আজ বৈশাখের প্রথম দিন। সারাদেশে বইছে উৎসবের আমেজ। তবে এর ছোঁয়া লাগেনি সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জীবনে। এখানে উৎসব নয়, বরং সময়মতো ধান ঘরে তোলার তাগিদ, জলাবদ্ধতা আর বৃষ্টি–শঙ্কাই বড় হয়ে উঠেছে। কারণ এই সোনালি ধানই সুনামগঞ্জের মানুষের জীবিকা, স্বপ্ন আর সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু।
বিজ্ঞাপন
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, সোনালি পাকা ধানে ভরে উঠেছে হাওর। কৃষকের পাশাপাশি কৃষানিরাও ব্যস্ত ধান শুকানোর খলা, উনুন তৈরি ও ফসল ঘরে তোলার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির কাজে। কোথাও কোথাও ধান কাটা শুরু হলেও তা এখনো পুরোপুরি গতি পায়নি। আগাম বৃষ্টি, হাওরে জমে থাকা পানি এবং ফসল রক্ষা বাঁধের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন কৃষকরা। হাওরের অস্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধও কোথাও কোথাও ফসলের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগাম বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের পানি থেকে ফসল রক্ষা করতে প্রতিবছর সরকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে শতকোটি টাকার অস্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে। তবে অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধের কারণে, পাহাড়ি ঢল নয়, বৃষ্টিপাতের পানি হাওরের ভেতর আটকে তলিয়ে গেছে অনেক কৃষকের স্বপ্নের ফসল। এই ফসল বাঁচাতে কৃষকরা নিজেরাই বাঁধ কেটে পানি অপসারণের চেষ্টা করছেন। এতে অনেক জায়গায় প্রশাসনের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়েছে কৃষকদের। কোনো কোনো হাওরে উজান-ভাটির কৃষকরা নিজেরাই সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। এই সংগ্রামের মধ্যে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। রোববার বাঁধ কাটতে গিয়ে মাটি চাপায় মধ্যনগরের এক তরুণ কৃষকের মৃত্যু হয়, যা পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতেই এবার হাওরে বৈশাখ শুরু হয়েছে। কৃষকরা কাটতে শুরু করেছেন তাদের স্বপ্নের ফসল।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এবার সুনামগঞ্জে আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। যার বাজারমূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা। তবে সেই ধান ঘরে তুলতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাওরের প্রায় ১০ লাখ কৃষক। আগাম বৃষ্টিপাতে ৩ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমির ধান জলাবদ্ধতায় তলিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে বৃষ্টিপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২১ হেক্টর এবং দ্বিতীয় ধাপে বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ২১০ হেক্টর ধান। এই দুই ধাপে মোট ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৩৩১ হেক্টর জমির বোরো ধান। জেলার সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, শাল্লা, মধ্যনগর ও ধর্মপাশা উপজেলার নিচু জমিতে এখনো পানি জমে আছে। অনেক ক্ষেত্রেই হাঁটু থেকে কোমরসমান পানির মধ্যে ধান দাঁড়িয়ে রয়েছে। এতে করে ধান কাটার কাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং কৃষকদের খরচ বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কানলার হাওরপারের বিরামপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল করিম বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এবছর ধান ভালো হয়েছে। কিন্তু গত কয়েদিনের বৃষ্টিতে অনেক জমিতে এখনো পানি আছে। যেখানে পানি কম সেখানকার ফসল কাটা শুরু করেছি। আর নিচু জমিতে বেশি পানি, এই পানি না নামলে ধান কাটা সম্ভব না। এর মধ্যে আবার যদি বৃষ্টি হয় তাহলে বড় সমস্যা হবে।
এদিকে, জলাবদ্ধতা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধান কাটার শ্রমিকেরও সংকট তৈরি হয়েছে। হাওরে পানি থাকায় অনেক শ্রমিক সেখানে কাজ করতে আগ্রহী নন। ফলে যারা কাজ করছেন, তাদের মজুরি বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে সুনামগঞ্জের কৃষকদের।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের কৃষক মো. রফিক মিয়া বলেন, ২০ বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছি। খুব কষ্টে ধান কাটছি। ধান কাটার শ্রমিকের খুব অভাব, ১৩০০ থেকে ১৫০০ টাকার নিচে কোনো শ্রমিক নেই। কিছু জমিতে অনেক পানি। এই অবস্থায় ধান কাটতে গেলে সময় বেশি লাগে, খরচও বেশি হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
একই এলাকার কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, ধান কাটা শুরু হয়েছে কিন্তু সময়মতো শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যারা আসছে, তারা বেশি টাকা চায়। পানির মধ্যে কাজ করতে চায় না অনেকেই। ধান কেটে শুকনো জমিতে রাখছি কিন্তু এই কয়েকদিনের বৃষ্টিতে হাওর কর্দমাক্ত থাকায় এখন ধান পরিবহন করা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের। বৃষ্টির কারণে ধান শুকানো নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছি।
তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দলের কৃষক নারায়ন বিশ্বাস বলেন, নিজের ১০ বিঘা জমি ও ভাগে ৫ বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছি। ২-৩ বিঘা জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে কিন্তু বৃষ্টি আর উজানের ঢল নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। উজানে যদি ঢলে নামে তবে এক নিমিষেই সারা বছরের কষ্ট পানিতে তলিয়ে যাবে। আজকের মতো যদি আকাশে রোদ থকে বৃষ্টি না হয়, তবে বৈশাখের ১৫-২০ তারিখের মাঝে হাওরের সব ধান ঘরে তোলা যাবে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, এবার ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০৩ কিলোমিটার অস্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য প্রতিটি উপজেলায় কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। ওই কমিটি প্রয়োজনে বাঁধ কেটে পানি অপসারণ করবে। আগামী বছর থেকে হাওর থেকে পানি অপসারণের জন্য যে জায়গায় স্লুইচ গেইট প্রয়োজন সেখানে তা নির্মাণ করা হবে, যাতে করে বৃষ্টির পানি অপসারণ হতে পারে।
তবে মাঠপর্যায়ে অনেক কৃষকই বাঁধের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, কিছু স্থানে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ দেওয়ার কারণেই পানি স্বাভাবিকভাবে বের হতে পারছে না, ফলে জলাবদ্ধতায় ডুবেছে কৃষকের ফসল।
এ পরিস্থিতিতে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা ব্যবস্থাপনার ত্রুটিকে দায়ী করছেন। হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন ঢাকা পোস্টকে বলেন, এবারের বৈশাখে আনন্দের পরিবর্তে সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে বিরাজ করছে গভীর আতঙ্ক। অব্যবস্থাপনা এবং যত্রতত্র অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে কৃষকদের জীবনে, ফলে উৎসব উদযাপনের মতো পরিস্থিতি এখন আর তাদের নেই।
তিনি আরও বলেন, কৃষকরা এখন সবচেয়ে বড় যে শঙ্কায় রয়েছেন, তা হলো বৈশাখের শেষ সময়ের মধ্যে তারা তাদের কষ্টার্জিত ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কি না। এই অনিশ্চয়তা এবং উদ্বেগের মধ্যেই হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দিন কাটছে, যা এবারের নববর্ষের আনন্দকে ম্লান করেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, ধান কাটার কাজ ধীরে ধীরে বাড়বে। সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক ঢাকা পোস্টকে বলেন, এবার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর। বর্তমানে সব উপজেলায় অল্প অল্প ধান কাটা শুরু হয়েছে। আগামী সপ্তাহে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে। এখন পর্যন্ত ৭৯৫ হেক্টর ধান কর্তন হয়েছে। এবছর আগাম বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটা কিছুটা পিছিয়েছে। তবে আবহাওয়া ভালো থাকলে মে মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে শতভাগ ধান কাটা শেষ হবে।
সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জের হাওরে এখন সময়ের সঙ্গে লড়াই চলছে ফসল দ্রুত ঘরে তোলার। আগামী কয়েক দিনের আবহাওয়া ভালো থাকলে কৃষকরা স্বস্তি পাবেন, অন্যথায় জলাবদ্ধতা ও বৃষ্টির প্রভাবে আরও ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সোনালি ধান ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে ফিরছে না স্বস্তি।
তামিম রায়হান/এএমকে
