শাহরুখ খান শুধু তারকাই নন, একজন ঘরের মানুষ!

শাহরুখ খান- নামটি শুনলে মনের অজান্তেই যেমন বেজে ওঠে ‘মোহাব্বাতে’ সিনেমার ‘হামকো হামিসে চুরালো’র সেই মোহনীয় ভায়োলিন সুর, আবার চোখে ভাসে ‘কাভি খুশি কাভি গাম’ চলচ্চিত্রের ‘সুরাজ হুয়া মাদধাম’-এ মরুর গোধূলী লগ্নে দুই হাত ছড়ানো সেই ‘সিগনেচার পোজ’। এমনই তেজি-সাবলীল অভিব্যক্তি দিয়ে অভিনয়ের রাজ্যে যে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন শাহরুখ, তা হিন্দি সিনেমার জগতে আর কোনো তারকার পক্ষে ছোঁয়া প্রায় অসম্ভব। বিশ্ব চলচ্চিত্রের মঞ্চে আজ তিনি ঠিকই গ্লোবাল আইকন। কিন্তু ভারত তো বটেই, সীমান্তের দূরত্ব ঘুচিয়ে বাংলাদেশের সিনেপ্রেমীদের কাছে তিনি আজও ‘ঘরের মানুষ’ হিসেবেই সমাদৃত।
নভেম্বরের দুই তারিখ, শাহরুখ ভক্তদের জন্য সুখবর। আজ (রোববার) ৬০ বছরে পা রাখলেন এই নায়ক। ভারতসহ বিশ্বজুড়ে আজ তাকে নিয়ে কত হৈহৈ রৈরৈ; কারণ এই শাহরুখ যে একদিনে তৈরি হয়নি! ভারতের বাইরে বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা নেপালের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে শাহরুখ খানের পরিচিতি শুধু তারকা হিসেবে ছিল না, বরং যেন হয়ে উঠেছিলেন একজন ‘ঘরের মানুষ’। বিশেষ করে বাংলাদেশের মফস্বল শহরে নব্বইয়ের দশকের শেষে বা ২০০০ সালের শুরুর দিকের কিছু ঘটনাপ্রবাহ এর প্রমাণ দেয়।

তখনও টেলিভিশন সহজলভ্য হয়নি, আর অ্যান্টেনা নির্ভর বিটিভি ছাড়া অন্য চ্যানেল দেখা ছিল স্বপ্নের মতো। এরপর যখন কেবল নেটওয়ার্ক (ডিস) সংযোগ এলো, তখন ভারতীয় চ্যানেলগুলোর হাত ধরে হিন্দি সিনেমা ও টিভি ধারাবাহিকের সঙ্গে বাংলাভাষী দর্শক পরিচিত হলেন। এই সময়েই শাহরুখ খানের অ্যাকশন-ধর্মী সিনেমা ও রোম্যান্টিক চরিত্রগুলো বাঙালির মাঝে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পায়। ভাষা বা দেশের বিভেদ সেখানে আর কোনো বাধা হতে পারেনি; পর্দার ওপার থেকেই বাংলাভাষী দর্শকেরা তাকে আপন করে নেন।
সেই সময় স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় শাহরুখের জনপ্রিয়তা ছিল অন্যরকম। তার অভিনীত সিনেমার গানগুলো আলাদা করে প্রচার করা হতো। ‘হামকো হামিসে চুরালো’, ‘সুরাজ হুয়া মাধম’, ‘লাড়কি হায় আল্লাহ’, ‘বলো চুরিয়া’- এই জনপ্রিয় গানের অ্যালবামগুলো পরিচিত ছিল ‘বেস্ট অফ শাহরুখ খান’ নামে। মজার বিষয় হলো, গানগুলো কোন শিল্পী গাইছেন, তার পরিচয়ের চেয়েও শাহরুখের স্ক্রিনে উপস্থিতিই ছিল মুখ্য। বাংলাদেশের মফস্বলভিত্তিক চ্যানেলগুলোতে শাহরুখের গান ও দৃশ্যগুলো আলাদা গ্রহণযোগ্যতা পেত।

তবে শুধু ডিশ অ্যান্টেনা নয়, ক্যাসেট বা সিডি-ডিভিডির যুগেও এই চিত্র দেখা গেছে। পাড়ার গলির মোড়ের ক্যাসেটের দোকানে মিলত শাহরুখের ছবি সম্বলিত ভিসিআর ক্যাসেট এবং অডিও ক্যাসেট। সিডি-ডিভিডি'র যুগেও একই ধারা বজায় ছিল, যেখানে একটি সিডিতে শাহরুখের অভিনীত সিনেমার জনপ্রিয় ভিডিও গান থাকত ১৫ থেকে ৫০টি পর্যন্ত।
শাহরুখ খানের প্রভাব ছিল জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশেও। শৈশবের সেই দিনগুলোয় স্থানীয়ভাবে তৈরি প্লাস্টিকের খেলনা গাড়িতেও তার ছবির স্টিকার দেখা যেত। একটি খেলনা কেনার সময় একজন শিশু তাকে চিনতে না পারলেও অন্যেরা জিজ্ঞেস করত- ‘তুমি শাহরুখ খানের গাড়িটি নেবে?’, আর এসব ঘটনা প্রমাণ করে, তার মুখচ্ছবি তখন স্থানীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল।

এই আবেগ শুধু বাড়ি-ঘরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মানুষের দৈনন্দিন জীবন কিংবা লাইফস্টাইলেও যেন তার প্রভাব! সেলুন বা নাপিতের দোকানে আজও বহু জায়গায় বলিউড তারকাদের, বিশেষ করে শাহরুখ খানের ছবি ঝুলে থাকতে দেখা যায়। অনেকে তার হেয়ারস্টাইল থেকে অনুপ্রাণিত হয়েও নিজের চুলে এমন সাজ আনতেন; মানে তখনকার সময়ের মফস্বলের ফ্যাশন ইনফ্লুয়েনসারও ছিলেন এই শাহরুখ।

আরব সাগরের পাড়ে থাকা শাহরুখ খান হয়তো জানেন না, হাজার হাজার মাইল দূরের কত মফস্বলের খেলনা গাড়িতে তার হাসিমুখ সেঁটে ছিল, কিংবা পাড়ার কোন সেলুনে আজও তার ছবির দিকে তাকিয়ে চুল ছাঁটে এক কিশোর। একদিন এসেছিলেন শাহরুখ, সে সময় দর্শকের সেই বাঁধভাঙা সাড়া হয়তো তাকে শুধু আবেগের সমুদ্র দেখিয়েছে; কিন্তু সীমান্ত পেরিয়ে এই ‘ঘরের মানুষে’ পরিণত হওয়ার পেছনের নিবিড় গল্প হয়তো এখনও কিং খানের অজানা।
ডিএ
