পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী ৪ প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম তদন্তে বিএসইসির কমিটি

দেশের পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এরই অংশ হিসেবে চারটি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বিজ্ঞাপন
গত ১১ মার্চ এসব অনিয়ম তদন্তে চারটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্তের আওতায় আসা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো– এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেড, প্রিমিয়ার লিজিং সিকিউরিটিজ লিমিটেড, গ্রিন ডেল্টা সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং মার্চেন্ট ব্যাংক হিসেবে কর্মরত লঙ্কাবাংলা ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম গণমাধ্যমকে জানান, প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে নেগেটিভ ইকুইটি (ঋণাত্মক মূলধন), মার্জিন ঋণ প্রদান নীতিমালা, আর্থিক প্রতিবেদন এবং করপোরেট সুশাসনে বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে। এসব অনিয়ম বাজারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এ কারণেই পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তদন্তে যেসব বিষয় গুরুত্ব দেওয়া হবে, তার মধ্যে অন্যতম হলো– নেগেটিভ ইকুইটি বা অবাস্তবায়িত লোকসান থাকা সত্ত্বেও এই প্রতিষ্ঠানগুলো নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে কি না। বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, লোকসানের তথ্য গোপন করে লভ্যাংশ দেওয়া বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার শামিল। বিশেষ করে এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজ এবং লঙ্কাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসের ক্ষেত্রে লভ্যাংশ-সংক্রান্ত এই অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগতভাবে তথ্য জালিয়াতি এবং আর্থিক প্রতিবেদনে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে প্রিমিয়ার লিজিং সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) না রেখে গ্রাহকের পাওনাকে সম্পদ হিসেবে দেখিয়ে আর্থিক ঝুঁকি আড়াল করার অভিযোগ রয়েছে।
মার্জিন ঋণ ও শেয়ার কারসাজি তদন্ত কমিটিগুলো প্রতিষ্ঠানগুলোর মার্জিন ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়াও পরীক্ষা করবে। অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত সীমার বাইরে ঋণ প্রদান এবং গ্রাহকের অনুমতি ছাড়াই ক্যাশ অ্যাকাউন্টকে মার্জিন বা নেগেটিভ ইকুইটি অ্যাকাউন্টে রূপান্তর করা হয়েছে। বিএসইসি ধারণা করছে, এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজ এবং প্রিমিয়ার লিজিং সিকিউরিটিজের নেগেটিভ ইকুইটি অ্যাকাউন্টগুলো ব্যবহার করে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি বা শেয়ারের দাম কারসাজি করা হয়ে থাকতে পারে।
বিজ্ঞাপন
লঙ্কাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসের ক্ষেত্রে ১০৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকার প্রদেয় সুদ সঠিকভাবে আর্থিক প্রতিবেদনে না দেখিয়ে মুনাফা ও রিটেইনড আর্নিংস বাড়িয়ে দেখানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ইফতেখার আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে গ্রিন ডেল্টা সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াফি শফিক মিনহাজ খান এটিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার একটি 'রুটিন কাজ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কমিশনের চিঠি পেয়েছি এবং তাদের তদন্তে সহযোগিতা করছি। নেগেটিভ ইকুইটি সংক্রান্ত যে অসংগতির কথা বলা হচ্ছে, তা খুবই সামান্য।’
বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করপোরেট সুশাসনের অভাব এবং দুর্বল তদারকির সুযোগে এ ধরনের অনিয়ম বছরের পর বছর টিকে রয়েছে। বিএসইসির এই কঠোর অবস্থানকে তারা সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাদের মতে, দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রতিটি তদন্তের জন্য পৃথক কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনগুলো আগামী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে বিএসইসি।
এমএমএইচ/বিআরইউ