একদিনে সূচক বাড়ল ৪ শতাংশ, ৫ মাস পর লেনদেন হাজার কোটির বেশি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া প্রথম কার্যদিবসে আজ রোববার বড় উত্থানের দেখা মিলছে। এদিন যে কয়টি শেয়ার ও ইউনিটের দর কমেছে তার চেয়ে ১৪ গুণ বেশি সংখ্যকের দর বেড়েছে। এতে দেশের বড় শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স একদিনে প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছে। অন্য সূচকগুলোও ২ থেকে ৪ শতাংশ বেড়েছে। আর প্রায় ৫ মাস পর এক হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় পর দলীয় সরকারের অধীনে আসতে যাচ্ছে দেশের পরিচালন ভার। এতে বহির্বিশ্ব থেকে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পথ উন্মোচন হবে। যার ইতিবাচক প্রভাব শেয়ারবাজারে আসবে। তাছাড়া নির্বাচিত সরকারের সময় শেয়ারবাজারের গুরুত্ব বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উৎসাহ বাড়িয়েছে, যার ফলস্বরূপ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। তবে, কেউ কেউ মনে করেন এই উত্থান ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ের মতো ক্ষণস্থায়ী হবে। দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারবাজারের উন্নয়নে ব্যাংকিং সেক্টরের সুদহার কমিয়ে আনতে হবে।
এ বিষয়ে মিডওয়ে সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আশেকুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, শেয়ারবাজারে আজকে যে মুভমেন্ট হয়েছে, এটি দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হবে বলে মনে হচ্ছে না। আমরা সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্টে কয়েকদিন যেমন উত্থান দেখেছি; এটি তেমনই কয়েক দিনের উত্থানের ধারাবাহিকতা থাকতে পারে। যতদিন ব্যাংকিং সেক্টরে ইন্টারেস্ট রেট হাই (উচ্চ সুদহার) থাকবে, ততদিন দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারবাজারে উন্নতির চিন্তা করাটা কঠিন। এটি (সুদহার) কমে আসলে শেয়ারবাজারে তারল্য বাড়বে, বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিএসইতে সব খাত মিলে আজ দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে ৩৬৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। বিপরীতে দাম কমেছে ২৬টির। আর ৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
মাত্র ৩০টি বাদে সবগুলো শেয়ারের দাম বাড়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ২০১ পয়েন্ট বা প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৬০১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার লেনদেন শেষে সূচকটির অবস্থান ছিলো ৫ হাজার ৪০০ পয়েন্টে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ৩০ পয়েন্ট বা প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ১২৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ৮৬ পয়েন্ট বা ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে ২ হাজার ১৪৫ পয়েন্টে উঠে এসেছে।
সবকটি মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি আজ ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ২৭৫ কোটি ১০ টাকা। এই লেনদেনের পরিমাণ গত মঙ্গলবারের চেয়ে ৪৮৫ কোটি টাকা বেশি। এক্সচেঞ্জটিতে আজকের চেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছিল গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর, যার পরিমাণ ছিলো ১ হাজার ৪০০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সেই হিসেবে প্রায় ৫ মাসের মধ্যে আজকে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে। এটি এই সময়ের মধ্যে প্রথম হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন।
আজকের লেনদেনে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিলো সিটি ব্যাংকের শেয়ারে, ব্যাংকটির মোট ৮০ কোটি ৭৩ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে ঢাকা ব্যাংকের শেয়ার, যার পরিমাণ ৪২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। আর ৪১ কোটি ৯ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়ে শীর্ষ তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস।
লেনদেনের বিষয়ে মো. আশেকুর রহমান বলেন, যে-কোনো সরকার পরিবর্তনে শেয়ারের আগ্রহে পরিবর্তন হওয়াটা অযৌক্তিক নয়। ঢাকা ব্যাংকের শেয়ারে গত কয়েকদিন যে উত্থানটি হয়েছে, এটি স্বাভাবিক। মার্কেট মুভমেন্ট সবসময় ফান্ডামেন্টাল নির্ভর হয়ে চলে না, সেন্টিমেন্টালে নির্ভর করেও অনেক সময় মুভমেন্ট হয়। তবে, আজকের যে উত্থান তা কয়েকদিন পর স্থির পর্যায়ে চলে আসবে বলে মনে হচ্ছে।
দেশের অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) আজ সবগুলো মূল্যসূচক বেড়েছে। এর মধ্যে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৪৮৪ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৫১৯ পয়েন্টে উঠেছে। আর প্রধান সূচক সিএসসিএক্স ২৮৩ পয়েন্ট বেড়ে ৯ হাজার ৫৫৫ পয়েন্ট হয়েছে।
বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৪৭ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২০টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১৭টির এবং ১০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ২৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। গত মঙ্গলবার লেনদেন হয় ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
অংশীজনরা কেমন শেয়ারবাজার প্রত্যাশা করছেন
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মো. শাকিল রিজভী বলেন, আমাদের ধারণা আগামী কয়েকদিন বাজার ভালো থাকবে। তবে বাজারের এই ভালো পরিস্থিতি স্থায়ী করতে হলে দ্রুত কিছু ভালো কোম্পানির শেয়ার আনতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগবান্ধব পলিসি নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সামনে চ্যালেঞ্জ হলো ভালো ভালো কিছু আইপিও আনা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ব্যাংকে যেন লুটপাট না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে। আমরা আশা করছি সরকার এ বিষয়ে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, এই সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই শেয়ারবাজার নিয়ে কমিটমেন্ট করেছে। এই কমিটমেন্ট যদি ধরে রাখে তাহলে অবশ্যই আমরা একটি ভালো শেয়ারবাজার পাব। আমাদের একটাই প্রত্যাশা যে কমিটমেন্ট দিয়ে সরকার আসছে, ওনারা সেই কমিটমেন্ট রাখবেন।
তিনি আরও বলেন, বাজার ভালো রিটার্ন দিলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অটোমেটিক বেড়ে যাবে। তাছাড়া নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায়, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক।
এমএমএইচ/এমজে