রপ্তানি বাড়লেও তা গতবছরের চেয়ে কম

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চতুর্থ মাস অক্টোবর থেকে রপ্তানি বাড়ছে। তবে আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় তা কম।
অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আগের বছরের একই মাসের চেয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ রপ্তানি বাড়ার পর এটি ধারাবাহিকভাবে প্রতি মাসেই কমছে। সদ্য সমাপ্ত জানুয়ারি মাসেও রপ্তানি গত বছরের একই মাসের চেয়ে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ কমেছে। এই নিয়ে টানা ছয়মাস আগের বছরের একই মাসের তুলনায় রপ্তানি কমেছে।
তবে, চলতি অর্থবছরের শেষ চার মাসে ধারাবাহিকভাবে পূর্বের মাসের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে। অক্টোবরে সেপ্টেম্বরের চেয়ে রপ্তানি বেড়েছিল ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ, পরের মাস নভেম্বরে অক্টোবরের চেয়ে ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে নভেম্বরের চেয়ে ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। আর সর্বশেষ জানুয়ারি মাসে ডিসেম্বরের চেয়ে রপ্তানি বেড়েছে ৪৪ কোটি ডলার বা ১১ শতাংশ।
রপ্তানি প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের এই চার মাসে রপ্তানিতে মজবুত ভিত্তি থাকায় ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি হলেও সেটি পূর্বের বছরের তুলনামূলক চিত্রে পিছিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ গত বছর এই চার মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রপ্তানি হয়। যেমন– গত বছরের অক্টোবরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ শতাংশ, নভেম্বরে যা ছিল ১৬ শতাংশ, পরে মাস ডিসেম্বরে ১৮ শতাংশ এবং জানুয়ারিতে এই হার ছিল ৬ শতাংশের মতো।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) গতকাল সোমবার রপ্তানির হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই মাস থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কম হয়েছে। রপ্তানি আয় এসেছে ২ হাজার ৮৪১ কোটি ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল দুই হাজার ৮৯৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের গত সাত মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে কম হয়েছে ৫৫ কোটি ডলার।
অধিকাংশ খাত ইতিবাচক ধারায় থাকলেও প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির কারণে সামগ্রিকভাবে রপ্তানি কমেছে বলে মনে করেন পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক চাহিদা কমেছে। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচনে অস্থিরতা হতে পারে— এমন শঙ্কায় কিছু ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তাদের ক্রয়াদেশের একটি অংশ অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হলে সেসব ক্রয়াদেশ ফিরবে বলে আশা করা যায়।
মোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাসুদ কবীর বলেন, পাল্টা শুল্কের কারণে শুল্কভার এখন ৩৬ শতাংশ। বাড়তি ব্যয় ভোক্তাদের জন্য কিছুটা অসহনীয়। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে গতি কম। মৌলিক পোশাক উৎপাদন করে দেশের এ রকম কারখানাগুলো এখন সংকটে আছে। এ ছাড়া পাল্টা শুল্কের কারণে ভোক্তাদের আচরণেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। একটা ভোক্তা শ্রেণি সাশ্রয়ের ভাবনা থেকে কম দামের সাধারণ পোশাকের চেয়ে অনেক দিন ব্যবহার করা যায় এমন পোশাকে ঝুঁকছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় বলে দাম আপাতত কিছুটা বেশি হলেও শেষ বিচারে তা সাশ্রয়ী। পাল্টা শুল্ককে কেন্দ্র করে ইউরোপ এবং নতুন বাজারে চীন ও ভারতের আগ্রাসী বাণিজ্য তো আছেই। এসব কারণে রপ্তানিতে গতি নেই। খুব শিগগির এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সম্ভাবনাও নেই।
ইপিবির প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে তৈরি পোশাকের রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমেছে। আয় এসেছে দুই হাজার ২৯৮ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল দুই হাজার ৩৫৫ কোটি ডলার। অন্যদিকে একক মাস হিসেবে গত জানুয়ারি মাসে রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। মাসটিতে আয় এসেছে ৩৬১ কোটি ডলার, যা গত বছরের জানুয়ারিতে ছিল ৩৬৬ কোটি ডলার। পোশাকের মধ্যে গেঞ্জি জাতীয় পোশাকের রপ্তানি বেশি হারে কমেছে। এর রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৬১ শতাংশ। ওভেনের কমেছে শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।
রপ্তানি খাতের উল্লেখযোগ্য অন্য পণ্যের মধ্যে কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে ৭ শতাংশের মতো। তবে হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ১৩ শতাংশের মতো। চামড়া ও চামড়া পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৬ শতাংশ। পাট ও পাটপণ্যে ১২ শতাংশ, হোমটেক্সটাইলে ৫ শতাংশের মতো বেড়েছে রপ্তানি আয়।
এমএমএইচ/এনএফ