বিজ্ঞাপন

কীসের ঘাটতি হামের প্রাদুর্ভাব উসকে দিলো?

অ+
অ-
কীসের ঘাটতি হামের প্রাদুর্ভাব উসকে দিলো?

একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে আসা হামের আবারও উদ্বেগজনক পুনরুত্থান হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় সংক্রমণ দ্রুত বেড়েছে, সঙ্গে শিশু মৃত্যুর হারও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই উত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি কোভিড-পরবর্তী সময়ে দেখা দেওয়া বৈশ্বিক প্রবণতারই অংশ। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংক্রমণের গতি ও ব্যাপ্তি গভীরতর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

বিজ্ঞাপন

হাম মানবদেহে সংক্রমিত সবচেয়ে সংক্রামক ভাইরাসগুলোর একটি। এটি অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিশেষ করে যেখানে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় দুর্বল থাকে। টিকার কভারেজের সামান্য পতনও প্রাদুর্ভাবের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

মহামারিবিদ্যার তথ্য অনুযায়ী, সংক্রমণ ঠেকাতে প্রায় ৯৫ শতাংশ দুই ডোজ টিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দুঃখজনক হলেও সত্য সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এই টার্গেট পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারির পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০–২০২২ সময়ে লকডাউন এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নাজুক অবস্থা ও সেবার বিঘ্ন ঘটার কারণে কোটি কোটি শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এর ফলেই ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে হাম সংক্রমণ বেড়েছে যা নিম্ন ও উচ্চ উভয় আয়ের দেশেই দেখা গেছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী হাম টিকার প্রথম ডোজের বৈশ্বিক কভারেজ ২০১৯ সালের ৮৬ শতাংশ থেকে ২০২১ সালে প্রায় ৮১ শতাংশে নেমে আসে। ফলে আনুমানিক ২.৫ কোটি শিশু সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে টিকা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। যা ভাইরাস দ্রুত সংক্রমিত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে। সেই অর্থে বাংলাদেশের বর্তমান প্রাদুর্ভাব একটি বৈশ্বিক অবস্থার কিছুটা প্রতিফলন বলা যেতে পারে।

তবে কেবল বৈশ্বিক ব্যাখ্যাই যথেষ্ট নয় বা বাংলাদেশের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের মাত্রা শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতি দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাবে না। এদেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অদক্ষতা এবং আচরণগত কিছু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রতিফলন এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা।

একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল টিকা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, যেমন সিরিঞ্জ এবং কোল্ড-চেইন সরঞ্জাম ইত্যাদি সংগ্রহে বিলম্ব করা। সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বল্পমেয়াদি বিঘ্নও নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে এমন একটি ব্যবস্থায় যা ধারাবাহিক মাঠপর্যায়ের সেবার ওপর নির্ভরশীল। এখানে ক্রয়ব্যবস্থার অদক্ষতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, Gavi-এর অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক প্রতিবেশী দেশ এখন সরাসরি নিজেদের ব্যবস্থার মাধ্যমে Gavi তহবিল পরিচালনা করতে পারলেও, বাংলাদেশ এখনো অনেক ক্ষেত্রে UNICEF ও WHO-এর মাধ্যমে এই অর্থ ব্যবস্থাপনা করে থাকে। এতে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হয়, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে ধীর করে দেয়। ফলে সময়মতো টিকা সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

শুধু বাজেট বরাদ্দই যথেষ্ট নয়, অর্থের সময়মতো ছাড়, দক্ষ ব্যবহার এবং সঠিক ক্রয় প্রক্রিয়া সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বিশেষ ভূমিকা রাখে। কোভিড পরবর্তী সময়ে এইসব জায়গায়ও ব্যাপক ঘাটতি দেখা গেছে।

এই দুর্দশার বড় কারণ ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (HPNSP)-এর অধীনে বিদ্যমান অপারেশনাল পরিকল্পনা (OP) প্রত্যাহার ও পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত।

...আরেকটি সমস্যা ছিল নির্ভরযোগ্য টিকাদান সংক্রান্ত ডাটা এবং তার কার্যকর ব্যবহারের অভাব। সময়োপযোগী ও উচ্চমানের ডাটা না থাকলে কোন এলাকায় কভারেজ কম, কোথায় ‘জিরো-ডোজ’ শিশু বেশি এসব ব্যাপার দ্রুত শনাক্ত করা যায় না। ফলে প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়ে।

দুর্নীতি ও অনিয়ম মোকাবিলার উদ্দেশ্য থাকলেও এই পুনর্গঠনের সময়কাল ও পদ্ধতি একটি শূন্যতা সৃষ্টি করে যা নিয়মিত কার্যক্রমকে স্থবির করে দেয়। বিকল্প ব্যবস্থা না করেই বিদ্যমান কাঠামো ভেঙে ফেলে দেওয়ায় অর্থপ্রবাহ ও ক্রয় অনুমোদনের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, যা ইপিআই কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।

ফলে এমন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হয় যেখানে প্রশাসনিক সংস্কার জীবনরক্ষাকারী সেবার ধারাবাহিকতার চেয়ে অগ্রাধিকার পায়, যার ফলে ২০২৪ সালের শেষভাগ ও ২০২৫ সালের শুরুর দিকে বিসিজি ও এমআর টিকাসহ কেন্দ্রীয় ভাণ্ডার অনেক কমে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ছন্দপতন হওয়া যা অপারেশনাল প্লানের ব্যাঘাতের কারণে ঘটে।

বাংলাদেশের টিকা কার্যক্রমের সফলতা নির্ভুল মাইক্রোপ্ল্যানিং ও নিয়মিত আউটরিচ কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক কালের এসব কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। অনেক এলাকায় নির্ধারিত আউটরিচ সেশন স্থগিত বা বাতিল হয়েছে, ফলে বহু শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সময়ের সাথে এই শিশুদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়। এই অবস্থা ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।

এক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা ছিল নির্ভরযোগ্য টিকাদান সংক্রান্ত ডাটা এবং তার কার্যকর ব্যবহারের অভাব। সময়োপযোগী ও উচ্চমানের ডাটা না থাকলে কোন এলাকায় কভারেজ কম, কোথায় ‘জিরো-ডোজ’ শিশু বেশি এসব ব্যাপার দ্রুত শনাক্ত করা যায় না। ফলে প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়ে।

স্বাস্থ্যকর্মী সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। স্বাস্থ্য সহকারীদের ধর্মঘট এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীর ঘাটতির কারণে বাড়ি বাড়ি টিকাদান ও ফলো-আপ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বাংলাদেশের টিকাদান মডেল দীর্ঘদিন ধরে এই তৃণমূল কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল; তাদের অনুপস্থিতি তাৎক্ষণিক সেবার ঘাটতি সৃষ্টি করে। অনেক এলাকায় দীর্ঘদিন শূন্যপদ পূরণ না হওয়ায় নিয়মিত টিকাদান কভারেজ ও নজরদারি সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথাকথিত ‘জিরো-ডোজ’ শিশুদের সংখ্যা বৃদ্ধি যারা কোনো নিয়মিত টিকা পায়নি। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মহামারির সময় এমন একটি গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে যারা প্রথম ডোজ নেয়নি বা টিকাদান সম্পূর্ণ করতে পারেনি। মহামারি-পরবর্তী সময়েও এই শিশুদের অনেককে ক্যাচ-আপ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়নি, ফলে এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, কোভিড-পরবর্তী সময়ে টিকাদান কভারেজ কমে যাওয়ার বিষয়ে ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আগেই সতর্ক করেছিল এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছিল। কিন্তু সেই মাত্রার জরুরি প্রতিক্রিয়া যথাসময়ে দেখা যায়নি।

নগরায়ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। জাতীয়ভাবে টিকাদান কভারেজ তুলনামূলকভাবে বেশি মনে হলেও এর আড়ালে বড় ধরনের আঞ্চলিক বৈষম্য রয়েছে। শহরের বস্তি এবং দুর্গম এলাকায় বিভিন্ন কারণে কভারেজ কম থাকে। এসব এলাকা সংক্রমণ টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আচরণগত কারণও এখানে ভূমিকা রাখছে বলে অনেকে মনে করে থাকে। যদিও বাংলাদেশে টিকা নিতে অনীহার মাত্রা কম ছিল, সাম্প্রতিক সময়ে ভুল তথ্য, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা এবং সরকারি সেবার প্রতি অনাস্থার কারণে কিছু এলাকায় অনীহা বেড়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। জনবহুল এলাকায় সামান্য অনীহাও বড় প্রভাব ফেলতে পারে, যেখানে হার্ড ইমিউনিটি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশে হামের পুনরুত্থান কেবল টিকাদান কার্যক্রমের ব্যর্থতা নয়, এটি একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতার প্রতিফলন। অতীতে সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও উচ্চ কভারেজ অর্জনের যে সাফল্য বাংলাদেশ দেখিয়েছে, তা প্রমাণ করে আমরা চাইলে আবারও এটি সম্ভব।

বর্তমান সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের পাশাপাশি টিকা কার্যক্রম ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। তাৎক্ষণিকভাবে একটি ‘ক্র্যাশ’ ও সমন্বিত ইপিআই কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি যা বিশেষভাবে টিকা মিস করা শিশুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হবে, বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়। যদিও সরকার ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, তবে এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন কতটা কার্যকরভাবে হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয় এবং নিবিড় তদারকি প্রয়োজন।

স্বল্পমেয়াদে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের লক্ষ্য করে বৃহৎ পরিসরে ‘ক্যাচ-আপ’ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো দ্রুত শনাক্ত করে সেখানে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে, নজরদারি জোরদার করতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও ভুল তথ্য মোকাবিলায় কার্যকর যোগাযোগ কৌশলও অপরিহার্য।

মধ্যমেয়াদে নিয়মিত টিকাকার্যক্রম ব্যবস্থার ভিত্তি পুনর্গঠন করতে হবে। শূন্যপদ পূরণ, নিয়মিত আউটরিচ কার্যক্রম চালু করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে মাইক্রোপ্ল্যানিং জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে Gavi তহবিল ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্থতাকারীর ব্যবস্থা কমিয়ে আরও সরাসরি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ডাটা ব্যবস্থাপনা জোরদার করে টিকা মিস করা শিশুদের দ্রুত শনাক্ত ও ফলো-আপ নিশ্চিত করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের শুধু প্রতিটি জেলায় নয়, প্রতিটি সম্প্রদায়ে অন্তত ৯৫ শতাংশ দুই ডোজ টিকাদান কভারেজ বজায় রাখতে হবে। এর জন্য টেকসই অর্থায়ন, দক্ষ ক্রয় ব্যবস্থা, শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে টিকাদান কার্যক্রমের কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

অবশেষে, বাংলাদেশে হামের পুনরুত্থান কেবল টিকাদান কার্যক্রমের ব্যর্থতা নয়, এটি একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতার প্রতিফলন। অতীতে সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও উচ্চ কভারেজ অর্জনের যে সাফল্য বাংলাদেশ দেখিয়েছে, তা প্রমাণ করে আমরা চাইলে আবারও এটি সম্ভব।

তবে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে হামের পরে আরও রোগের প্রাদুর্ভাব হওয়া অসম্ভব নয়।

ড. শাফিউন নাহিন শিমুল : অধ্যাপক ও পরিচালক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়