বিজ্ঞাপন

কুষ্টিয়ায় পীর হত্যা

‘ভাইকে ঘর থেকে টেনে নিচে নামিয়ে এলোপাথাড়ি মারধর ও কোপাতে থাকে’

অ+
অ-
‘ভাইকে ঘর থেকে টেনে নিচে নামিয়ে এলোপাথাড়ি মারধর ও কোপাতে থাকে’

ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের শামীম পীরের দরবার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গতকাল শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় ‘শামীম বাবার দরবার শরিফ’ নামে পরিচিত স্থাপনাটিতে হামলার ঘটনা ঘটে। পুরোনো একটি ভিডিও সামনে এনে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় পীর শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরকে (৬৫)। দরবারে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস গিয়ে আগুন নেভায়। 

বিজ্ঞাপন

নিহত শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর ওই গ্রামের মৃত জেছের আলীর ছেলে। তিনি ওই দরবার শরিফের পীর ছিলেন। হামলার ঘটনায় তার আরও তিন অনুসারী জুবায়ের, মহন আলী ও জামিরুন নেছা আহত হয়েছেন। তারা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

রোববার (১২ এপ্রিল) সকালে দরবারে গিয়ে দেখা যায়, দরবারের দুটি দালানের ভেতরে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। আগুনে পুড়ে গেছে দুটি ঘর। যার মধ্যে একটিতে পীর নিজে বসবাস করতেন। সকাল থেকেই বিভিন্ন বয়সী নারী, পুরুষ, শিশু দরবারের এসে ঘুরে ঘুরে দরবারের ধ্বংসস্তূপ দেখছেন। ঘটনার পর থেকে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও র‌্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সংসদ সদস্যও ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেছেন। সকালে খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, শামীম পবিত্র কুরআন সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন- এই ধরনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। যা ছিল কয়েক বছর আগের। গত শুক্রবার আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

বিজ্ঞাপন

তারা বলেন, গতকাল সকালে শামীমের দরবার থেকে কিছু দূরেই আবেদের ঘাট এলাকায় ঘোষণা দিয়ে শতাধিক মানুষ জড়ো হয়। এরপর দুপুর আড়াইটার দিকে মিছিল নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে ওই দরবারে হামলা চালায় ও আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনার সময় পুলিশ উপস্থিতি ছিল।

নিহত পীর শামীমের বড় ভাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক ফজলুর রহমান বলেন, দুপুরে নামাজ শেষ করে বাড়িতে এসে খাচ্ছিলাম। এরপর মানুষের চিল্লাচিল্লির শব্দ শুনতে পাই। বাড়ির বাইরে বের হয়ে দেখি দরবারের সামনে মানুষ ব্যাপক ভাঙচুর চালাচ্ছে। এ সময় ভাইকে দোতলায় তার থাকার ঘর থেকে টেনে নিচে নামিয়ে এলোপাথাড়ি মারধর ও কোপাতে থাকে। পরে পুলিশের গাড়িতে করে ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন জানান, শামীমের মুখমণ্ডলে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও আঘাত করা হয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহামুদ জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা তারা দেখেছেন। ভিডিওটি পুরোনো বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভিডিওটি দেখে মুসল্লি ও বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তার আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা আছে।

তিনি আরও জানান, নিহতের মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্তের কাজ চলমান। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ মামলা করেনি। তবে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) জানান, বেলা ১টার দিকে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। গোটা শরীরে একাধিক জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং মাথা, ঘাড়, পিঠে তুলনামূলক গভীর যখমের আলামত দেখা যায়। একাধিক যখমের কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ তাকে উদ্ধার করলেও জনতার তুলনায় সদস্য সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে। ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত। বিজিবির টহলসহ সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাড়িতেও পুলিশি পাহারা থাকবে। এ ছাড়া দৌলতপুরের হোসেনাবাদের বাসিন্দা লালনশিল্পী শফি মণ্ডলের গ্রামের বাড়িতেও পুলিশ পাহারা রাখা হয়েছে। যদিও শফি মণ্ডল বর্তমানে ঢাকায় রয়েছেন।

সকালে খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজ শেখ জয়নুদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের জানান, যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে এটা কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে আমাদের প্রচলিত আইনেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতো। আমি চাইবো এই ফিলিপনগর এলাকার মানুষের কাছ থেকে আর কোনো আইনশৃঙ্খলার অবনতি যেন না হয়। আমাদের কোনো আটক নেই এখনও। আমরা এর সঠিক বিচার করবো।

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে। এ ঘটনায় কোনো ছাড় হবে না।

রবিউল আলম ইভান/আরএআর

বিজ্ঞাপন