এখনো পানির নিচে জমি, আলু আবাদ করতে পারছেন না কৃষকরা

Dhaka Post Desk

জেলা প্রতিনিধি, মুন্সিগঞ্জ

০১ জানুয়ারি ২০২২, ০৬:০৪ পিএম


মুন্সিগঞ্জে এখনো বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে আছে অনেক আবাদি জমি। এসব জমিতে এ বছর নতুন করে আর আলু আবাদ সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন চাষিরা। এতে জেলায় এবার আলুর উৎপাদন কম হবে। 

মুন্সিগঞ্জ সদর ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকের আবাদি জমি এখনো বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে আছে। যে সব জমিতে অন্যান্য বছর এ সময় আলু গাছ গজিয়ে যায়, সেসব জমি এখন পানির নিচে। অন্যান্য বছর এই সময়ে সাধারণত আলু আবাদ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এ বছর আলু আবাদ মৌসুমের শুরুতেই টানা বৃষ্টির কারণে কৃষকের রোপণ করা আলু বীজ পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পুনরায় এখন পুরোদমে উঁচু জমিতে আলু আবাদ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। কিন্তু নিচু জমিগুলো এখনো পানিতে তলিয়ে আছে। ওই সমস্ত জমি শুকিয়ে আলু আবাদ করতে আরও ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লেগে যাবে। তাই কৃষকরা তাদের ডুবে থাকা নিচু জমিতে এ বছর আর আলু আবাদ করার কথা ভাবছেন না। ফলে এই মৌসুমে অনাবাদি থেকে যাবে কয়েক হেক্টর জমি। খাল ও নালা ভরাট হয়ে যাওয়ায় জমে থাকা পানি নামতে পারছে না বলেও অভিযোগ কৃষকদের। 

সদর‌ উপজেলার আকাল মেঘ গ্রামের চাষি রহমত উল্লাহ বলেন, বৃষ্টির কারণে আলু লাগাতে দেরি হচ্ছে। আগে যেগুলো লাগিয়েছিলাম সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন বীজ পাচ্ছি না। অন্যান্য বছর এই সময়ে আলুর গোটা হয়ে যায় আর আমরা এখন আলু লাগাতেই পারছি না।

আলুচাষি জয় হোসেন বলেন, অন্যান্য বছর এ সময় আমাদের আলু গাছে আলু হয়ে যায়। কিন্তু এ বছর আমাদের আলুর জমি বৃষ্টির কারণে শুকাচ্ছে না। আমার জমি সব পানিতে তলিয়ে আছে। আমি জমি চাষ করতে পারছি না। আমি এবার আলুই লাগাতে পারব না।

এর আগে ডিসেম্বর মাসের শুরুতেই টানা বৃষ্টিতে কৃষকের রোপণ করা আলুর বীজ নষ্ট হয়ে যায়। ১৫ দিনের পর উঁচু জমিতে জমে থাকা বৃষ্টির পানি শুকিয়ে গেলে পুনরায় আবার চাষাবাদ শুরু করেন কৃষকরা। কিন্তু বীজ আর শ্রমিক সংকটের কারণে তারা আলু চাষে হিমশিম খাচ্ছেন। বীজ সংকটের কারণে খাবার আলু হিসেবে বিক্রি করার জন্য যে সমস্ত নিন্মমানের আলু হিমাগারে রেখেছিলেন তারা সেই সব আলুই বীজ হিসেবে এখন রোপণ করছেন জমিতে।

Dhaka Post

হল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত বাক্র আলু বীজ (৫০ কেজি) এখন ১০-১১ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। যা বৃষ্টির আগে ছিল ৫-৬ হাজার টাকা। তবে আলু বীজের পাশাপাশি শ্রমিক সংকটেও পড়েছেন  কৃষকরা। অতিরিক্ত মজুরি দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী কৃষি শ্রমিক পাচ্ছেন না তারা। এই অঞ্চলের আলু চাষ বিভিন্ন জেলা থেকে আগত শ্রমজীবী মানুষের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। আলু রোপণ মৌসুমের শুরুতে বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুল পরিমাণ শ্রমিক আসলেও টানা বৃষ্টিতে জমিতে কাজ না থাকায় শ্রমিকরা ফিরে গেছেন নিজ নিজ জেলায়। এতে শ্রমিক সংকটে পড়েছেন স্থানীয় চাষিরা।

স্থানীয় চাষিরা জানান, কৃষি মৌসুমে এ জেলায় নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, রংপুর, কুড়িগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন জেলা থেকে লক্ষাধিক শ্রমিক তাদের শ্রম বিক্রি করতে আসেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ডিসেম্বরের শুরুতেই টানা বৃষ্টির কারণে আবাদি জমি সব ডুবে যায়। জমিতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। তাই কাজ না থাকায় ৮০ ভাগ শ্রমিক নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন। শ্রমিক সংকটের কারণে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করেও প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, এ বছর জেলায় ৩৭ হাজার ৯০০ হেক্টর জামিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। বৃষ্টির আগে ১৭ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে আলু রোপণ করা হয়েছিল। টানা বৃষ্টিতে জেলার ছয় উপজেলায় ১৩ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে রোপণ করা বীজ পানিতে তলিয়ে যায়। রোপণের জন্য প্রস্তুত জমিও নষ্ট হয়ে গেছে। এসব জমিতে রোপণ করা হয়েছিল প্রায় ২৭ হাজার টন বীজ। এতে কৃষকের ক্ষতি হয় প্রায় ১৫৫ কোটি টাকা। 

তবে কৃষকদের দাবি- এর চেয়ে দ্বিগুণের বেশি তাদের ক্ষতি হয়েছে। এবার প্রতি হেক্টর জমিতে দুই টন করে বীজ রোপণ করা হয়। এর মধ্যে বিএডিসি ও বেশি উৎপাদন সক্ষম বিভিন্ন বাক্স আলু রয়েছে। বিএডিসির বীজ কেজি প্রতি ২২ থেকে ২৪ টাকা আর বাক্স আলু কেজি প্রতি ১৬০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা খরচ পড়েছে। 

কৃষি বিভাগ বলছে, হেক্টর প্রতি আলুর বীজ রোপণে খরচ ধরা হয়েছে এক লাখ টাকা। এর মধ্যে জমি প্রস্তুত, সার, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ রয়েছে। সে হিসেবে মোট ক্ষতি ১৫৫ কোটি টাকা। 

তবে কৃষকরা বলছেন, গত বছরের উৎপাদিত আলু থেকে সংরক্ষিত বীজ রোপণে হেক্টর প্রতি খরচ হয়েছে ১ লাখ ২৫-৩০ হাজার টাকা। নতুন বাক্স আলুতে খরচ হয়েছে তিনগুণ। অর্থাৎ কৃষকদের হিসেবে এ ক্ষতি দ্বিগুণ হতে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. খুরশীদ আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বৃষ্টিতে কৃষকদের আলুর বীজ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন পুনরায়  তারা জমিতে আলু আবাদ করছেন। কী পরিমাণ জমিতে এবার আলু আবাদ হচ্ছে না তা এখনই নিশ্চিত করা করে বলা যাবে না। তবে এবার কোনোভাবেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না, এটা সুনিশ্চিত।

তিনি আরও বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে মুন্সিগঞ্জের আলুচাষিদের ১৫৫ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। ‘এ’ ক্যাটাগরির বীজগুলো বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষক এখন ‘বি’ ও ‘সি’ ক্যাটাগরির বীজ দিয়ে আলু রোপণ করছে। এতে উৎপাদন অনেকটা কম হবে।

ব.ম শামীম/আরএআর

Link copied