হারিয়ে যেতে বসেছে চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশেষ ঐতিহ্যবাহী নীল নাচ। হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ, শিবের গাজন বা উৎসবের অংশ হিসেবে বরগুনায় এখনও এ নীল নাচের আয়োজন করছেন। তবে বর্তমান প্রজন্মের মাঝে এ লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় নীল নাচ দলের শিল্পী এবং সংস্কৃতিকর্মীরা।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (১৩ এপ্রিল) চৈত্র মাসের শেষ দিনে সকাল থেকেই বরগুনায় বিভিন্ন এলাকার হিন্দু ধর্মালম্বীদের বাড়িতে স্বল্প পরিসরে এ নীল নাচের আয়োজন দেখা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নীলপূজা বা নীলষষ্ঠী সনাতন ধর্মালম্বীদের একটি লোকোৎসব। যা মূলত শিব-দুর্গার বিবাহ উৎসব। বাঙ্গালী গৃহিণীরা নিজের সন্তানের মঙ্গল কামনা এবং রোগ থেকে সুস্থ জীবনের কামনায় নীলষষ্ঠী ব্রত পালনের মাধ্যমে চৈত্র সংক্রান্তির চড়ক উৎসবের আগের দিন নীলপূজা করতেন। এ সময় বিভিন্ন নীল নাচের দলের সদস্যরা নানারূপে সুসজ্জিত হন। পরে তারা বাহারি ওই সাজ-পোশাকে সজ্জিত হয়ে বিভিন্ন বাড়িতে ঘুরে ঘুরে নেচে-গেয়ে চাল, ডাল এবং টাকা পয়সা সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে সংগৃহীত ওই চাল, ডাল এবং টাকা-পয়সা দিয়েই তারা মূল নীলপূজার আয়োজন করেন।

বরগুনায় এক সময় চৈত্র মাসের এ সময়ে পাড়ায় পাড়ায় নীল নাচের ধুম পড়লেও এখন এই সংস্কৃতি প্রায় হারাতে বসেছে। সরেজমিনে ঘুরে বরগুনা পৌরশহরের বিভিন্ন হিন্দু ধর্মালম্বীদের বাড়িতে স্বল্প পরিসরে আয়োজন করা একটি নীল নাচের দলকে দেখা যায়।
বংশ পরম্পরায় পাওয়া ঐতিহ্যকে ধরে রাখতেই তারা এ নীল নাচ করছেন। দলটির সদস্যরা নীল নাচের জন্য শিব, কৃষ্ণ, রাধা ও গোবিন্দ সেজে বিভিন্ন বাড়িতে ঘুরে ঘুরে নীল নাচ করছেন। মূলত সংসার জীবনে নানা ধরনের অমঙ্গল দূর করতেই তাদের এ আয়োজন। তবে বরগুনায় এক সময়ে একাধিক নীল নাচের দল থাকলেও বর্তমানে দল কমে হারাতে বসেছে নীল নাচের ঐতিহ্য। আর এ কারণেই নতুন প্রজন্মের মাঝে এ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলেও মনে করছেন স্থানীয় নীল নাচের শিল্পী এবং সংস্কৃতিকর্মীরা।
বিজ্ঞাপন
নীল নাচ দলের সদস্য বিধান কৃষ্ণ রায় ঢাকা পোস্টকে বলেন, সনাতন ধর্মালম্বীদের হাজার বছরের ঐতিহ্য হচ্ছে নীল নাচ। এটা শুধু চৈত্র সংক্রান্তির সময়েই আয়োজন করা হয়। সংস্কৃতিমনা লোকজন পিছিয়ে যাওয়ায় বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী এ নীল নাচ হারাতে বসেছে। তবে বরগুনায় শতবছর আগে শুরু হওয়া এ ঐতিহ্যকে এখন পর্যন্ত আমরা ধরে রেখেছি।
জয়দেব কৃষ্ণ রায় নামে আরেক সদস্য ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিগত সময়ে চৈত্র মাসে বসন্তের প্রকোপ ছিল। ওই সময়ে বিপদ থেকে রক্ষা পেতে বিভিন্ন বাড়িতে ঘুরে ঘুরে নীল নাচের আয়োজন করা হত। আমাদের বাবা দাদারা এ আয়োজন করেছেন, আমরা সেই ঐতিহ্য এখন পর্যন্ত ধরে রেখেছি। তবে সাজসজ্জাসহ বিভিন্ন খরচ যোগাতে না পারায় এখন নীল নাচ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
কৃষ্ণ মালাকার নামে আরেক সদস্য ঢাকা পোস্টকে বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমি নীল নাচে অংশগ্রহণ করছি। আমরা ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি। তবে আমাদের এ আয়োজনের জন্য মাঝেমধ্যে প্রশাসনিকভাবেও সহযোগিতা পাই। আবার নিজেদের টাকায় অনেক সময় নীল নাচের আয়োজন করতে হয়। নীল নাচের মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষের ঘরে গিয়ে তাদের যেকোনো বিপদ থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করি। এ সময় মানুষের থেকে যা পাই, তা দিয়েই আমরা এ নীল নাচের খরচ বহন করি। তবে অনেক সময় যে টাকা পাই, তা দিয়ে খরচ বহন করা সম্ভব হয় না।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে আরিফ রহমান নামে বরগুনার এক সংস্কৃতিক কর্মী ঢাকা পোস্টকে বলেন, গ্রাম বাংলা ঐতিহ্যবাহী এক সময়ের নীল নাচ এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। ছোট বেলায় আমরা প্রতি বছরই এ নীল নাচ দেখেছি। তবে এখন নীল নাচের ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্তির পথে হওয়ায় বর্তমান প্রজন্ম তা আর হয়তো দেখবে না। এ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি।
আব্দুল আলীম/এসএইচএ
