একসময়ের অধিকারবঞ্চিতরা এখন উন্নয়নের ছোঁয়ায়

Dhaka Post Desk

মো. রনি মিয়াজী, পঞ্চগড়

০৩ আগস্ট ২০২১, ০৪:৪০ পিএম


একসময়ের অধিকারবঞ্চিতরা এখন উন্নয়নের ছোঁয়ায়

অধুনালুপ্ত ছিটমহলগুলো বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বদলে গেছে দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের গাড়াতিসহ বিভিন্ন এলাকার চিত্র। সেই সঙ্গে ভাগ্য বদলে গেছে বাংলাদেশের নতুন নাগরিকদের। ছিটমহল চুক্তি বাস্তবায়নের মাত্র পাঁচ বছরে সরকারি সব ধরনের উন্নয়নের মহাসড়কে প্রবেশ করেছে নতুন ভূখণ্ড। একসময়ের অবহেলিত এ মানুষগুলো এখন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব নাগরিক সেবা পেয়ে আজ পরিবার-পরিজন নিয়ে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করছে।

গত ৩১ জুলাই পাঁচ বছর অতিক্রম করে স্বাধীন ভূখণ্ডে যুক্ত হওয়া এই ছিটমহলগুলো। দিনটি সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দাদের কাছে একটি অবিস্মরণীয় দিন। আর দিনটিকে স্মরণ রাখতে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। কিন্তু মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে দুই বছর ধরে বিলুপ্ত ছিটমহলের মানুষ বন্ধ রেখেছে উৎসবের সব আয়োজন।

১৯৭৪ সালে করা মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিনিময় হয় ১৬২টি ছিটমহল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতীয় ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের ভূখণ্ড এবং ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ৫১টি ছিটমহল ভারতের ভুখণ্ডে যুক্ত হয়ে যায়। এতে দুই দেশের মানচিত্র পূর্ণতা পায় আর ছিটমহলবাসী পায় দীর্ঘ ৬৮ বছরের অবরুদ্ধ জীবন থেকে মুক্তি।

এদিকে ১৬২টি ছিটমহলের মধ্যে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের সদর বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলার অভ্যন্তরে গাড়াতি, শিংগীমারী, নাটকটোকা, বেহুলাডাংগা, বালাপাড়া খাসবাড়ি, কোট ভাজনি, দহল খাগড়াবাড়ি, কাজলদিঘী, পুটিমারী, নাজিরগঞ্জ, দৈখাতা, শালবাড়ি ছোট-বড় ৩৬টি ছিটমহলও আজকের দিনে বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়।

ছিটমহল চুক্তি বাস্তবায়নের পাঁচ বছরে সরকারের সব ধরনের উন্নয়ন প্রবেশ করেছে নতুন ভূখণ্ডে। নাগরিক সেবার পাশাপাশি সব ধরনের সেবা পেয়ে উচ্ছ্বসিত ৬৮ বছর পিছিয়ে থাকা এই বাংলাদেশিরা। বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোর চিত্র এখন চোখে পড়ার মতো, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক, কমিউনিটি সেন্টার, পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন, ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, রাস্তা-ঘাট পাকাসহ বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন হয়েছে।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দা রাজু মোহাম্মদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগে ছিটমহলের বাসিন্দা ছিলাম। এখন বাংলাদেশের বাসিন্দা হয়েছি৷ জন্মের পর থেকে জীবনের কঠিন সময়গুলো পার করেছি। সব অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এখন বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে সব ধরনের সুবিধা পাচ্ছি। ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে পারছি, শান্তিতে বসবাস করছি৷ এখন অনেক সুখেই দিন কাটছে আমাদের।

একই কথা বলেন তোতা মিয়া নামে আরেক সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দা, তিনি বলেন, যখন ছিটমহলের বাসিন্দা ছিলাম, তখন অসহায় আর বঞ্চনার মধ্যে দিয়ে জীবন যাপন করতে হতো। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব অধিকার থেকে আমরা বঞ্চিত হতাম। এখন বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে সব ধরনের সুবিধা ভোগ করতে পারছি। ছেলে-মেয়েদের মানুষ করতে পারছি, এটাই বড় পাওয়া আমাদের।

এ বিষয়ে সাবেক ছিটমহলের অন্যতম নেতা মফিজার রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, একসময়ের অবহেলিত মানুষ আমরা আজ শান্তিতে বাস করছি। দীর্ঘ ৬৮ বছরের সংগ্রাম পার করে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে আমরা পেয়েছি নতুন জীবন। সেদিনই আমরা স্বাধীন হয়েছি।

এ কারণে ধন্যবাদ জানাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি ছিটমহলগুলোকে বিলুপ্ত করে আমাদের বাংলাদশের নাগরিক হিসেবে যুক্ত করে বেঁচে থাকার পথ দেখিয়েছেন। আমাদের নতুন এলাকায় এখন উন্নয়নের ছোঁয়া লেগে সুন্দর ও শান্তিতে বসবাস করতে পারছি আমরা। আমরা সরকারের কাছে ঋণী ও কৃতজ্ঞ, বলেন এই নেতা।

পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে এসেছে নতুন বাংলাদেশিরা। দরিদ্র গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে গুচ্ছগ্রাম। ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, স্থাপন করা হয়েছে স্যানিটারি ল্যাট্রিন ও নলকূপ, বিলুপ্ত ছিটমহলের নাগরিকেরা প্রয়োগ করতে পারছেন তাদের ভোটাধিকার, তাদের সন্তানরা এখন বাড়ির পাশে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় লেখপড়া করার সুযোগ পাচ্ছে। কৃষকদের প্রণোদনাসহ আধুনিক চাষাবাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও যুবক ও নারীদের বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের জন্য যোগাযোগব্যবস্থার জন্য সড়ক পাকাকরণ, সেতু, কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। দেওয়া হয়েছে নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা। ভূসম্পত্তিতে তাদের অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে।

এনএ

Link copied