বিদেশে কম্পিউটার অপারেটর পদে উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভনে দিনাজপুরের এক যুবককে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কাছে ৪ হাজার ৫০০ ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়া হয় তাকে। এরপর তাকে নেওয়া হয় ‘ডেথ ক্যাম্পে’, যেখানে মুক্তিপণ আদায়ে তিন মাস অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
বিজ্ঞাপন
অবশেষে কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে এসে পরিবার ও দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফিরতে সক্ষম হন তিনি। বিদেশে কর্মী পাঠানোর নামে মানব পাচারের এমন ভয়ঙ্কর অভিযোগ উঠেছে গাইবান্ধা জেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব রাহাদ ইবনে শহিদ ও তার বাবা মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ওই যুবকের নাম মো. শাফিন মন্ডল। তার বাড়ি দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার ভাদুরিয়া বাজার এলাকায়।
এ ঘটনায় শাফিনের বাবা নূর ইসলাম বাদী হয়ে দিনাজপুর আদালতে মানবপাচার আইনে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় গাইবান্ধা জেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব রাহাদ ইবনে শহিদ ও তার পিতা মো. শহিদুল ইসলামসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, শাফিনের বাবা নূর ইসলাম গাইবান্ধায় চাকরির সূত্রে স্থানীয় বাসিন্দা আ. লতিফ সরকারের সঙ্গে পরিচিত হন। পরবর্তীতে আ. লতিফ সরকার তাদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে শাফিনকে বিদেশে চাকরির প্রস্তাব দেন এবং বিদেশ পাঠানোর বিষয়ে সহায়তার জন্য রাহাদ ইবনে শহিদ ও তার বাবা শহিদুল ইসলামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
বিজ্ঞাপন
এরপর রাহাদ ইবনে শহিদ এবং তার বাবা মো. শহিদুল ইসলামের মাধ্যমে শাফিনের কম্বোডিয়ায় যাওয়ার চুক্তি হয়। সেখানে কম্পিউটার অপারেটর পদে দুই বছরের চাকরির আশ্বাস দেওয়া হয়। এ জন্য যাওয়ার আগে তিনি কয়েক দফায় মোট ৬ লাখ ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। গত বছরের ৩১ অক্টোবর তাকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। তবে দুই বছরের ভিসার প্রতিশ্রুতি থাকলেও কৌশলে মাত্র তিন মাসের ভিসা দেওয়া হয়, যার মেয়াদ ছিল ৭ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত।
২০২৫ সালের ২ নভেম্বর কম্বোডিয়ার সিয়েম রিয়েপ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর চক্রের সদস্য হুসেইন কবির তাকে রাজধানী নমপেনের একটি হোটেলে নিয়ে আটকে রাখে এবং সেখানেই তার ওপর নির্যাতন শুরু করে। পরে রাহাদ ও শহিদুলের সম্মতিতে তাকে নমপেন থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরের পোইপেট শহরে একটি অপরাধী চক্রের কাছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ডলারে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
এরপর তাকে পোইপেটের নিকটবর্তী গভীর জঙ্গলের একটি ভবনে বন্দি করে রাখা হয়, যা ‘ডেথ ক্যাম্প’ হিসেবে পরিচিত। সেখানে আরও অনেক বন্দির সঙ্গে তাকে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। সেখানে খাবার না দেওয়া, শারীরিক নির্যাতন এবং বিদ্যুৎ শক দেওয়া হতো। একই সঙ্গে তাকে হত্যার ভয় দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা চালানো হয়।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘ তিন মাস নির্যাতনের পর চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি এবং আরও ২০-২২ জন বন্দি কৌশলে সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হন। পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে দূতাবাসের সহায়তায় তিনি দেশে ফিরে আসেন।
ভুক্তভোগী শাফিন মণ্ডলের সঙ্গে কথা হলে সেই ঘটনার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তাকে নমপেনে নিয়ে গিয়ে তার পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে একটি হোটেলে আটকে রেখে নির্যাতন শুরু করেন হুসেইন কবির। পরে চাইনিজ একটি অপরাধী চক্রের কাছে তাকে ৪ হাজার ৫০০ ডলারে বিক্রি করে দেয়। তারা তাকে সেখান থেকে নিয়ে গিয়ে পোইপেইট শহরের কাছে একটি জঙ্গলের ভিতরে একটি ভবনে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, তিন মাস নির্যাতনের পর আমি ঠিক করলাম, হয় মরব না হয় বাঁচব, কিন্তু এখানে থাকব না। পরে পাসপোর্ট ও ফোন নিয়ে সেখান থেকে বন্দি আরও ২২ জন পালিয়ে আসি। ওরা আমার জীবন শেষ করে ফেলেছে। আমি এর বিচার চাই।
শাফিনের ভাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী নাইমুর রহমান জানান, ‘ডেথ ক্যাম্প’ থেকে পালানোর পর সেদিন সন্ধ্যায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন শাফিন। কিন্তু কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকায় থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের পরামর্শ নেন তারা।
পরবর্তীতে কম্বোডিয়ার ইমিগ্রেশনে ওভারস্টে হওয়ায় প্রতিদিন ১০ ডলার হিসেবে মোট ৭৯০ ডলার এবং এক্সিট পারমিশনের জন্য ৩০ ডলারসহ সব মিলিয়ে ৮২০ ডলার জরিমানা পরিশোধ করতে হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। এ পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানান তিনি।
তার অভিযোগ, এই ভয়ংকর মানবপাচার চক্রের সঙ্গে গাইবান্ধার ধানঘড়ার বাসিন্দা আরমান সরকার এবং কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত চক্রের সদস্য হুসেইন কবিরের ভাই হুমায়ুন কবির জড়িত।
তিনি আরও জানান, শাফিনকে কম্বোডিয়ায় পাঠানোর সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওয়েটিং রুমে গিয়ে আরমান সরকার তাদের হাতে পাসপোর্ট ও ভিসা তুলে দেন। আর হুমায়ুন কবির একটি ভিসা কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মানবপাচারের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র প্রস্তুত করেন।
এদিকে অভিযুক্ত রাহাত ইবনে শহীদ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অভিযোগটি সম্পূর্ণ বানোয়াট। তার সঙ্গে আমার চালের ব্যবসা নিয়ে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। উনি আমার কাছে অনেক টাকা বাকি রেখেছে। আমার বাবা এবং আরও কয়েকজনের নামে মানবপাচারের মামলা দেওয়া হয়েছে। আমি ২০২১ সাল থেকে বাবার ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করে আসছি। মানবপাচারের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
তবে ভুক্তভোগীর বাবা ও মামলার বাদী নূর আলম বলেন, তিনি ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গাইবান্ধায় কোহিনুর কেমিক্যাল কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। বর্তমানে তিনি ফিড কোম্পানির দিনাজপুর এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত এবং স্থানীয় বাজারে ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ব্যবসা করছেন।
তিনি দাবি করেন, তিনি বা তার পরিবারের কেউই চালের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন। অভিযোগ থেকে বাঁচতেই অভিযুক্তরা এ ধরনের মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর দাবি তুলে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সংসদ সদস্য ড. আতিকুর রহমান মুজাহিদ বলেন, আমরা এ বিষয়ে জানি না। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার মিল রয়েছে কিনা, সেটিও যাচাই করা হবে।
পিবিআইয়ের দিনাজপুরের পুলিশ সুপার (অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক) মাহফুজ্জামান আশরাফ জানান, মানব পাচারের মতো ভয়ংকর এ ঘটনার তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে অভিযোগ শোনা হয়েছে। তিনি তার বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তিনি আরও বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে- তারা প্রতারক। অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণ সংগ্রহ করা জরুরি। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে পিবিআই।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এসএইচএ
