দূরত্ব ঘুচছে : এক ছাতার নিচে আসছে শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয়

দেশের শিক্ষা প্রশাসনের দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে সমন্বয়ের পথে হাঁটছে বর্তমান সরকার। প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার মধ্যকার নীতিনির্ধারণী দূরত্ব ঘোচাতে এবার দুই মন্ত্রণালয়কে আনা হয়েছে একই নেতৃত্বের ছায়ায়। প্রথমবারের মতো শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার তুলে দেওয়া হয়েছে দুজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর হাতে। ফলে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো থাকলেও এখন থেকে শিক্ষার সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হবে একই টেবিলে। এই ‘এক কমান্ড’ ব্যবস্থার মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন এবং প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সচিবালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আগে দুই মন্ত্রণালয় আলাদা মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর অধীনে থাকায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চরম সমন্বয়হীনতা দেখা দিত। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে একজন শিক্ষার্থী যখন মাধ্যমিকে পদার্পণ করত, তখন কারিকুলাম, পাঠদান পদ্ধতি এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এক বিশাল অসামঞ্জস্যের মুখোমুখি হতে হতো। দুই মন্ত্রণালয়ের আলাদা পরিকল্পনা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করত। এই দূরত্ব ঘোচাতেই এবার একই নেতৃত্বকে দুই দপ্তরের চাবিকাঠি দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের একজন পদস্থ কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে জানান, সমন্বয় না থাকার কারণে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের মতো করে প্রকল্প নিত, আর শিক্ষা মন্ত্রণালয় কাজ করত ভিন্ন ধারায়। অনেক সময় দেখা যেত, প্রাথমিকে যে লার্নিং আউটকাম বা শেখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে, মাধ্যমিক স্তরে গিয়ে তার ধারাবাহিকতা থাকছে না। আবার জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) দুই মন্ত্রণালয়ের আলাদা চাওয়া ও নির্দেশনার কারণে সময়মতো কারিকুলাম চূড়ান্ত করতে হিমশিম খেত। এখন যেহেতু মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী উভয় দপ্তরের শীর্ষ পদে আছেন, তাই একই টেবিল থেকে সমন্বিত সিদ্ধান্ত আসা সহজ হবে। একইসঙ্গে নতুন এই প্রশাসনিক কাঠামোয় কাজের ধরনেও বড় পরিবর্তন আসবে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একই নেতৃত্বে আনার ফলে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক দূরত্ব ঘুচতে চলেছে। এখন থেকে একজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রীর অধীনে দুটি মন্ত্রণালয় পরিচালিত হওয়ায় নীতিনির্ধারণে অভিন্নতা আসবে। ফলে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সহজ হবে এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে দ্রুত ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে
শিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন দায়িত্ব নিয়েই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ফাইল জট ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে তিনি কঠোর অবস্থানে থাকবেন। একইসঙ্গে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা— উভয় মন্ত্রণালয়ের কোনো ফাইলই প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের ‘স্ক্রিনিং’ বা পর্যবেক্ষণ ছাড়া সরাসরি মন্ত্রীর টেবিলে যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ব্যবস্থার ফলে সবচেয়ে বড় সুফল আসবে কারিকুলাম ও শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে। আগে দুই সচিবালয়ের ফাইল চালাচালিতে মাসের পর মাস সময়ক্ষেপণ হতো, যা এখন ‘এক কমান্ড’-এর কারণে দ্রুত সমাধান হবে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে যে ভিত্তি তৈরি হবে, তার ওপর ভিত্তি করেই উচ্চশিক্ষার রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব হবে। বাজেট বরাদ্দ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কোনো ধরনের ‘ওভারল্যাপিং’ বা একই কাজের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সুযোগ থাকবে না।
প্রশাসনিক গতিশীলতা আনতে ‘৭২ ঘণ্টার নিয়ম’ একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশ অনুযায়ী, কোনো ফাইল তিন দিনের বেশি দপ্তরে আটকে রাখা যাবে না। ফাইল নিষ্পত্তির এই দ্রুত প্রক্রিয়া শিক্ষাখাতের স্থবিরতা দূর করবে এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করবে। এই উদ্যোগটি মূলত আমলাতান্ত্রিক স্বচ্ছতা ও কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার একটি বড় মাধ্যম
তবে, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও কম নয়। দুটি আলাদা সচিবালয়, আলাদা সচিব এবং হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একই মানসিকতায় নিয়ে আসা এবং দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জড়তা কাটানো হবে ‘মিলন-ববি’ জুটির জন্য বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি তৈরি করা এবং দুই দপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের প্রকৃত সমন্বয় বজায় রাখাটাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
চ্যালেঞ্জ থাকলেও একটি বাস্তবভিত্তিক ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার মাধ্যমেই এই উদ্যোগ সফল হতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ। গতকাল সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা একই কাঠামোর অধীনে আনার উদ্যোগটি ইতিবাচক। দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষাবিদরা বলে আসছেন, শিক্ষার এই দুই স্তরের মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা থাকা জরুরি। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা কেবল পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক— কিন্তু দেশের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক লক্ষ্য (এসডিজি-৪) অর্জনের জন্য মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাকে সর্বজনীন করার চিন্তা করা প্রয়োজন।’
দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত যাত্রা কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং এটি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার একটি দীর্ঘমেয়াদের মিশন। একই ছাতার নিচে কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় গ্রামীণ ও শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত বৈষম্য দূর করা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কারিকুলাম বাস্তবায়ন সহজ হবে। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক স্তর থেকেই একটি সুসংগঠিত এবং মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থার সুফল ভোগ করতে পারবে
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু একজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রীর অধীনে দুই মন্ত্রণালয় আনা যথেষ্ট নয়; প্রশাসনিক কাঠামো, পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় প্রকৃত সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। এতদিন আলাদা ব্যবস্থায় চলা দুটি খাতকে একত্রিত করা সহজ নয়, তাই এটি সুচিন্তিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে কারিকুলামের ধারাবাহিকতা, শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং পর্যায়ক্রমে সমগ্র বিদ্যালয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার জন্য সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা, অর্থায়ন, জবাবদিহিতা ও দায়িত্ববণ্টনের বিষয়গুলোও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।’
সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া এগোলে নতুন সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও সতর্ক করেন এই শিক্ষাবিদ।
এমন ইতিবাচক উদ্যোগ আশার সঞ্চার করছে উল্লেখ করে শিক্ষাবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, নির্বাচিত বা অনির্বাচিত— যে সরকারই হোক, শুরুটা যদি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে হয়, সেটি আশার সঞ্চার করে। বর্তমান উদ্যোগেও সেই ইতিবাচক দিক দেখতে পাচ্ছেি। বিশেষ করে শিক্ষা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রচেষ্টা দীর্ঘদিনের একটি প্রত্যাশা ছিল। বিশ্বের বহু দেশে একীভূত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অন্তত টারশিয়ারি লেভেল পর্যন্ত একটি একক মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার প্রস্তাব বহুদিন ধরেই আলোচিত। প্রয়োজনে উচ্চশিক্ষার জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় থাকতে পারে, তবে দীর্ঘদিন ধরে যে সমন্বয়হীনতা ও বিশৃঙ্খলা চলে আসছে, তা দূর করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, সমন্বয়হীনতা কাটিয়ে উঠতে পারলে শিক্ষাখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব। যদিও সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে দেশে দক্ষ মানবসম্পদ প্রচুর। সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
৭২ ঘণ্টার বেশি আটকে থাকবে না ফাইল : শিক্ষামন্ত্রী
দুই মন্ত্রণালয় একীভূত করার সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘অতীতে শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা আলাদা থাকায় নীতিগত সমন্বয়ে জটিলতা তৈরি হতো। এখন একই ছাতার নিচে কাজ করায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া দ্রুত হবে।’
তিনি বলেন, ‘সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে সমন্বিত আলোচনার ভিত্তিতে। কোনো ফাইলই ৭২ ঘণ্টার বেশি আটকে থাকবে না। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ফাইল নিষ্পত্তির কঠোর নির্দেশনা থাকবে, যাতে প্রশাসনিক গতি বাড়ে এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিন্দুমাত্র দেরি না হয়।’
আরএইচটি/