছোটবিঘাই ইউনিয়নের ভাজনা গ্রামের জেলে মো. লাবু (২০) বলেন, ‘বাবার সাথে আমিও মাছ ধরি। চাষাবাদের পাশাপাশি জাল বেয়ে আমাদের সংসার চলে। গত কয়েকদিন আগে আমাদের নৌকাটি মেরামতের জন্য তুলেছি কিন্তু কোথাও তেল না পেয়ে আর নৌকা নদীতে নামাইনি।’
দুমকি উপজেলার জেলে মো. জসিম (৪০) বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে আমাদের। কোথাও তেল পাই না। আর নদীতেও তেমন মাছ পাই না আগের মত।’
জেলে আবুল কালাম (৬৫) বলেন, ‘স্বাধীনের পর থেকেই আমি এই জেলে পেশায়। ৪ সদস্যের সংসার চালাই। আমার স্ত্রীর ওষুধ কিনতে হয়। আমিও অসুস্থ। ভাবছি মাছ পাইলে তা বেইচ্চা ডক্তার দেখামু। কিন্তু এই ডিজেলের অভাবে আমরা জেলেরা খুব অসহায় অবস্থায় আছি। সরকারের কাছে আমাদের দাবি দ্রুত যেন এই তেলের সমস্যা সমাধানে যেন ব্যবস্থা নেয়।’
এদিকে পটুয়াখালী শহর ও আশপাশের শিয়ালী বাজারের খন্দকার ফিলিং স্টেশন, টোলপ্লাজা সংলগ্ন সরকার ব্রাদার্স ফিলিং স্টেশন, পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার রূপালী ফিলিং স্টেশন, বসাকবাজারের পায়রা ফিলিং স্টেশনসহ অন্তত ৫ টি ফিলিং স্টেশনে ঘুরে দেখা যায় ফুরিয়ে গেছে এখানকার পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল।
রূপালী ফিলিং স্টেশনের মিটার ম্যান মো. শাকিল হোসেন জানান, সব তেল শেষ, আবাররোববার থেকে তেল পাওয়া যাবে।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য মতে, জেলায় মোট নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন প্রায় ৮০ হাজার।
ডিজেলের অভাবে জেলেদের ভোগান্তির বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী ঢাকা পোস্টকে বলেন, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। জ্বালানি সমস্যায় বর্তমানে গাড়িচালকসহ সবাই-ই একটু ভোগান্তিতে আছেন। জেলে বা জেলে সংগঠনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কেউ আমাদের জানালে আমরা সেই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে অবগত করব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
সোহাইব মাকসুদ নুরনবী/এসএইচএ
