বাংলাদেশে তৈরি হবে টিভিএস মোটরসাইকেল

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ প্রাণ-আরএফএল মোটরসাইকেল ও ইলেকট্রিক স্কুটারের বাজারে প্রবেশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে নিজস্ব কারখানা গড়ে তুলবে। কারখানায় রাইডো ইলেকট্রিক স্কুটার ও টিভিএস মোটরসাইকেল তৈরি করবে। উৎপাদন ও বিপণনের জন্য আগামী তিন বছরের মধ্যে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে গ্রুপটি। ইতোমধ্যে টিভিএসের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এর ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
এ বিষয়ে আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রথীন্দ্র নাথ পাল (আর এন পাল) বলেন, “বর্তমানে মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল তরুণদের কাছে শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি একটি লাইফস্টাইল পণ্যে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত বাইসাইকেল উৎপাদন ও বিপণনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা এখন মোটরসাইকেল এবং পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক স্কুটারের বাজারে প্রবেশ করেছি।”
তিনি আরও জানান, ভারত, চীন ও ভিয়েতনামের মতো বাংলাদেশের বাজারও ইলেকট্রিক স্কুটারের জন্য সম্ভাবনাময়। ২০২৭ সালের মধ্যে ৫০ হাজার টাকায় উন্নতমানের রাইডো ব্র্যান্ডের স্কুটার গ্রাহকের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্রুপটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, খ্যাতনামা ব্র্যান্ড টিভিএস মোটরসাইকেল বাংলাদেশে বিপণনের দায়িত্ব পেয়েছে প্রাণ-আরএফএল। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠান দুটির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। চলতি মাসের শেষ দিকে প্রাণ-আরএফএলের মাধ্যমে টিভিএস মোটরসাইকেল বাজারে আসতে পারে। এর আগে দেশে টিভিএস মোটরসাইকেল বিপণনের দায়িত্বে ছিল র্যাংগস গ্রুপ।

তারা আরও জানান, শিগগিরই হবিগঞ্জে কারখানা নির্মাণ শুরু হবে। ইতোমধ্যে সেখানে ইলেকট্রিক স্কুটার উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং প্রথম ধাপে মাসে ৫০০ ইউনিট তৈরি হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরু হলে প্রতি মাসে তিন হাজার ইউনিট স্কুটার তৈরি করা হবে। টিভিএস মোটরসাইকেলও দেশেই উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে এখানে আসছে, যার জন্য ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আরএফএল গ্রুপের বাইক ব্যবসার প্রধান কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান বলেন, “প্রথম বছর আমরা স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চাই। ডিলার ও সার্ভিস নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং উন্নত গ্রাহক সেবা আমাদের প্রধান লক্ষ্য। ধাপে ধাপে আমরা নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।”
প্রাণ-আরএফএল ইলেকট্রিক স্কুটারের বাজার সম্প্রসারণের জন্য চার্জিং স্টেশন স্থাপনায় বিনিয়োগ করছে। জাপানি প্রযুক্তি নির্ভর স্টার্টআপ গ্লাফিট বাংলাদেশ লিমিটেডের সহায়তায় দ্রুত একটি চার্জিং নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। এ বিষয় আরএন পাল জানিয়েছেন, দেশেই মোটরসাইকেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ— যেমন ড্রাইভ চেইন, সিট, হুইল, ব্যাটারি উৎপাদন করা সম্ভব। এতে কম খরচে ভালো মানের মোটরসাইকেল সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদী সেবা নিশ্চিত করা যাবে।
প্রাণ-আরএফএল তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক স্কুটার ‘রাইডো’ সবার কাছে পৌঁছে দিতে চায়। বর্তমানে স্কুটারটির দাম ৫৫ হাজার টাকা হলেও প্রতিষ্ঠানটি তা ৪৫ হাজার টাকায় নামানোর পরিকল্পনা করছে।
প্রাণ-আরএফএল টিভিএস মোটরসাইকেলের ডিলার পয়েন্টগুলো আরও কার্যকর করতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে জানিয়ে আরএন পাল বলেন, ভালো ব্যবসা করা ডিলারদের সহায়তা দেওয়া হবে, আর ব্যর্থ ডিলারদের বদলানো হতে পারে। নতুন ডিলার নিয়োগেরও সুযোগ থাকবে।
সার্ভিস সেন্টার থেকে টিভিএসের পুরোনো গ্রাহকরাও সেবা পাবেন। যারা এখনও ওয়ারেন্টি বা ফ্রি সার্ভিসের আওতায় আছেন, তারা নতুন আঙ্গিকে পূর্ণ সেবা পাবেন। প্রাণ-আরএফএল টিভিএসকে আগের মতো সেরা ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
দেশের মোটরসাইকেল বাজারের চিত্র
বর্তমানে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। বাজারমূল্য প্রায় ৭–৮ হাজার কোটি টাকা, বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১৬–১৭ শতাংশ। বর্তমানে রাস্তায় চলমান মোটরসাইকেলের প্রায় ৯৯ শতাংশ দেশেই তৈরি বা সংযোজন করা হয়। ২০১৫ সালে বছরে মোটরসাইকেল বিক্রি দুই লাখের কম ছিল, যা এখন প্রায় ৪ লাখে পৌঁছেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতা ১০ লাখ ইউনিটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
দেশে মোটরসাইকেল তৈরির কারখানা অন্তত ৮টি, যার মধ্যে আছে জাপানের ইয়ামাহা, হোন্ডা, সুজুকি এবং ভারতের হিরো, বাজাজ, টিভিএস। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে রয়্যাল এনফিল্ডের সংযোজন কারখানা রয়েছে। দেশীয় ব্র্যান্ড হিসেবে রানার অটোমোবাইলসও রয়েছে।
মোটরসাইকেল অনেকের আয়ের উৎস। রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যার মধ্যে পাঠাওয়ের চালক ও রাইডার ৪ লাখ ৫ হাজার এবং উবারের চালক ও রাইডার ৩ লাখ ৫০ হাজার।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৮ লাখ ১৬ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত আছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ৪ লাখ ২৭ হাজার ৮০টি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। ২০২৪ সালের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৩২টি। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৪ শতাংশ। এছাড়া, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বিক্রির পরিমাণ ১ লাখ ৭৭ হাজার ৯১৭টি, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৯০৪টি অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ২১ শতাংশ।
এসআই/এমজে