মাধ্যমিকের শিখন ঘাটতি চরমে, ৯ম শ্রেণিতে বিভাগ বিভাজন বাদের প্রস্তাব

দেশের মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে সরকার গঠিত কনসালটেশন কমিটি।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এই খসড়া প্রতিবেদনে নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা– এই তিন বিভাগে বিভাজন তুলে দিয়ে দশম শ্রেণি পর্যন্ত একটিই সমন্বিত পাঠ্যক্রম চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। একাদশ শ্রেণি থেকে এই বিভাজন শুরু হওয়া বাঞ্ছনীয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
খসড়া সুপারিশে জানানো হয়েছে, মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে গঠিত এই কমিটি ঢাকা, রাজশাহী, যশোর ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে ৪৪টি কর্মশালার মাধ্যমে তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে শিখন ঘাটতি ভয়াবহ। কমিটির নেওয়া এক বিশেষ অভীক্ষায় দেখা যায়, গণিতে শহর অঞ্চলের ৬১.৯০ শতাংশ এবং গ্রাম অঞ্চলের ৭৪.৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী ৩৩ শতাংশের নিচে নম্বর পেয়েছে।
কমিটি বিদ্যমান মুখস্থনির্ভর পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নের ওপর জোর দিয়েছে। সুপারিশ অনুযায়ী, পাবলিক পরীক্ষা কেবল বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সমাজ পাঠের মতো ৫টি মূল বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। বাকি বিষয়গুলোর মূল্যায়ন হবে বিদ্যালয় পর্যায়ে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায়। অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা এবং প্রাথমিক ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু না করার কঠোর সুপারিশ করা হয়েছে।
একইসঙ্গে মাধ্যমিক স্তরে মানসম্মত শিক্ষার প্রধান অন্তরায় হিসেবে শিক্ষক ও জনবল সংকটকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে অবিলম্বে শূন্যপদ পূরণ এবং দুর্গম এলাকায় শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতার সুপারিশ করা হয়েছে। শিক্ষকদের বদলির ক্ষেত্রে প্রচলিত সরকারি নিয়মের বাইরে গিয়ে শিক্ষা ও শিক্ষার্থীর স্বার্থ বিবেচনায় স্বতন্ত্র নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া, মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের জনবল অন্তত দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে কমিটি।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য কমিটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিভিন্ন সংস্থা যেমন– এনসিটিবি, মাউশি ও এনটিআরসিএ-এর কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা ও সক্ষমতার ঘাটতি খুঁজে পেয়েছে। এই সংকট নিরসনে একটি স্থায়ী ‘শিক্ষা কমিশন’ গঠন এবং খণ্ডিত প্রকল্পের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ‘সেক্টর-ওয়াইড প্ল্যান’ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এছাড়া, শিক্ষা সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে সংগতি রেখে শিক্ষাবর্ষ পুনর্নির্ধারণের একটি ব্যতিক্রমী প্রস্তাব এসেছে প্রতিবেদনে। এতে সেপ্টেম্বর থেকে জুন মাস পর্যন্ত শিক্ষাবর্ষ পালন এবং জুলাই-আগস্ট মাসে বার্ষিক গ্রীষ্মকালীন ছুটি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষা কেবল পাঠ্যজ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র নয়, এটি কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সংবেদনশীল সময়। তাই এই স্তরে বৈষম্য নিরসন ও শিক্ষার মানোন্নয়ন অপরিহার্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কনসালটেশন কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন– মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহেদা ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ, সাংবাদিক মো. মুসা মিয়া, শেরেবাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুর রহমান এবং আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এ. কে. এম. মোস্তফা কামাল।
কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সরকারি মাধ্যমিক অধিশাখার যুগ্মসচিব তরফদার মো. আক্তার জামীল।
আরএইচটি/বিআরইউ