একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ, অসদাচরণ, অনিয়ম, হুমকি, মামলা আর সংঘর্ষের ঘটনা ঘিরে উত্তাল ছিল রাণীশংকৈল উপজেলা। সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. নুরুন্নবী সরকারকে অবশেষে বদলি করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (১৩ এপ্রিল) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এ সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করে। উপসচিব তাসনুভা নাশতারান স্বাক্ষরিত ওই আদেশে তাকে রাণীশংকৈল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় থেকে বদলি করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
আদেশে আগামী ২০ এপ্রিলের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগদান না করলে সেদিনই তাকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত হিসেবে গণ্য করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই বদলির পেছনে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও অভিযোগের পাহাড় রয়েছে বলে জানান রাণীশংকৈল উপজেলার মানুষেরা।
অভিযোগ রয়েছে, রাণীশংকৈলে যোগদানের পর থেকেই পিআইও নুরুন্নবী সরকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে আসছিলেন। সরকারি অফিস কক্ষে ধূমপানসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে এর আগেই তার অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন এলাকাবাসী। এমনকি সেই মানববন্ধনের সংবাদ প্রকাশের জেরে স্থানীয় সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম সুজন ও ফারুক আহম্মেদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ‘চাদাবাজি’ অভিযোগে মামলা দায়েরের ঘটনাও তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, উপজেলা ডাকবাংলোয় প্রায় এক মাস অবস্থান করে সাড়ে ১৪ হাজার টাকার ভাড়া বকেয়া রাখার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বকেয়া টাকা চাইতে গেলে ডাকবাংলোর কেয়ারটেকার মো. বেলাল হোসেনকে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেন তিনি। পরে এ ঘটনায় কেয়ারটেকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন।
এর মধ্যেই চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধের জেরে প্রকাশ্যে বাচোর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. আক্কাশ আলীকে ‘সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে পুতে ফেলার’ হুমকি দেন পিআইও। পরে ইউপি সদস্য তার বিরুদ্ধে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
বিজ্ঞাপন
গত ৭ এপ্রিল সরকারি সময়সূচি লঙ্ঘন করে রাত পর্যন্ত অফিস চালু রাখার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গেলে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পিআইওর তর্কাতর্কি থেকে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে নেতাকর্মীদের একটি কক্ষে আটকে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হলে উপজেলা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন।
ঘটনার পরপরই গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেন পিআইও। পরে পুলিশ ওই উপজেলার ভান্ডারা এলাকায় অভিযান চালিয়ে জিয়াউর রহমান ও দিনাজপুরের সুইহাড়ি এলাকা থেকে গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মামুনুর রশিদ মামুনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এ ছাড়া, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে কর্মরত থাকাকালেও তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে বলে জানা গেছে। এমনকি অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ৬ কোটি টাকার একটি বিলে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয় বাসিন্দা নাজমুল হোসেন, আনোয়ার আলী, জাহাঙ্গীর আলম ও সুজন আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়া ওই কর্মকর্তার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ জমে উঠেছিল। একজন সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে যেখানে জনবান্ধব আচরণ প্রত্যাশিত, সেখানে বারবার অসৌজন্যমূলক আচরণ, হুমকি এবং মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগে মানুষ আস্থাহীনতায় ভুগছিল।
তারা আরও বলেন, তার বদলিতে উপজেলার মানুষের মধ্যে আপাতত স্বস্তি এসেছে। তবে শুধু বদলি করলেই হবে না, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রফিকুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, রাণীশংকৈল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. নুরুন্নবী সরকারকে বদলি করা হয়েছে, বিষয়টি আমিও শুনেছি।
রেদওয়ান মিলন/এএমকে
