সেদিন আমরা বেঁচে গেলেও হত্যা করা হয় শ্রমিকদের

Dhaka Post Desk

ওমর ফারুক নাঈম, মৌলভীবাজার

২১ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:৩৪ পিএম


সেদিন আমরা বেঁচে গেলেও হত্যা করা হয় শ্রমিকদের

বীর মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান আবুল খয়ের চৌধুরী

‘২৭ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য আমরা মিছিল বের করি। একটি মিছিল যায় মৌলভীবাজারের কামালপুর থেকে শাহবন্দর পর্যন্ত। সেখানে গুলি চালায় পাকিস্তানি সেনারা। তেরা মিয়া নামে একজন মারা যান। আহত হন আরও অনেকে। আরেকটা মিছিল বের হয় চাঁদনিঘাট থেকে। এটার নেতৃত্বে ছিলেন গিয়াস উদ্দিন, ফয়জুর রহমান ও ওয়াদুদ ভাই। নদীর ওপার থেকে আমরাও সেদিন মিছিলে গিয়েছিলাম। মিছিলে যখন গুলি চালানো হয় তখন অনেকে আহত হয়। আমরা তখন মনু নদীর ব্রিজের পূর্ব দিকে নেমে ফরেস্ট অফিসের একটি ঘরে আশ্রয় নেই। আল্লাহর রহমতে ওই দিন হানাদার বাহিনী ফরেস্ট অফিসের ঘরে ঢুকেনি। তবে পাশে কাজ করছিল কিছু শ্রমিক। তারা তাদের হত্যা করে। ওই যাত্রায় আমরা বেঁচে যাই।’ 

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ঢাকা পোস্টের মৌলভীবাজার প্রতিনিধির সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলছিলেন সাবেক জেলা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান আবুল খয়ের চৌধুরী। সেই সময় তিনি জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও নেতৃবৃন্দের নির্দেশে সবসময় প্রস্তুত ছিলেন যুদ্ধে অংশ নিতে। রণাঙ্গনে সহকর্মী অনেক যোদ্ধাকে হারিয়েছেন তিনি। সেই স্মৃতি মনে পড়লে তিনি আজও কাঁদতে থাকেন। 

মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার নেপথ্যের কারণ 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের পর আমরা যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নেই। ওই সময় তিনটি শ্রেণি ছিল। একটা শ্রেণি আমরা ছিলাম যারা যুদ্ধে যাওয়ার জন্য সব সময় প্রস্তুত ছিলাম। আরেকটা ছিল সেনাবাহিনী, তারাও প্রস্তুত ছিল হয় বাঁচব নয়তো মরব। আরেকটা ছিল চাকরিজীবী শ্রেণি। তারা চিন্তা করছিলেন যদি এই সংগ্রাম সফল না হয়, তাহলে তাদের কী হবে? তাদের নিশ্চিত ফাঁসি হয়ে যাবে। বিজয়ের কয়েক মাস আগে তারাও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। 

যেভাবে প্রশিক্ষণ নেওয়া 

১৬ এপ্রিল আমাদের অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গা থেকে ১১৯ জন প্রস্তুত হলাম ট্রেনিংয়ে যাওয়ার জন্য। আমাদের দুটি ট্রাকে পাঠানো হলো লাঠিটিলায়। সেখানে বিএসএফ আমাদের নিয়ে গেল আসামের পেচারতল এলাকায়। সেখানে বিএসএফ ক্যাম্পে আমরা নামলাম। সেখানে বিএসএফের তাবুতে আমরা ১৫ দিন প্রশিক্ষণ নেই। রাইফেল, গ্রেনেডসহ কীভাবে যুদ্ধ করতে হয় সব শেখানো হলো। 

Dhaka Post

তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের দুটি গ্রপে ভাগ করে দেওয়া হলো। আমাদের এক গ্রুপকে দেওয়া হলো শমসেরনগরের পূর্বাঞ্চলে আর আরেক গ্রুপকে দেওয়া হলো বড়লেখার পাহাড়ে। মে-জুনের দিকে ছাত্রলীগ কর্মীদের বিএলএফের ট্রেনিং নিতে হবে এমন নির্দেশনা আসল। পাক-ভারতের সবচেয়ে বড় সামরিক একাডেমিতে আমাদের ট্রেনিং দেওয়া হলো। প্রায় ২১ দিন ট্রেনিং নেই। 

রণাঙ্গনের স্মৃতি 

শমসেরনগরে আমরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর হামলা করি। সে সময় কয়েকজন নিহত হন। পরে মুক্তিবাহিনী শেরপুরে চলে যায়। মৌলভীবাজার পিটিআই ও রেস্টহাউসে তখন আসেন মানিক চৌধুরী, সি আর দত্তসহ কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ও সামরিক অফিসার। এখানে কয়েকজন মুজাহির ও আনসার শেরপুরে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। শেরপুরে তখন তুমুল সম্মুখযুদ্ধ হয়। পাকিস্তানি বাহিনী পালিয়ে সিলেটে চলে যায়। মৌলভীবাজারে ছাত্রদের মধ্য থেকে তখন আব্দুল মহিত টুটু শেরপুরে যুদ্ধে চলে যায়। সেখানে গিয়ে সে আহত হয়। তাকে দেখে আমরা স্থির করি, এভাবে পাকবাহিনীর সামনে যুদ্ধে গেলে আমাদের মৃত্যু ছাড়া কিছু নেই। আমাদের ট্রেনিং নিতে হবে। আমরা প্রস্তাব করলাম মানিক চৌধুরীকে আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হোক।

Dhaka Post

ট্রেনিং থেকে আসার পর শমসেরনগরে দেখি, অনেক নারী-পুরুষ ভারতে চলে যাচ্ছে। আমাদের কাছে খবর এলো, দালালরা শরণার্থীদের বিভিন্ন জুলুম ও নির্যাতন করে। আমরা এক দিন চলে গেলাম সেখানে। ভোরের আগ মুহূর্তে আমরা সেখানে চা বাগানে অবস্থান নিলাম। সব শরণার্থী ভারতে চলে যাওয়ার পর গুলি করলাম। এ সময় এক দালাল মারা গেলেন। আমার সহযোদ্ধা দিলীপ সেই দালালের কান কেটে নিয়ে এসেছিল। এটি অনেক আলোড়ন তৈরি করে। 

যুদ্ধক্ষেত্র ও সেক্টর 

আমি যুদ্ধ করি ৪ নং সেক্টরে। সেখানকার সেক্টর কমান্ডার ছিলেন শেখ মনি ভাই। এফএফের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন সিআর দত্ত। এটা ছিল উত্তর-পূর্ব অঞ্চল। আমরা তাদের অধীনে যুদ্ধ করি। 

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বর্তমান অবস্থা 

দেওয়ান আবুল খয়ের চৌধুরী বলেন, একজন ছাড়া আমার সব সহযোদ্ধা স্বীকৃতি পেয়েছেন। তিনি সেই সহযোদ্ধার স্বীকৃতির দাবি জানান। মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন-মানের উন্নয়নে তিনি বলেন, যারা গরিব, গ্রাম থেকে যুদ্ধে গিয়েছিল তাদের জন্য সরকার চিন্তা-ভাবনা করেছে। ঘর বানিয়ে দেবেন। অনেককে দিয়েছেন, ভবিষতেও দেবেন। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয়। এটা নিয়ে আমার কোনো কথা নেই। আমার দাবি, গরিব মুক্তিযোদ্ধা যারা জীবিত আছেন এবং যারা মারা গেছেন তাদের পরিবারে রেশন সিস্টেম চালু করা যায় কি না। তাহলে গরিব মুক্তিযোদ্ধারা বাঁচবেন। 

এসপি

টাইমলাইন

Link copied