বিজ্ঞাপন

ময়মনসিংহ শহরে এক কিলোমিটারের মধ্যে চার শতাধিক ক্লিনিক-হাসপাতাল

অ+
অ-
ময়মনসিংহ শহরে এক কিলোমিটারের মধ্যে চার শতাধিক ক্লিনিক-হাসপাতাল

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ঘিরে কয়েকশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। নগরের চরপাড়া এলাকার অলিগলিতে দিন দিন বাড়ছেই এসব প্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্যসেবার নামে মানহীন এসব প্রতিষ্ঠানে দালালদের মাধ্যমে গ্রামের নিরীহ মানুষদের ধরে এনে পকেট কাটার সঙ্গে জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে। অনেকে অস্ত্রোপচারের টেবিলেই প্রাণ হারাচ্ছেন। অথচ এসব দেখার কথা যাদের, সেই স্বাস্থ্য বিভাগ যেন মুখে কুলুপ এঁটেছে। 

বিজ্ঞাপন

ময়মনসিংহ নগরের চরপাড়া, ব্রাহ্মপল্লী, ভাটিকাশর, বাঘমারাসহ আশপাশের এলাকার অলিগলিতে গড়ে উঠেছে শত শত চিকিৎসাকেন্দ্র। যার অনেকগুলোই পরিচালিত হচ্ছে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নীতিমালা ছাড়াই। 

গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার সরেজমিন ঘুরে নামে-বেনামে চিকিৎসা কেন্দ্রের গিজগিজে অবস্থা দেখা যায়। স্থানীয় অন্তত ২০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ময়মনসিংহে বেসরকারি চিকিৎসা খাত একদিকে যেমন রোগীদের বিকল্প সেবা দিচ্ছে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীনতা ও অনিয়মের কারণে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক, অদক্ষ জনবল, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং দালালচক্র- সব মিলিয়ে রোগীদের নিরাপত্তা বড় প্রশ্নের মুখে। কঠোর নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ না হলে এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার বড় মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। 

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে প্রায় ৭ শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। তবে এর বাইরেও অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৩ গুণ। শুধু ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে অন্তত সাড়ে ৪০০ ক্লিনিক ও হাসপাতাল। ১ হাজার শয্যার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সব সময় ধারণক্ষমতার তিন-চার গুণ বেশি রোগী থাকে। দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার আশায় অনেক রোগী বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে বাধ্য হন। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগায় দালালচক্র। তারা রোগীদের প্রলুব্ধ করে নিয়ে যায় মানহীন এসব প্রতিষ্ঠানে। 

বিজ্ঞাপন

এদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠছে নতুন নতুন ক্লিনিক। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে অনেক ক্ষেত্রেই নেই পর্যাপ্ত জনবল, মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। ফলে প্রতারিত হচ্ছেন রোগীরা, ঝুঁকিতে পড়ছে তাদের জীবন। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্লিনিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছে চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার। এর ফলে ঘটছে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা- এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও রয়েছে। কিছু কিছু ঘটনা প্রকাশ্যে আসলেও অধিকাংশ ঘটনা বিভিন্ন ভাবে ধামাচাপা দেওয়া হয়।

২০২৩ সালের ১০ জুলাই দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান নূপুর নাকের পলিপাসের চিকিৎসার জন্য নগরীর ব্রাহ্মপল্লীর নিউ রুম্পা নার্সিং হোম অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভর্তি হন। অস্ত্রোপচারের সময়ই তার মৃত্যু হয়। 

বিজ্ঞাপন

নুসরাতের বাবা মো. রাহাত বলেন, সকাল ৭টায় মেয়েকে ক্লিনিকে ভর্তি করি। রাত ১০টার দিকে মারা যায়। ডাক্তাররা আমার মেয়েকে ফেলে রেখে চলে গেছে। শহরের অধিকাংশ ক্লিনিকই এই রকম, মাঝেমধ্যেই ভুল চিকিৎসায় মানুষ মারা যায়।

একইভাবে গত বছর ১২ অক্টোবর বলাশপুর এলাকার শেফালীর মেয়ে শান্তার মৃত্যুর ঘটনাও প্রশ্ন তুলেছে বেসরকারি ক্লিনিকের চিকিৎসার মান নিয়ে। শেফালী বলেন, সিজার করার জন্য ব্রাহ্মপল্লী রোডের বেসরকারি ভেনাস হাসপাতালে মেয়েকে ভর্তি করেছিলাম। সিজার করার পরে মারা যায় মেয়ে। আমার আর কেউ নাই, আমার একটা মেয়েই ছিল। ডাক্তারের ভুলে আমি তো মেয়ে হারা হইলাম।

শান্তার নানি নুর জাহান জানান, সিজার করার পর সেলাই কেটে আবার সেলাই করেছে। আমার নাতি তো সেখানেই মারা গেছে। পরে তারা মরাটাই আইসিওতে পাঠাইছে।

ময়মনসিংহে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর ওপর কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম চললেও নিশ্চুপ স্বাস্থ্য বিভাগ। 

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, ময়মনসিংহে যে সব ক্লিনিক চলছে প্রত্যেকটি ক্লিনিকই অনুমতি নিয়েই চলছে। একটি বৈধভাবে অনুমতি নিয়ে চলছে। আরেকটি অবৈধভাবে অনুমতি নিয়ে চলছে। বৈধের চেয়ে অবৈধভাবে অনুমতি নিয়ে চলা ক্লিনিকের সংখ্যা অনেক বেশি। এসব ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার কারণে রোগীরা প্রতিনিয়ত হয়রানির স্বীকার হচ্ছে, আর্থিকভাবে ক্ষতি হচ্ছে এবং তাদের জীবনের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় দেখা যাচ্ছে অপরিকল্পিত, অনুমোদনহীন এসব ক্লিনিকে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। মাঝেমাঝে কিছু অভিযান চালানো হয়, এই অভিযান চালানোটাও লোক দেখানো।

সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যে একই রকম তা নয়। কিছু প্রতিষ্ঠান সুনামের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে একটি হলো স্বদেশ হাসপাতাল প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামসুদ্দোহা মাসুম বলেন, ময়মনসিংহে প্রচুর ক্লিনিক রয়েছে। সবগুলো ক্লিনিকই স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। কিন্তু অনেকগুলো ক্লিনিকের লাইসেন্স নেই। নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না। আমরা সব সময় এর বিরুদ্ধে। আমরা চাই স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো একটা নিয়মের মধ্যে চলুক। অনেক প্রতিষ্ঠানে অবহেলার কারণে রোগীর সঙ্গে অঘটন ঘটছে। অনেক সময় ওইসব প্রতিষ্ঠানের কারণে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোর সুনাম ক্ষুণ্ন হয়।

বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ময়মনসিংহ শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. মুনসুর আলম চন্দন বলেন, ক্লিনিকের কিছু নীতিমালা আছে। ওই নীতিমালার মধ্য দিয়েই ক্লিনিক ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়। আমাদের সংগঠন থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যারা ক্লিনিক ব্যবসা পরিচালনা করবে তাদেরকে অবশ্যই লাইসেন্সধারী হতে হবে। অন্যথায় সরকার যদি তাদের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নেয়, তাহলে আমরা অবশ্যই সরকারকে সহযোগিতা করবো। যাতে সুষ্ঠুভাবে সাধারণ মানুষ সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারে, সঠিক রোগ নির্ণয় হয়। 

এদিকে বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। স্বাস্থ্য বিভাগের ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, ময়মনসিংহের প্রতিটি ক্লিনিকেরই লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে। নবায়ন করতে পরিবেশের ছাড়পত্র লাগে। ছাড়পত্রের জন্য অনেক প্রতিষ্ঠানই নবায়ন করতে পারছে না। আমরা যখন ভিজিটে বের হই, লাইসেন্সহীন ক্লিনিক পেলে আমরা সেটা বন্ধ করে দিয়ে আসি। বর্তমানে এতো বেশি ক্লিনিক হয়ে গেছে যে, আমরা রুটিন অনুযায়ী ভিজিটের আওতায় আনতেও পারি না। আমরা ম্যাজিস্ট্রেট, র‍্যাব, ভোক্তা অধিকারের পক্ষ থেকে ঘনঘন যদি ভিজিট করতে পারি তাহলে ক্লিনিকগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

আরএআর