গাইড ও কোচিং বাণিজ্যের কফিনে শেষ পেরেক, আসছে কঠোর আইন

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ও দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিশৃঙ্খলা দূর করতে চূড়ান্ত হয়েছে ‘শিক্ষা আইন ২০২৬’-এর খসড়া। কয়েক দশকের বিতর্কিত নোট-গাইড ব্যবসা ও কোচিং বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করতে এ আইনে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার এ আইন প্রবর্তনের পরের তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কোচিং সেন্টার, নোট-গাইড প্রকাশ এবং প্রাইভেট টিউশন স্থায়ীভাবে বন্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সূত্রে পাওয়া শিক্ষা আইনের খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত আইনে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাস্তরে বড় ধরনের বিন্যাস আনা হয়েছে। এখন থেকে প্রাথমিক শিক্ষা হবে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এবং প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক স্তর থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অন্যদিকে, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ আইন অনুযায়ী সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা হবে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক এবং একে শিশুর মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য করা হবে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে সরকার একটি ‘জাতীয় শিক্ষা একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করবে। এই একাডেমি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষা গবেষণা, উদ্ভাবন এবং পাঠ্যক্রম মূল্যায়নে সরকারকে সরাসরি নীতিগত সহায়তা ও পরামর্শ দেবে। এ ছাড়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি লেভেলের শিক্ষক নিয়োগের জন্য যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন ও নিবন্ধনের দায়িত্ব থাকবে ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ’ (এনটিআরসিএ)-এর ওপর।
আইনের খসড়ায় জাল সার্টিফিকেটের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি জাল সনদ ব্যবহার করে বা ভুয়া নিয়োগ রেকর্ড তৈরি করে সরকারি বা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি গ্রহণ করেন, তবে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে দ্রুত থানায় মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে অপরাধীকে প্রশাসনিক শাস্তির মুখোমুখিও হতে হবে বলে খসড়ায় বলা হয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাকে এ আইনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেকোনো ধরনের শারীরিক শাস্তি বা মানসিক নিপীড়ন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষাঙ্গনে র্যাগিং, বুলিং বা সাইবার বুলিংয়ের মতো নিগ্রহের শিকার হলে দায়ী ব্যক্তি বা শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরিতে যোগদান করাকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।

ইংরেজি মাধ্যম ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য নতুন নিয়ম
নতুন আইনে ইংরেজি মাধ্যম ও বিদেশি শিক্ষাক্রমে পরিচালিত স্কুলগুলোতেও নজরদারি বাড়াচ্ছে সরকার। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশীয় সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষা শিক্ষা সরকার নির্ধারিত নিয়মে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকবে। অন্যদিকে, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি রক্ষায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য পর্যায়ক্রমে তাদের নিজ নিজ মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার কথা বলা হয়েছে।
একইসঙ্গে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কারিগরি শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরা এখন থেকে ক্রেডিট ওয়েভারের মাধ্যমে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিংসহ উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া কারিগরি শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা আইনের খসড়ায় উল্লেখ আছে।
নোট-গাইড ও কোচিং বন্ধে কঠোর অবস্থান
আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে প্রশ্ন-উত্তর সংবলিত গাইড বই প্রকাশ করতে পারবে না। তবে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক সহজে বোঝার জন্য সরকার অনুমোদিত ‘সহায়ক পুস্তক’ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। কোচিং বা প্রাইভেট টিউশন নিয়ন্ত্রণে সরকার আলাদা বিধিমালা প্রণয়ন করবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ আইন বাস্তবায়িত হলে শিক্ষাক্ষেত্রে চলমান বৈষম্য দূর হবে এবং একটি আধুনিক ও স্মার্ট প্রজন্ম তৈরিতে বাংলাদেশ বিশ্বমানের সক্ষমতা অর্জন করবে।
উচ্চশিক্ষায় নতুন দিগন্ত : অভিন্ন গ্রেডিং ও সমন্বিত গবেষণা
প্রস্তাবিত ‘শিক্ষা আইন ২০২৬’-এর খসড়ায় দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে নবম অধ্যায়ে অনেকগুলো পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করতে এখন থেকে সব সরকারি ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘অভিন্ন গ্রেডিং পদ্ধতি’ চালুর বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলের সমতা নিশ্চিত হবে বলেও নতুন আইনে প্রত্যাশা জানানো হয়েছে।
খসড়া ‘শিক্ষা আইন ২০২৬’ নিয়ে মতামত জানানো যাবে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত
আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রস্তাবিত ‘শিক্ষা আইন ২০২৬’-এর খসড়া সর্বসাধারণের পর্যালোচনার জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। আইনের কোনো ধারা বা উপধারা নিয়ে দেশি-বিদেশি শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, অভিভাবক বা যেকোনো সচেতন নাগরিক তাদের মতামত ও পরামর্শ দিতে পারবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার জনমত যাচাইয়ের মাধ্যমে খসড়াটি আরও সমৃদ্ধ করতে চায়। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টার মধ্যে [email protected] ই-মেইল ঠিকানায় মতামত জানানো যাবে।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রাপ্ত যৌক্তিক পরামর্শগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হবে। আমরা প্রত্যাশা করি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এ আইন কার্যকর হলে দেশের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরে আসবে।
আরএইচটি/এসএসএইচ
