বিজ্ঞাপন

রিভিউ

আফরান নিশোর ‘দম’ কি আশা মেটালো?

অ+
অ-
আফরান নিশোর ‘দম’ কি আশা মেটালো?

ট্রেলার বলে সিনেমার নায়ক আফরান নিশো আবারও কাঁদবে! এর আগে, ২০২৫ সালের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘দাগি’তে আফরান নিশোকে কাঁদতে দেখা গেছে। সারাটা সিনেমাতে কেঁদেছেনই প্রায়। তার আগের সিনেমা- ‘সুরঙ্গ’তেও বিশাল কষ্ট বুকে তার! সব মিলিয়ে ঈদ মানেই ‘নিশোর কান্না’ নামকরণ হয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কা মনে ভর করতেই পারে ট্রেলার দেখে। কিন্তু দম নিয়ে ভাবা এখানেই শেষ হয় না কারণ এটি রেদওয়ান রনির এমন একটি সিনেমা যার জন্য পরিচালক নিজেই অপেক্ষা করে ছিলেন। এবার সিনেমার ভেতরটা থেকে চট করে ঘুরে আসা যাক। 

বিজ্ঞাপন

সিনেমার শুরুতে দেখা যায় সাধারণ এক যুবক শাহজাহান ইসলাম নূরকে (আফরান নিশো)। গ্রামের চেনা আবহে তার সহজ-সরল জীবন। রানীর চরিত্রে পূজা চেরির আগমনও খুব স্নিগ্ধ। তাদের সম্পর্কের রসায়ন ফুটিয়ে তুলতে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের বিখ্যাত গান ‘তুমি চোখের আড়াল হও’ ব্যবহার করা হয়েছে। এই গানের মাধ্যমেই দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে প্লেব্যাকে ফিরেছেন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন; যার যথাযথ প্রয়োগ ঘটিয়েছেন পরিচালক।

সিনেমার গল্পের এক পর্যায়ে বদলে যায় নূরের পৃথিবী। এক অজানা উদ্দেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মাঝে পড়েন নূর, শুরু হয় লড়াই আর এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণার অধ্যায়। 

বিজ্ঞাপন

বাস্তবতা টানলে, পারিবারিক আর্থিক উন্নয়নের জন্য আট দশটা ছেলে যা ভাবে, সেটাই করেছে নূর। এই দীর্ঘ সংঘাত আর আবেগপ্রবণ মুহূর্তগুলো মূলত নিশোর অভিনয়ের ওপর ভর করেই এগিয়েছে। তবে অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীও কম কিছু ছিলেন না; সিনেমার মূল গল্পের মাঝে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করেছে তার চরিত্রটি।

এই সিনেমার পদে পদে স্রোতের মতই ভেসে আসতে থাকে টুইস্ট। কখনো মনে হবে সিনেমাটির মূল ভিলেন নূরের সহকর্মী। আবার মনে হবে মূল নায়ক ভিনদেশী তরুন, যে তাকে সাহায্য করে। কখনো কখনো মনে হবে পৃথিবীর যত বাঙালি আছে তাদের কাছে সবচেয়ে অবহেলিত প্রাণী ‘গাধা’ চরম প্রিয় হয়ে উঠতে পারে, কখনো মনে হবে যেকোনও প্রাণীই হয়ে উঠতে পারে মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু। 

গল্পের ফাঁকে বলে দেওয়া ভালো— পরিচালক কিছু দৃশ্য ধারণ করেছেন মায়াভরে। নিশোর বন্দীশালায় পায়রার ঝুপ করে নেমে আসা, বা গ্রামের উঠোনে রাজহাঁসের ডানা ঝাপ্টানির সাথে মানবিক আবেগ ছুঁয়ে গেছে। 

বিজ্ঞাপন

তবে আরও একটি কথা বলতেই হয়, ইদানিং বিভিন্ন ওয়েব কন্টেন্ট বা সিনেমায় একাধিকবার নাম উচ্চারণ করা মোটামুটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই সিনেমাতেও মূল চরিত্র একাধিকবার নিজের নাম উচ্চারণ করে। যা একটা সময় এটিকে ‘অতি ব্যবহার’ বলে মনে হতে পারে। সাথে ‘মুসলমানের বাচ্চা’ এতোবার উচ্চারিত হয়েছে যে, হঠাৎ দর্শকের মনে নানা প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। স্রোতের টানে গল্প কিনারায় পৌঁছানোর সঙ্গে অঙ্কগুলোরও হিসাব মিলিয়েছেন পরিচালক। বিশেষ করে পূজা চেরির রানী চরিত্রটি গল্পকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। তবে সিনেমাটি সংলাপগুলোর মাধ্যমে দর্শকদের মনে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। যেমন— যাকে দুষ্ট বলে ভাবা হচ্ছে, সেও হতে পারে আসল মিত্র!

অবশ্য, হতে পারে কী? সেটা অবশ্যই জানার জন্য দেখতে হবে ‘দম’ সিনেমাটি। সিনেমার অন্যতম প্রযোজনা সংস্থা আলফা আইয়ের পক্ষে শাহরিয়ার শাকিল একাধিকবার বলেছেন, পাইরেসি রোধে একই সাথে সিঙ্গেল স্ক্রিনে মুক্তি দেওয়া হয়নি এই সিনেমাটিকে। ফলে এক সপ্তাহ পরে সিঙ্গেল স্ক্রিনে চলা শুরু করলো দম। 

এবার কয়েকটি বিষয় উল্লেখ না করলে রিভিউ মুখ থুবড়ে পড়বে। এই সিনেমার ভালোদিক গুলো এক নজরে—

-    যথার্থ কাস্টিং এবং মূল চরিত্র রূপায়ণকারী শিল্পীদের অভিনয়
-    লোকেশন এবং চরিত্র অভিনেতাদের সংযুক্তি।
-    শিল্প নির্দেশনা ও কস্টিউম 
-    গল্প ও তার গাঁথুনি। 

সর্বোপরী, পরিচালক চেষ্টা করেছেন গল্পের আকাল হিসেবে আখ্যায়িত সিনেমার এই যুগে এমন একটা সুন্দর ও সত্য গল্পকে সিনেমার মত করে সামনে তুলে ধরার। যেখানে পুরুষ চরিত্রটি যেমন বলিষ্ঠ, তেমনই নারী চরিত্র শক্তিশালী। এই সিনেমায় ডলি জহুর মায়ের চরিত্রে ছেলের বউকে যেভাবে আগলে ধরেছেন, তা গ্রাম বাংলার বউ শাশুড়িদের ইতিবাচক সংকেত দেবে। এনজিওর গ্রামের এজেন্ট চরিত্রে অভিনয়কারী ছিলেন মানবিক। তবে ক্যামিওতে দুই প্রভাবশালী চরিত্রে ছিলেন বাংলাদেশের দুজন বিশিষ্ট অভিনয়শিল্পী; যাদের পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছে। বলা যায়, সিনেমার শেষে গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেন তারা।   

সমালোচনার দিক থেকে বলতে গেলে কয়েকটা বিষয় না বললেই নয়—

-সিনেমার লাগাম থাকে অনেক ক্ষেত্রে সম্পাদকের হাতেও থাকে। পরিচালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা দৃশ্য ধারণ করবেন, স্বাভাবিক। কিন্তু দম সিনেমার কিছু দৃশ্য, কিছু সিকোয়েন্স ছোট করা যেতে পারতো; এতে সিনেমার শ্রী বৃদ্ধিই হয়।

-যে কারণেই হোক— একই সংলাপ বার বার বলা হলে দর্শকের মন একটু হলেও বিক্ষিপ্ত হয়। কারণ গল্পের যেহেতু একটাই লেয়ার— তা হলো ঘরে ফেরা; ফলে সেখানে মনোযোগ ধরে রাখার জন্য অন্য কৌশলও থাকা যেতে পারে।

-দুই একটা চরিত্র কম সময়ের হলেও না থাকলে কিছু যেতো-আসতো না। 

-বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে টেনে গল্পকে অন্যদিকে নিয়ে যাবার দরকার কতটুকু ছিল তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। মুক্তিযুদ্ধ এমন একটি বিষয় যেখানে যুদ্ধের ময়দানে নিজেদের প্রমাণ করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পেয়েছে। ফলে মানবিকতায় কে আগে কে পিছে সে প্রশ্ন এখন অবান্তর।

বেলা শেষে বলতেই হয়, দম একটি সুনির্মিত সিনেমা। যেখানে পরিচালক রেদওয়ার রনি নিজেকে পুরোটা দিয়েছেন। গল্পের শুরু এবং শেষ দৃশ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন দীর্ঘদিন পর রূপালী পর্দায় ফিরে কোনোভাবেই তিনি গল্পের খেই হারিয়ে ফেলেননি। নিশোকে গ্রাম বাংলার দামাল ছেলের চরিত্রে যেমন দারুণভাবে তুলে ধরেছেন; পূজা চেরীকেও ভালো একজন অভিনয় শিল্পী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এছাড়া বিদেশি চরিত্রে দেশি কিছু শিল্পী নিজেদের সহজাত অভিনয় উপহার দিয়েছেন। 

গানে পারসা মেহজাবীন পূর্ণীর কাজ মন ছুঁয়ে গেছে। ‘আমি কোথায় পাবো তাহারে’ গানটি তিনি লিখেছেন, সুর করেছেন এবং ইমরান মাহমুদুলের সাথে কণ্ঠও দিয়েছেন। এই সিনেমায় আরেকটা গানের যথার্থ ব্যবহার হয়েছে, তা হলো ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’। আরাফাত মহসীন নিধি ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরে বরাবরের মতই স্টারমার্ক পেয়ে উৎড়ে গেছেন। 

সব মিলিয়ে দম একটি ভালো প্যাকেজ। শিশুদের নিয়ে দেখার জন্য ছাড়পত্র থাকলেও কিশোর বয়সীদের নীচের শিশু সাথে না নিলেই ভালো। দুই একটা দৃশ্য আছে যা হয়তো ভয় পাওয়ার মত। কিন্তু সেটাও গল্পের প্রয়োজনেই। 

সবশেষে বলতেই হয়, এবার ঈদে শাহজাহান ইসলাম নূরের বাড়ি ফেরার স্বপ্ন সফল যেমন হয়েছে, রূপালি পর্দা যদি হয় রেদওয়ান রনির বাড়ি ফেরা, রনির সেই স্বপ্নও বাড়ি ফিরেছে।

ডিএ