নদীতে বিলীনের অপেক্ষায় স্কুলটি

Dhaka Post Desk

ইসমাঈল হোসাঈন, ঝালকাঠি 

০৭ আগস্ট ২০২১, ০৫:৩২ পিএম


বিশখালী নদীর অব্যাহত ভাঙনে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার ৬ নম্বর মঠবাড়ি ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভবনের একাংশ দুই বছর আগে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এর এক বছর আগে নদী ও স্কুল লাগোয়া বাদুরতলা-পুখরীজানা-মানকিসুন্দর রাস্তা ও বেরিবাঁধও বিলীন হয়ে যায়। এছাড়া গত ২৫ বছরে বাদুরতলা-চল্লিশ কাহনিয়া সড়কসহ আশপাশের অন্তত ১৫০ একর জমি ও শত শত ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হলেও ভাঙন রোধে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড।

এলাকাবাসীর দাবি- বছরের পর বছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা স্থানটি পরিদর্শন করেছেন, কিন্তু এখনো মেলেনি স্থায়ী সমাধান। 

একাংশ বিলীন হওয়া মঠবাড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি বাদুরতলা স্কুল নামে পরিচিত। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধ করা না গেলে এখনকার বিদ্যালয় ভবন, মসজিদ ও বাজার রক্ষা করা যাবে না বলে জানিয়েছেন স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও মাদরাসা শিক্ষক আবদুস সালাম।

তিনি বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি পুখরিজানা থেকে বাদুরতলা মল্লিক বাড়ির রাস্তার মাথা পর্যন্ত অন্তত দেড় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হোক। 

বাদুরতলা স্কুল থেকে ১৯৯৬ সালে মাধ্যমিক পাস করা মোহাম্মদ কাইয়ুম জানান, আগেই বিশখালী নদীর বিভিন্ন স্থানে ভাঙন শুরু হয়েছে। তীব্র ভাঙনে বাদুরতলা লঞ্চ টার্মিনাল, বাদুরতলা বাজার ও এর আশপাশের এলাকার সড়ক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাদুরতলা বাজারের বেশির ভাগ স্থান এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে শতাধিক বসতবাড়ি, একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাদুরতলা জামে মসজিদ। ভাঙনরোধ করতে হলে টেকসই ব্লক করতে হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা হাজী আব্দুর রশীদ হাওলাদার ঢাকা পোস্টকে জানান, গত ৫৫ বছরে তিনবার তার বাড়ি নদীতে বিলীন হওয়ায় স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। এজন্য কখনোই কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। তার মতো ৭৪ বছর বয়সী মো. শাহজাহান শরীফ নদী ভাঙনের কারণে বাদুরতলা বাজার থেকে এ পর্যন্ত ৫ বার দোকানের জায়গা পরিবর্তন করেছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আইউব আলী খান ঢাকা পোস্টকে জানান, বিদ্যালয়টি রক্ষার জন্য একাধিকবার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় বিদ্যালয়টি বিলীন হওয়াসহ ছয়টি কক্ষের ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি আমরা।

তিনি আরও জানান, স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম ঠিক রাখতে ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যান মো. হায়দার আলী খান ও তার ভাই পাশেই আরেকটি ভবন করে দিয়েছেন। সেখানেই ৩০০ শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।

স্কুল ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যান মো. হায়দার আলী খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার বড় ভাইয়ের দেওয়া ডোনেশন দিয়ে ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১০ সালে ইঞ্জিনিয়ার মোস্তফা হল নামে একটি ভবন করেছিলাম। সেটিতেই স্কুলের কার্যক্রম চলছে। স্কুলের ভেঙে যাওয়া ভবনটির মূল্য নির্ধারণ করার জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরে চিঠি দেওয়া হয়েছে আগেই। তারা এখনো মূল্য নির্ধারণ করে দেয়নি। তাই নিলাম করা যাচ্ছে না। যদিও পূর্বের একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোহাগ হাওলাদার রেজুলেশন করে নিলাম করতে বলেছিলেন। 

নিলাম কেন করেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা করতে হলেতো মূল্যটা জানতে হবে। আমরা এখনো জানি না ভাঙা ভবনটির মূল্য কত।

হায়দার আলী আরও বলেন, ৫-৬ বছর আগে থেকে ঢাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলাম। তারা প্রজেক্ট দেয়, প্রজেক্ট পাস হয় না। এবার শুনেছি একটা প্রজেক্ট পাস  হয়েছে। নদী ভাঙন রোধের জন্য তারা ব্লক দেবে নাকি বেড়িবাঁধ করবে জানি না। তবে ভাঙন রোধ করতে হলে ব্লক দিতে হবে। ভাঙন রোধ করতে পারলে স্কুলটিকে বাঁচানো সম্ভব। 

জানা গেছে, ১৯৭০ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন হায়দার আলী খানের বাবা মঠবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ ইয়াকুব আলী খান। 

মঠবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. শাহজালাল হাওলাদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, স্কুলটির অর্ধেক নদীগর্ভে চলে গেছে। পুখরজানা গ্রামের কমপক্ষে ১৫০ একর জমিসহ প্রায় ৩০০ ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি- এই স্কুলটি যেন আর না ভাঙে, নদীভাঙন যাতে রোধ করা যায়।

তিনি আরও বলেন, আমাদের ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ বিএইচ হারুন জাতীয় সংসদে বিষয়টি একাধিকবার তুলেছেন। কিন্তু আমরা এখনো সমাধান পাইনি। সাথেই রয়েছে বাদুরতলা লঞ্চ টার্মিনাল। ঢাকাগামী লঞ্চও এখানে থামে। অথচ তিনদিন আগেও ঘাটটি নদীর মাঝে ভেসে গিয়েছিল। আমরা আবার ঠিক করেছি। এই সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান দাবি করছি।

ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিব হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২০১৯ সালে নদী ভাঙনে স্কুলটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন জরুরিভিত্তিতে কাজ করে ভাঙন রোধ করা হয়। এখন ওভাবেই আছে। বরিশাল সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান স্যার বাদুরতলার ভাঙনকবলিত বিশখালী নদীর কাজটি জরুরি ঘোষণা করেছেন। দুই-একদিনের মধ্যে কাজ শুরু হবে।

ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ওই স্কুল পরিদর্শনে আমি বেশ কয়েকবার গিয়েছি। ভাঙনটা অনেক পুরোনো, স্কুলটাও কয়েক বছর আগে ভেঙেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কয়েকবার জিও ব্যাগ ফেলেছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। নদী ভাঙন রোধের জন্য প্রতি বছরই প্রস্তাব দেওয়া হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে দীর্ঘ মেয়াদি বাঁধ নির্মাণের জন্য সুপারিশ করা আছে। 

আরএআর

Link copied