মাধ্যমিকে শিখন চিত্র : বাংলায় ভালো, ইংরেজি-গণিতে ভয়াবহ দুর্বলতা

মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা মাতৃভাষা বাংলায় তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক শিখন অর্জন করলেও ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে ভয়াবহ দুর্বলতায় ভুগছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও ভিন্ন ধরনের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত একটি শিখন যাচাই অভীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, ইংরেজি ও গণিতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ন্যূনতম মানদণ্ড অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কনসালটেশন কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গঠিত কনসালটেশন কমিটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১১টি বিদ্যালয় সরেজমিনে পরিদর্শন করে এবং ১০টি বিদ্যালয়ের অষ্টম ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিখন অর্জন মূল্যায়ন করেছে। এই মূল্যায়নে শহর ও গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি চর, জলাবদ্ধ এলাকা, চা-বাগান, হাওর, অতি দরিদ্র অঞ্চল, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকা, শরণার্থী ক্যাম্প সংলগ্ন অঞ্চল, উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকা এবং শিল্পাঞ্চল অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সরকারি, এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিওভুক্ত– এই তিন ধরনের বিদ্যালয়ের মোট ৪৩৭ জন শিক্ষার্থীর বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে ৫০ নম্বরের একটি অভীক্ষা নেওয়া হয়।
অভীক্ষায় বাংলা ও ইংরেজিতে ১৫ নম্বর করে এবং গণিতে ২০ নম্বরের প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলা বিষয়ের সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে ৯৬ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী। ইংরেজির ক্ষেত্রে এই হার ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশ। গণিতে প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী চারটি বা তার বেশি প্রশ্নের সমাধানের চেষ্টা করলেও সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে মাত্র ২৭ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী, যা গণিতভীতি ও সমস্যা সমাধানে দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
বিষয়ভিত্তিক গড় স্কোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অর্জন তুলনামূলকভাবে সর্বোচ্চ। তবে ইংরেজি ও গণিতে গড় স্কোর অভীক্ষার মোট নম্বরের এক-তৃতীয়াংশেরও কম। ফলে সামগ্রিক শিখন অর্জনের মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
স্তরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলা বিষয়ে ৫২ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী মধ্যম স্তরে এবং ৪১ দশমিক ৪ শতাংশ উচ্চ স্তরে অবস্থান করলেও ইংরেজিতে ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং গণিতে ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ৩৩ শতাংশের নিচে স্কোর করেছে। গণিতে উচ্চ স্তরে থাকা শিক্ষার্থীর হার মাত্র ৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
জেন্ডারভিত্তিক বিশ্লেষণে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে বড় কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি। বাংলা ও ইংরেজিতে মেয়েরা সামান্য এগিয়ে থাকলেও গণিতে ছেলেরা তুলনামূলকভাবে ভালো করেছে। সামগ্রিক অর্জনে মেয়েদের গড় স্কোর ১৯ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং ছেলেদের ১৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা পরিসংখ্যানগতভাবে খুবই সামান্য পার্থক্য নির্দেশ করে।
এলাকাভিত্তিক বিশ্লেষণে শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে স্পষ্ট বৈষম্য দেখা গেছে। বাংলা, ইংরেজি ও গণিত– তিন বিষয়েই শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা গ্রামাঞ্চলের তুলনায় এগিয়ে। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতে শহর-গ্রামের ব্যবধান যথাক্রমে প্রায় ১৪ শতাংশ ও ১০ শতাংশ। সামগ্রিক গড় অর্জনে শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ৩৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ স্কোর করেছে।
শ্রেণিভিত্তিক বিশ্লেষণে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অষ্টম শ্রেণির তুলনায় প্রতিটি বিষয়েই কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। তবে উভয় শ্রেণিতেই ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা প্রকট। অষ্টম শ্রেণির ৭৭ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং নবম শ্রেণির ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে ৩৩ শতাংশের নিচে স্কোর করেছে।
বিদ্যালয়ের ধরন অনুযায়ী বিশ্লেষণে দেখা যায়, নন-এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে পিছিয়ে। ইংরেজিতে তাদের গড় অর্জন মাত্র ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। গণিতে তিন ধরনের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবস্থাই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারি বিদ্যালয়ের ৮৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ, এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের ৬৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং নন-এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের ৯১ দশমিক ৪৩ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ নম্বর অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের অর্জনের সঙ্গে মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। উচ্চশিক্ষিত মায়েদের সন্তানেরা সব বিষয়েই তুলনামূলক ভালো ফল করেছে। অন্যদিকে, যেসব শিক্ষার্থীর মায়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাদের সামগ্রিক গড় অর্জন মাত্র ৩২ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
আঞ্চলিক বৈচিত্র্য বিশ্লেষণে অতি দরিদ্র ও হাওর অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক ফল তুলনামূলক ভালো হলেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকা, চা-বাগান, উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ফল অত্যন্ত হতাশাজনক। শিল্পাঞ্চলে গণিতে গড় অর্জন সর্বনিম্ন– মাত্র ১৫ শতাংশ।
কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ। কনসালটেশন কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন– মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহেদা ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ, সাংবাদিক মো. মুসা মিয়া, শেরেবাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুর রহমান এবং আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এ. কে. এম. মোস্তফা কামাল। কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সরকারি মাধ্যমিক অধিশাখার যুগ্মসচিব তরফদার মো. আক্তার জামীল।
আরএইচটি/বিআরইউ