প্রাথমিক শিক্ষায় আসছে বড় পরিবর্তন, ফিরছে লিখিত পরীক্ষা

প্রাথমিক শিক্ষায় বড় ধরনের সংস্কারের পথে হাঁটছে সরকার। শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে শিখনকে আনন্দময় ও কার্যকর করতে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে যুগোপযোগী পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তরে প্রচলিত লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক ও ধারাবাহিক মূল্যায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিশুদের পঠন দক্ষতা ও ভাষা শেখার সক্ষমতা বাড়াতে প্রবর্তন করা হচ্ছে আধুনিক ‘জিআরআর’ (গ্রাজুয়্যাল রিলিজ অব রেসপনসিবিলিটি) মডেল। এই পদ্ধতিতে ধাপে ধাপে শিক্ষার্থীর ওপর শেখার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে।

জানা গেছে, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) ও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এ বিষয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করেছে। পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকেই নতুন এই মূল্যায়ন ও পাঠদান কাঠামো বাস্তবায়ন শুরু করবে সরকার।
মুখস্থনির্ভরতা কমাতে আধুনিক ‘জিআরআর’ মডেল
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্কুলে ভর্তি ও উপস্থিতির হারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও প্রাথমিক শিক্ষার প্রধান দুর্বলতা রয়ে গেছে এর গুণগত মানে। নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকলেও অনেক শিশু প্রত্যাশিত মাত্রায় পড়া, লেখা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। বিশেষ করে সাবলীলভাবে বাংলা পড়া, সহজ গাণিতিক হিসাব এবং ইংরেজি ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে।

প্রাথমিক পর্যায়ের এই শিখন ঘাটতি পরবর্তী ধাপে শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নড়বড়ে এই ভিত্তি মজবুত না হলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব নয়।
এই বাস্তবতা বিবেচনা করেই প্রাথমিক শিক্ষার মূল্যায়ন ও পাঠদান পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন ও দক্ষতা বিকাশে গুরুত্ব দিতে প্রবর্তন করা হচ্ছে আধুনিক ‘জিআরআর’ মডেল।
‘জিআরআর’ পদ্ধতি কী
‘জিআরআর’ বা ‘গ্রাজুয়্যাল রিলিজ অব রেসপনসিবিলিটি’ মূলত একটি ক্রম-অগ্রসরমান শিক্ষণ পদ্ধতি, যেখানে শেখার দায়ভার ক্রমান্বয়ে শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই কৌশলটি সাধারণ অর্থে ‘আমি করি, আমরা করি, তুমি একা করো’—এই তিনটি ধাপে পরিচিত হলেও বাস্তবে এটি চারটি সুনির্দিষ্ট পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হবে।
এই পদ্ধতির প্রথম ধাপটি হলো ‘মডেলিং’; যেখানে শিক্ষক নিজে পাঠ পড়ে শোনাবেন এবং সঠিকভাবে পড়ার কৌশল প্রদর্শন করবেন। দ্বিতীয় ধাপে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী একসঙ্গে পাঠে অংশ নেবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা সরাসরি শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে অনুশীলনের সুযোগ পাবে। তৃতীয় ধাপে শিক্ষার্থীরা জুটিতে বা ছোট দলে ভাগ হয়ে সহপাঠীদের সহযোগিতায় পাঠ গ্রহণ করবে, যা একটি কার্যকর পারস্পরিক শেখার পরিবেশ তৈরি করবে।
সবশেষ ধাপে শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে, কারও সহায়তা ছাড়াই নিজে নিজে পড়তে ও বিষয়বস্তু বুঝতে সক্ষম হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের ভূমিকা ধীরে ধীরে ‘নির্দেশক’ থেকে ‘সহায়ক’ পর্যায়ে নেমে আসে এবং শিক্ষার্থী হয়ে ওঠে শেখার প্রধান চালিকাশক্তি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পদ্ধতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের পঠন দক্ষতা, ভাষা বোঝার ক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে শিশুরা পড়াশোনাকে পরীক্ষার চাপ হিসেবে নয়, বরং একটি আনন্দময় অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করতে শিখবে।
নতুন পদ্ধতি এ বছর থেকেই বাস্তবায়নের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) ও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) যৌথ উদ্যোগে প্রণীত এই প্রস্তাবনাকে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য একটি যুগান্তকারী কাঠামোগত সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন এই মূল্যায়ন ও পাঠদান পদ্ধতি চলতি বছর থেকেই বাস্তবায়নের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে আগামীকাল মঙ্গলবার (১২ জানুয়ারি) মন্ত্রণালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠকে থেকে প্রাথমিক স্তরের নতুন মানবণ্টন ও মূল্যায়ন কাঠামো চূড়ান্ত করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
তবে, এই সংস্কার প্রক্রিয়া পুরোপুরি নির্বিঘ্ন নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, কিছু নোট ও গাইড বই ব্যবসায়ী নতুন মানবণ্টনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বই ইতোমধ্যে ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। নতুন এই আধুনিক পদ্ধতি চালু হলে এসব গাইড বই অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, নতুন মূল্যায়ন কাঠামোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু হয় গত বছরের শেষ দিকে। গত ২১ ডিসেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে এনসিটিবির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারী একটি চিঠি পাঠান, যেখানে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে কার্যকর করার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন নির্দেশিকার খসড়া তুলে ধরা হয়। এতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা যুক্ত করা হয়েছে।
এর আগেই জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) ২০২৬ সালের বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনায় ‘জিআরআর’ মডেলভিত্তিক পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের স্বাধীন পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার একটি বিস্তৃত রূপরেখা প্রস্তাব করে।
প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি : যেভাবে হবে নতুন মূল্যায়ন ও পরীক্ষা
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারী জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন নির্দেশিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে, এই নির্দেশিকা কার্যকর করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক আদেশ আসবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকেই। এক্ষেত্রে এনসিটিবির ভূমিকা থাকবে মূলত বাস্তবায়ন পর্যায়ে।
তিনি আরও বলেন, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। শিক্ষক, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সমন্বিত মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি করেছি।
অন্যদিকে নতুন কাঠামো অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে আগে যেখানে শুধু শ্রেণিকক্ষভিত্তিক কার্যক্রম ছিল। সেখানে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে সামষ্টিক মূল্যায়নের অংশ হিসেবে লিখিত পরীক্ষা যুক্ত করা হচ্ছে। এই দুই শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে ৫০ নম্বর থাকবে ধারাবাহিক মূল্যায়নে এবং বাকি ৫০ নম্বর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। অন্যান্য বিষয়ে ৫০ নম্বরের মধ্যে ২৫ নম্বর ধারাবাহিক এবং ২৫ নম্বর সামষ্টিক মূল্যায়নে রাখা হয়েছে।
তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে মূল্যায়ন আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। এসব শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বিজ্ঞান এবং ধর্ম শিক্ষা বিষয়ে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৩০ নম্বর ধারাবাহিক মূল্যায়নে এবং ৭০ নম্বর সামষ্টিক মূল্যায়নে নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মৌখিক বা ব্যবহারিক পরীক্ষাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। শিল্পকলা এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ে ৫০ নম্বরের মধ্যে ১৫ নম্বর ধারাবাহিক এবং ৩৫ নম্বর সামষ্টিক মূল্যায়নে রাখা হয়েছে।

তা ছাড়া, নতুন ব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে ধারাবাহিক ও সামষ্টিক— এই দুই ধারায়। দৈনন্দিন পাঠ কার্যক্রমে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি যাচাই করবে ধারাবাহিক মূল্যায়ন, আর নির্দিষ্ট সময় শেষে শিক্ষার্থীর সামগ্রিক দক্ষতা নিরূপণ করবে সামষ্টিক মূল্যায়ন। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা, যা এতদিন প্রাথমিক স্তরে সীমিত পরিসরে ছিল।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান মনে করেন, এই নতুন মূল্যায়ন নির্দেশিকা প্রাথমিক শিক্ষায় একটি মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। এ বিষয়ে ১৩ জানুয়ারি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সব পক্ষের সম্মতি পাওয়া গেলে চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই নতুন মূল্যায়ন নির্দেশিকা কার্যকর করা সম্ভব হবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
আরএইচটি/এমজে
