বিএসইসি চেয়ারম্যান থাকবেন নাকি ছাড়তে হবে পদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পালাবদলে দেশের পুঁজিবাজারে ফিরেছে প্রত্যাশার হাওয়া। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটবে—এমন স্বপ্ন দেখছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। বিনিয়োগকারীদের মাঝেও জেগেছে নতুন আশার আলো। এই আশার-আলোর ভেতরেই আসছে আরেকটি প্রশ্ন—বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বর্তমান চেয়ারম্যান থাকছেন তো?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুঞ্জন, বিনিয়োগকারীদের আড্ডা, বোকারেজ হাউজগুলোর অফিস, সব জায়গায় একই আলোচনা। নতুন সরকারের সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে কি না—এ নিয়েই নানা মনে চলছে জল্পনা-কল্পনা। অথচ সংস্থার বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এখনো বহাল তবিয়তেই দায়িত্বে আছেন। তিনি নিজে পদত্যাগ করবেন কি না, কিংবা নতুন সরকার তার ওপর আস্থা রাখবেন কি না—এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বার্তা নেই।
অতীতে বিএসইসির নেতৃত্বে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নানা বিতর্ক, দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতি তৈরি করেছিলেন। তবে, এই দিক বিবেচনায় খন্দকার রাশেদ মাকসুদের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত দুর্নীতি-সুশাসনের ব্যত্যয় ঘটানোর মতো কোন অভিযোগ ওঠেনি। তা সত্বেও কেন বাজার সংশ্লিষ্ট থেকে শুরু করে প্রায় সব শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তার পদত্যাগের আলোচনা চলছে?
এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি (মাকসুদ) বাজার স্থিতিশীল রাখা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কার্যকরী কোন ব্যবস্থা নিতে পারেননি। ফলে বাজার গিয়ে পৌঁছেছে তলানিতে। পাশাপাশি সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার দেড় বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও তিনি একটিও প্রথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বাজারে আনতে পারেননি।
নানা গুঞ্জনের চাপে বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ স্বপদে থাকবেন নাকি পদত্যাগ করবেন? বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও নিশ্চিত হতে পারেনি ঢাকা পোস্টের এই প্রতিবেদক। খন্দকার রাশেদ মাকসুদের ব্যক্তিগত মুঠোফোনের ফোন দিয়ে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। বিএসইসির মুখপাত্র ও পরিচালক আবুল কালামকে ফোন দেয়া হলে তিনিও বারবার সংযোগ বিছিন্ন করে দেন।
এদিকে, বিএসইসি প্রধান পদত্যাগ করবেন কি না, সেটি নিশ্চিত হওয়ার আগেই এই মূহুত্বে বাজারের স্বার্থে কেমন সংস্থা প্রধান নিয়োগ দেয়া উচিত সেটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বাজার সংশ্লিষ্ট মহলে। বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাজার কিংবা বেসরকারি খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্য থেকেই পুঁজিবাজারের নেতৃত্ব বাছাই করা হয়। এ অবস্থায় বাংলাদেশেও পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্য থেকে বিএসইসির শীর্ষপদে নিয়োগ দেয়ার দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদের মতে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৫ বছর ধরে বাজারটি ক্রমাগত সুশাসনের দুর্বলতা, সীমিত সংস্কারের গতি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাসের সম্মুখীন হয়েছে। গত প্রায় দুই বছরে নতুন কোনো আইপিও আসেনি। এছাড়া বিগত সময়ে যে আইপিওগুলো অনুমোদিত হয়েছে সেগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা নিম্নমানের কোম্পানি ছিল, যা শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করেছে এবং অনেক বিনিয়োগকারীকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে এমন একজন ব্যক্তি থাকা প্রয়োজন যিনি পুঁজিবাজার সম্পর্কে গভীর ও ব্যবহারিক জ্ঞান রাখেন। পুঁজিবাজারের জন্য এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যিনি আর্থিক বাজারের ইকোসিস্টেমের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন এবং বাস্তবমুখী বাজার পরিচালনায় সফল হয়েছেন; কেবল একজন তাত্ত্বিক বা আমলাতান্ত্রিক নিয়োগপ্রাপ্ত কেউ নন।
এ বিষয়ে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, “পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে নিয়োগের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, এমনকি শ্রীলংকা ও ভারতের ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে। কারণ সেখানে পেশাদারিত্ব রয়েছে। আমাদের পুঁজিবাজারেও অনেক অভিজ্ঞ লোক আছেন যারা নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরিচালনার জন্য যোগ্য। কিন্তু এক্ষেত্রে একজন নিরপেক্ষ এবং স্বার্থের সংঘাত নেই এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। আমাদের এখানে নৈতিক মানদণ্ড বিবেচনায় উত্তীর্ণ এমন ব্যক্তি পাওয়া বেশ দুষ্কর। যদি এমন ব্যক্তি পাওয়া যায় তাহলে ভালো নিয়োগ দিতে সমস্যা নেই।”
তিনি মনে করেন, “শুধু একজন ভালো চেয়ারম্যান নিয়োগ দিলেই পুঁজিবাজার ভালো হয়ে যাবে এমন নয়। এক্ষেত্রে অর্থনীতি ভালো না হলে পুঁজিবাজারও ভালো হবে না। এছাড়া ভালো শেয়ারের জোগান দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে, বাজারের সমস্যা বুঝতে হবে। এসব কিছু যদি একসঙ্গে করা সম্ভব হয় তাহলে বাজার পরিস্থিতি ভালো করা সম্ভব।”
বিশ্বের অনেক দেশে সংকটকালে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে ভালো করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “১৯৩৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এসইসির প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে জোসেফ পি কেনেডি সিনিয়রকে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি কোনো শিক্ষাবিদ বা প্রথাগত আমলা ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একজন পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট পেশাদার ব্যক্তি। কেনেডি বাজারের অভ্যন্তরীণ ফাঁকফোকর সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত ছিলেন, যা তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এবং বাজার পুনরুদ্ধারে সাহায্য করেছিল।”
“শ্রীলঙ্কায় কেন বালেন্দ্র ও নালকা গোদাহেওয়ার মতো করপোরেট ব্যক্তিত্বদের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, যা করপোরেট শৃঙ্খলা ও বাজারের স্বচ্ছতা বাড়াতে সহায়ক হয়েছিল। পাকিস্তানেও শওকত তারিন ও জাফর হিজাজির মতো অভিজ্ঞ ব্যাংকাররা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের সময়ে করপোরেট সুশাসন জোরদার করা হয়েছে এবং ইনসাইডার ট্রেডিং বা কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।”— যোগ করেন তিনি।
বিএসইসি এর সাবেক চেয়ারম্যান আরও বলেছেন, “অথচ বিগত সময়ে বাংলাদেশের বিএসইসির নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপস্থিতি নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যার মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগ ও দুর্বল নিয়ন্ত্রক শাসন অন্তর্ভুক্ত, যা বাজারের অস্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।”
এ বিষয়ে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, “অতীতে আমাদের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সবাই ছিলেন অধ্যাপক। শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয়, স্টক এক্সচেঞ্জেও অধ্যাপকদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আমি তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, তাদের পুঁজিবাজার সম্পর্কে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান ছিল। অন্যদিকে আমাদের আমলাদের ক্ষেত্রে যেটি দেখা গেছে, তারা পুঁজিবাজার সম্পর্কে তেমন কোনো জানাশোনা রাখেননি। বর্তমান পুঁজিবাজার যে কোথায় চলে গেছে সে বিষয়ে তাদের ধারণা নেই।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের পুঁজিবাজারের যে সমস্যা সেটি বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ সমাধান করতে পারবে না। পুঁজিবাজারকে ন্যূনতম আঞ্চলিক মানে নিয়ে যেতে হলেও বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে নিয়োগ দেয়ার বিকল্প নেই। পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উচ্চমানের নৈতিক মানদণ্ড রয়েছে এমন ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে নিয়োগ করা হলে স্বার্থের সংঘাত থাকবে না। তাছাড়া পুরো বিশ্বেই এ ধরনের চর্চা প্রচলিত রয়েছে, তাই আমাদের এখানেও সেটি করা উচিত বলে আমি মনে করি।”
এমএমএইচ/এমটিআই