রাজধানীতে ইদানীং মশার উপদ্রব অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ নগরবাসী আক্ষরিক অর্থেই ‘নাকানিচুবানি’ খাচ্ছেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ— দুই সিটি কর্পোরেশন বছরজুড়ে নানা উদ্যোগ নিলেও মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে নতুন উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে জ্বালানি তেলের সংকট। ডিজেলের অভাবে মশা মারার প্রধান কার্যক্রম ‘ফগিং’ বা ওষুধের ধোঁয়া ছিটানো বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
উড়ন্ত মশা নিধনে ব্যবহৃত ফগিং মেশিনের জন্য প্রচুর পরিমাণে ডিজেল প্রয়োজন হয়। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় সোয়া তিন লাখ লিটার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) দুই লাখ লিটার ডিজেলের জরুরি চাহিদা রয়েছে। প্রয়োজনীয় এই জ্বালানি সংগ্রহ করতে দুই সিটি কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারেরা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছেন।
কীটনাশক সরবরাহকারীরা জানিয়েছেন, মশক নিধনে ব্যবহৃত ওষুধের সঙ্গে মেশানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ডিজেল সংকটে ফগিংয়ের ধোঁয়া বন্ধ হলে মশার উপদ্রব কল্পনাতীতভাবে বেড়ে যেতে পারে। ভুক্তভোগী অনেকেই রসিকতা করে বলছেন, সামনে হয়তো মশার ‘স্বর্ণযুগ’ আসছে, যেখানে তারা নির্বিঘ্নে মানুষকে কামড়ানোর উৎসব করবে!

বিজ্ঞাপন
ব্যর্থ নানা ‘থেরাপি’, কোটি কোটি টাকার ব্যয়
মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার ইতিহাস দীর্ঘ। গত এক দশকে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন মশা মারতে প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ডিএনসিসি ৫৬০ কোটি এবং ডিএসসিসি ২৭০ কোটি টাকা খরচ করেছে। চলতি অর্থবছরেও (২০২৪-২৫) মশা নিয়ন্ত্রণে মোট ১৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে (ডিএনসিসি ১১০ কোটি এবং ডিএসসিসি ৪৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা)।
রাজধানীতে মশার উপদ্রব অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছালেও জ্বালানি তেলের সংকটে মশা মারার প্রধান কার্যক্রম ‘ফগিং’ বা ওষুধের ধোঁয়া ছিটানো বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উড়ন্ত মশা নিধনে ব্যবহৃত ফগিং মেশিনের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রায় সোয়া তিন লাখ লিটার এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের দুই লাখ লিটার ডিজেলের জরুরি চাহিদা রয়েছে, যা সংগ্রহ করতে দুই সিটি কর্তৃপক্ষ দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছে
বিজ্ঞাপন
এত বিপুল অর্থ ব্যয়, নানা কর্মসূচি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সত্ত্বেও বছরজুড়ে মশার উৎপাত নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মশা মারতে বিভিন্ন সময়ে অদ্ভুত সব ‘থেরাপি’ ব্যবহার করা হয়েছে। মশা শনাক্ত করতে ড্রোন ওড়ানো হয়েছে। জলাশয়ে ছাড়া হয়েছে ব্যাঙ, হাঁস, তেলাপিয়া ও গাপ্পি মাছ। কিন্তু ড্রোনের ওড়াউড়ি বা ব্যাঙের ডাক— কোনো কিছুই ঢাকার মশার বংশবৃদ্ধি ঠেকাতে পারেনি।
মজুত শেষ পর্যায়ে, ডিজেলের জন্য হাহাকার
সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ডিএনসিসির ৫৪টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ১১০০ লিটার ডিজেল মিশ্রিত মেলাথিয়ন প্রয়োজন হয়। বর্তমানে তাদের কাছে যে পরিমাণ মেলাথিয়ন মজুত আছে, তা দিয়ে বড়জোর আগামী ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত কাজ চালানো সম্ভব হবে। অন্যদিকে, ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডেও একই পরিস্থিতি। তাদের মজুত দিয়েও চলতি মাসের বেশি কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে, উড়ন্ত মশা দমনের প্রধান কীটনাশক ‘ম্যালাথিয়ন ৫% আরএফইউ’ তৈরির জন্য জরুরি ভিত্তিতে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৯৬ লিটার ডিজেল চেয়ে ডিএনসিসি প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এম আর এন্টারপ্রাইজ।
তাদের চিঠিতে বলা হয়েছে, এই কীটনাশক তৈরির প্রধান উপাদানই হলো ডিজেল (প্রায় ৯০.৮৬ শতাংশ)। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সরকার ডিজেল সরবরাহে বিধিনিষেধ আরোপ করায় তারা প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কীটনাশক প্রস্তুত ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা মশক নিধন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। জনস্বার্থ বিবেচনা করে তারা পদ্মা, মেঘনা বা যমুনা অয়েল কোম্পানি থেকে এই পরিমাণ ডিজেল পাওয়ার জন্য ডিএনসিসি প্রশাসনের সুপারিশ ও সহযোগিতা চেয়েছে।
মশা নিয়ন্ত্রণে গত এক দশকে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে এবং চলতি অর্থবছরেও ১৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এত বিপুল অর্থ ব্যয় এবং মশা শনাক্তে ড্রোন, জলাশয়ে ব্যাঙ, হাঁস ও মাছ ছাড়ার মতো অভিনব সব ‘থেরাপি’ ব্যবহার সত্ত্বেও বছরজুড়ে মশার উৎপাত নিয়ন্ত্রণে আসেনি। যথাযথ তদারকির অভাবে মশক নিধন কার্যক্রমের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে
একইভাবে, ডিএসসিসিও মশা নিধনের ফগিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) কাছে জরুরি ভিত্তিতে ২ লাখ লিটার ডিজেল বরাদ্দের আবেদন করেছে। বিপিসি চেয়ারম্যানকে লেখা চিঠিতে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে মশার উপদ্রব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়মতো কীটনাশক পাওয়া না গেলে মশা নিধন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যা জনদুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা জানান, ডিএসসিসি ৭৫ ওয়ার্ডে ফগিংয়ের জন্য প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৪ হাজার লিটার ডিজেল লাগে। এখন যে মজুত আছে, তা দিয়ে এই মাস চলবে। বিপিসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে, আশা করা যায় সমাধান হবে। ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তাও আশা প্রকাশ করেছেন যে, সংকট তৈরি হবে না।

নগরবাসী অতিষ্ঠ, নেই কাউন্সিলরদের তদারকি
রাজধানীতে হঠাৎ মশার উপদ্রব বাড়ায় নগরবাসীর ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। দিন-রাত, ঘর-অফিস, রাস্তাঘাট বা বাজার— সবখানেই মশার রাজত্ব। দিনের বেলায়ও অনেক এলাকায় কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হচ্ছে।
ভোগান্তির মাত্রা আরও বেড়েছে কারণ গত প্রায় দেড় বছর ধরে সিটি কর্পোরেশনে কোনো ওয়ার্ড কাউন্সিলর নেই। যথাযথ তদারকির অভাবে মশক নিধন ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে।
বাসাবো এলাকার বাসিন্দা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিনই মনে হচ্ছে মশা বাড়ছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনকে ওষুধ ছিটাতে দেখি না। দিনে ও রাতে সবসময়ই কয়েল জ্বালাতে হচ্ছে বা মশারির ভিতরে থাকতে হচ্ছে।
সিটি কর্পোরেশনগুলোর কাছে বর্তমানে যে পরিমাণ মেলাথিয়ন মজুত আছে, তা দিয়ে বড়জোর চলতি মাসের শেষ বা আগামী মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত কাজ চালানো সম্ভব হবে। ডিজেল সংকটে ফগিং বন্ধ হলে মশার উপদ্রব কল্পনাতীতভাবে বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। দিন-রাত মশার কামড়ে অতিষ্ঠ নগরবাসীকে দিনের বেলাতেও কয়েল জ্বালিয়ে বা মশারির ভিতরে থাকতে হচ্ছে
মিরপুরের আব্দুল্লাহ আল মামুনও একই অভিযোগ করে বলেন, সন্ধ্যা নামলে মশা যেন তেড়ে আসে। বাসায় ছোট বাচ্চা থাকায় কয়েল জ্বালাতে পারি না, সারাদিন মশারির ভিতরে রাখতে হয়।

প্রশাসকদের আশ্বাস ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও জোরদার করতে কর্মীদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে, শুধু ওষুধ প্রয়োগ করে মশা নিয়ন্ত্রণ কঠিন। আমারা আমাদের কাজের পাশাপাশি চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না রাখলে এবং সচেতনতা সৃষ্টি করতে না পারলে মশা নিয়ন্ত্রণ সহজ নয়।
ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, মশক নিধন কার্যক্রমে কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন করা হবে না। অবহেলা, ব্যর্থতা বা দুর্নীতি দূর করতে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। কোনো স্থাপনায় মশার উৎপত্তিস্থল পাওয়া গেলে এবং বারবার সতর্ক করার পরও ব্যবস্থা না নিলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশনকে গুরুত্বসহকারে কাজ করতে হবে। নিজেদের কাজের পাশাপাশি সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে, বিশেষ করে জনসচেতনতা সৃষ্টি করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা খুব জরুরি।
ডিজেলের কান্না থামলে মশার হাসি আসবে কি না, তা এখন নির্ভর করছে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর। তবে, কোটি কোটি টাকার প্রকল্প আর অভিনব সব থেরাপির ব্যর্থতার পর নগরবাসী এখন বাস্তবসম্মত সমাধানের অপেক্ষায়।

মশা মারতে ২ সিটির বরাদ্দ দেওয়া অর্থ
জানা গেছে, মশা নিয়ন্ত্রণে গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন মোট ১৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ১১০ কোটি টাকা এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) ৪৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। এছাড়া, গত এক দশকে মশা মারতে দুই সিটি কর্পোরেশন প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ডিএনসিসি ৫৬০ কোটি এবং ডিএসসিসি ২৭০ কোটি টাকা খরচ করেছে।
ডিএনসিসি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৪ কোটি টাকা (সংশোধিত বাজেট ১১.৯৫ কোটি), ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৩.২৫ কোটি টাকা (সংশোধিত বাজেট ১৬.৮৫ কোটি), ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২০ কোটি টাকা (সংশোধিত বাজেট ১৭.৫০ কোটি), ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২১ কোটি টাকা (সংশোধিত বাজেট ১৭.৫০ কোটি), ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৯.৩০ কোটি টাকা (সংশোধিত বাজেট ৫৮ কোটি), ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭০ কোটি টাকা (সংশোধিত বাজেট ৫০.৫০ কোটি), ২০২১-২২ অর্থবছরে ৮৫ কোটি টাকা (সংশোধিত বাজেট ৫১.৫৩ কোটি), ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭৬ কোটি টাকা (সংশোধিত বাজেট ৫২.৫০ কোটি), ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮৪.৫০ কোটি টাকা (সংশোধিত বাজেট ৮৭.৫০ কোটি) এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়।
অন্যদিকে, ডিএসসিসি গত ১০ অর্থবছরে প্রায় ২৭০ কোটি টাকা মশক নিধনে বরাদ্দ দেয়। যার মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১২.৫০ কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১১.৫০ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৫.৬০ কোটি টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৬ কোটি টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩২.৭৫ কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২০.০২ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩১.০২ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৭ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৮.৮৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৪.৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এএসএস/এমএআর/
