বিজ্ঞাপন

শূন্য পদের সমান প্রার্থী পাবেন সুপারিশ

জুনেই শেষ হবে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের কর্মযজ্ঞ

অ+
অ-
জুনেই শেষ হবে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের কর্মযজ্ঞ

স্বাধীনতার পর এই প্রথমবারের মতো দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগে কেন্দ্রীয় পরীক্ষাভিত্তিক পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। দীর্ঘদিনের কমিটি-নির্ভর নিয়োগ পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে মেধা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের এই উদ্যোগকে শিক্ষা খাতে বড় সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

বিজ্ঞাপন

ইতোমধ্যে ১২ হাজার ৯৫১টি শূন্য পদের বিপরীতে ৪১ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। আগামী ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য পরীক্ষার পর মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন করে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া জুন মাসের মধ্যেই শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এনটিআরসিএ’র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান পদে প্রার্থীদের লিখিত (এমসিকিউ) ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করা হবে। শূন্য পদের বিপরীতে ঠিক সমসংখ্যক প্রার্থীকে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হবে—অর্থাৎ অতিরিক্ত কোনো প্যানেল রাখা হবে না। এতে করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা কমবে এবং দ্রুত পদগুলো পূরণ করা সম্ভব হবে। তাছাড়া এতদিন এসব পদে নিয়োগ দিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি, যেখানে নানা সময় প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব ও অনিয়মের অভিযোগ উঠত। নতুন পদ্ধতিতে সেই ‘ছড়ি ঘোরানো’ কমিটির ক্ষমতা কার্যত কমে আসবে।

বিজ্ঞাপন

সংস্থাটির সূত্রে জানা গেছে, অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক সাড়া মিলেছে। আবেদন সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে দ্রুত বাড়তে বাড়তে ৪১ হাজার ছাড়িয়েছে। গত ২৫ মার্চ প্রকাশিত সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে মোট ১২ হাজার ৯৫১টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে ৯ হাজার ৭০৮টি, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে ৩ হাজার ১৩১টি এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে ১১২টি পদ রয়েছে। আগের বিজ্ঞপ্তি বাতিল করে নতুন বিজ্ঞপ্তিতে শূন্য পদের সংখ্যা ৬৪৮টি কমানো হয়। আবেদন প্রক্রিয়া ২৮ মার্চ শুরু হয়ে ৪ এপ্রিল রাত পর্যন্ত চলে, আর নির্ধারিত ফি ৫ এপ্রিলের মধ্যে জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়।

এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন এসেছে পরীক্ষার কাঠামোতে। প্রার্থীদের ১০০ নম্বরের মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে বাছাই করা হবে—এর মধ্যে এমসিকিউ ৮০, শিক্ষাগত সনদে ১২ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৮ নম্বর নির্ধারিত। প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য ০.২৫ নম্বর কাটা হবে এবং এমসিকিউ ও মৌখিক পরীক্ষায় পৃথকভাবে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। আগামী ১৮ এপ্রিল প্রিলিমিনারি পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।

সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, এই বিশাল নিয়োগ কার্যক্রমে প্রশ্ন প্রণয়ন ও পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলোর একটি। কারণ, এত বড় পরিসরের পরীক্ষায় কোনো ধরনের গাফিলতি বা তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। এ কারণে শুরু থেকেই প্রশ্ন প্রণয়ন, সংরক্ষণ, মুদ্রণ ও সরবরাহ—প্রতিটি ধাপে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রশ্ন প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা সীমিত রাখা হচ্ছে এবং তাদের নির্বাচনেও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। প্রশ্নপত্র প্রস্তুত হওয়ার পর তা নিরাপদ ব্যবস্থায় সংরক্ষণ, নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনে মুদ্রণ এবং নির্ধারিত সময়ের আগে কোনোভাবেই বাইরে না যাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে একাধিক স্তরের নজরদারি রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরাসরি সম্পৃক্ত করে পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করা হচ্ছে।

এছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং, নিয়ন্ত্রিত অ্যাক্সেস, নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং গোপনীয় যোগাযোগ প্রটোকলের মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনাতেও থাকছে বাড়তি কড়াকড়ি—প্রবেশ ও বহির্গমন নিয়ন্ত্রণ, পর্যবেক্ষক নিয়োগ এবং কেন্দ্রভিত্তিক তদারকি জোরদার করা হচ্ছে।

dhakapost
এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম / ছবি : ঢাকা পোস্ট

সার্বিক বিষয়ে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, এটি শুধু একটি নিয়োগ কার্যক্রম নয়, বরং একটি বড় কর্মযজ্ঞ। অসংখ্য আবেদনকারীর মধ্য থেকে ধাপে ধাপে বাছাই করে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রার্থী নির্বাচন করতে হবে। আমরা যদি প্রতি পদের বিপরীতে দুজন করে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকি, তাহলে প্রায় ২৪ হাজার প্রার্থীর ভাইভা নিতে হবে, যা একটি বিশাল আয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে—গুণগত মানের সঙ্গে কোনো আপস করা যাবে না। 

নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময়সীমা নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, মৌখিক পরীক্ষার জন্য কিছু সময় লাগবে। তবে আমরা চেষ্টা করছি জুন মাসের মধ্যেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে। সময় স্বল্পতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও শূন্যপদগুলো দ্রুত পূরণ করা সরকারের অগ্রাধিকার। কারণ, এর আগে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সহকারী প্রধানসহ উচ্চপদে নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে হতো। ওই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব, অনিয়ম ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা ছিল। 

তিনি বলেন, এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ (এমপিওভুক্ত শিক্ষক) প্রক্রিয়া চালু হলেও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য ছিল না। ফলে একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ পেলেও প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগে কমিটির নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকত, যা একটি দ্বৈত কাঠামো তৈরি করত। এতে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা প্রশাসনিকভাবে, স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারতেন না। কারণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন কমিটির নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি, যিনি অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করতেন। নতুন পদ্ধতিতে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ দেওয়া হলে এই বৈষম্য দূর হবে এবং শিক্ষকরা আরও পেশাদার পরিবেশে কাজ করতে পারবেন।

প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ ঘিরে কোনো প্রভাবশালী মহল কিংবা কারও চাপ রয়েছে কি না—জানতে চাইলে চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, কোনো ধরনের চাপ নেই। আমরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছি এবং মন্ত্রণালয় থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা পাচ্ছি। নিয়োগে কোনো ধরনের অনিয়ম বা পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই। শতভাগ স্বচ্ছতা ও অটোমেশন নিশ্চিত করেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

আরএইচটি/এসএম