শ্যালোমেশিন (সেচযন্ত্র) নিয়ে ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল নিতে এসেছেন জমেলা বেগম (৬৫)। তিনি পবা উপজেলার নওহাটার রুচিতা ফিলিং স্টেশন থেকে ২০০ টাকার তেল পেয়েছেন। তার মতো অন্য চাষিরাও সেচযন্ত্র নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পেলেও চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে জানান তারা।
বিজ্ঞাপন
পবার মাধপপুর কুঠিপাড়ার বাসিন্দা জমেলা বেগম জানান, তার তিন মেয়ে, স্বামী নেই। নিজে ও শ্রমিক নিয়ে তাকে জমিতে তিনি বোরো ধানের চাষ করেছেন। তবে গেল ১০ দিন ধরে তেলের অভাবে তিনি জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। জমেলা বলেন, জমি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বিগত বছরে তিন দিন পরপর জমিতে পানি দিয়েছি। কিন্তু এ বছর ১০ দিন হলো জমিতে সেচ দিতে পারিনি। কয়েকদিন এই পাম্পে (ফিলিং স্টেশন) এসে ঘুরে গিয়েছি। তারাই আজ আসার কথা বলেছিল, এসে তেল পেলাম।
মাথায় করে শ্যালোমেশিন (সেচযন্ত্র) নিয়ে এসেছেন রাকিব হোসেন। তিনি জানান, এই ফিলিং স্টেশন থেকে ২০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। এই তেলে খুব বেশি তিন ঘণ্টা মেশিন চলবে। আমার জমিতে ৯ ঘণ্টা পানি লাগে। যেহেতু তেল পাওয়া যাচ্ছে না, তাই এভাবে প্রতিদিন ২০০ টাকা করে তেল কিনে সেচ দিতে হচ্ছে। যারা বোরো ধানের জমিতে সেচ দেবে তাদের কমপক্ষে ৪০০-৫০০ টাকার দিলে ভালো হয়।
রুচিতা ফিলিং স্টেশনের কয়েকজন কর্মী বলেন, যারা সেচ মেশিন নিয়ে পাম্পে আসছেন তাদেরকে তেল দেওয়া হচ্ছে। যেহেতু সীমাবদ্ধতা আছে, তাই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের তেল সবাইকে দেওয়া হচ্ছে। যাতে করে সবাই যেন তেল পায়। ফিলিং স্টেশনটিতে ১৭ থেকে ২০ জন চাষিকে পর্যায়ক্রমে তেল দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। সেখানে মাইক্রোবাস ও কারে জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত বর্ষার শেষে শীতে শুকিয়ে যায় পানি। সেই সব জমিতে সবচেয়ে বেশি চাষাবাদ হয় বোরো ধানের। কারণ শুষ্ক মৌসুমে এই ধানে প্রচুর সেচ প্রয়োজন হয়, একটু নিচু জমিতে বোরো চাষের জন্য বেশি উপযোগী, কম সেচের কারণে। রাজশাহী অঞ্চলে বোরো চাষের সেচের জোগান আসে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) গভীর নলকূপ ও ইঞ্জিন চালিত সেচযন্ত্র থেকে। তবে তুলনামূলক তিনভাগের দুইভাগ জমিতে জ্বালানিতে চলা ইঞ্জিনচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহার হয়।
এ অঞ্চলের ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল কেনা-বেচায় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। চাইলে একজন গ্রাহক নিজের ইচ্ছে মত তেল কিনতে পারছেন না। শুধু ফিলিং স্টেশনগুলো নয়- জেলা ছাড়াও গ্রামগঞ্জের খুচরা ও পাইকারি দোকানগুলোতে আগের মতো স্বাভাবিকভাবে মিলছে না ডিজেল (জ্বালানি তেল)। ফলে সেচ কাজ চালিয়ে নিতে দূর-দূরান্তের দোকান থেকে কিনতে হচ্ছে ডিজেল। তবে সেখানেও মিলছে না চাহিদা মাফিক।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, রাজশাহী অঞ্চলে ৩ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষের লক্ষ্যমাত্রা। আর রাজশাহী জেলায় এবছর বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে। অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে সবচেয়ে বেশি বোরোধানের চাষ হয়। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে সেচ কার্যক্রমে বিঘ্ন দেখা দেওয়ায় কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। সময়মতো সেচ না পেলে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বোরো মৌসুমে জমিতে নিয়মিত সেচ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ধানের কুশি গঠন ও শীষ বের হওয়ার সময় পানির অভাব হলে ফলনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। রাজশাহী অঞ্চল দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই সেচ কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় চলতি মৌসুমে বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
নগরীর বুধপাড়া এলাকায় পাঁচবিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন আক্কাস আলী। জমিতে শেষ দিতে ঠিকমতো তেল পাচ্ছে না এমন কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ফিলিং স্টেশনে ১০১ টাকা লিটার ডিজেল। বাইরে ১৪০ টাকা লিটার। পাঁচ বিঘা জমিতে ৯ ঘণ্টা পানি লাগে। স্বাভাবিক সময়ে তিন থেকে চার দিন পরপর পানি দেওয়া হয়। ১০ দিন পরে পানি দেওয়া হলো তেল না পাওয়ার বেকায়দায়।
তিনি আরও বলেন, টাকা দিয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যেভাবেই হোক সেচ দিতেই হবে ধানে। হওয়া ধান আর এক মাসের মধ্যে ধান কাটা পড়বে জমিতে। এখন এমন পরিস্থিতি যে ধান রেখে পালিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। এক বিঘা ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে এবার তেলের দাম বেশি থাকায় খরচ বাড়বে।
জেলার বাগমারা, মোহনপুর, পবা, তানোর উপজেলার ফিলিং স্টেশনগুলোতে বোরো চাষিরা তেল নিতে শ্যালোমেশিন নিয়ে আসছেন। বালানগর, কালচিকার বোরো চাষি কালাম ও কোরবান আলী বলেন, তেল পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় বাড়িতে পানি তোলা মটার চালিয়ে জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। কোন কোন সময় জমিতে পাইপ বিছানোর পরে দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ নেই। এ সময় ঠিকমত জমিতে সেচ দিতে না পারলে ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতি হবে।
তারা আরও বলেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রাজশাহী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ বোরো মাঠে উৎপাদন কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় খাদ্য মজুত ও বাজার ব্যবস্থার ওপরও।
রাজশাহী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যে কালবৈশাখীর প্রভাবে বৃষ্টি হওয়াতে তাপমাত্রা কমে এসেছিল। তবে কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। এটি অব্যাহত থাকতে পারে। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বিকেল ৩টার দিকে ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এটি চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।
রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক ড. মো. আজিজুর রহমান বলেন, সংকট কথাটা না বলি, এটা ডে টু ডে সিচুয়েশন ডিমান্ডেড। তো আমরা অবজার্ভ করছি, আমরা নজর রাখছি যাতে বোরো চাষের সমস্যা না হয়। রাজশাহী অঞ্চলে ৩ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। সেচ কার্যক্রম চলছে। জেলা প্রশাসক এ বিষয়টা নজর রাখতে আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।
বোরোতে সেচ দিতে কৃষকদের জন্য জ্বালানি নিশ্চিতের বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যুতের যেটা কানেকশন আছে, সেখানে সেভাবে সেচ দিচ্ছে। মোট কথায় আমরা সজাগ আছি। সেচের বিষয়টা আমরা নিয়ে তৎপর আছি। প্রশাসন অন্য ক্ষেত্রে রেস্ট্রিকশন (নিষেধাজ্ঞা) দিলেও, কৃষকদের যেন ফুয়েল (তেল) পেতে সমস্যা না হয়, এটা আমরা বলছি আলোচনায়। আমরা এটা নিয়ে তৎপর আছি এবং পাম্প মালিকদেরও বলা হয়েছে।
শাহিনুল আশিক/আরকে
