মোমেন কমিশনেরও আকস্মিক পতন, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি!

সাবেক ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ বিলুপ্ত করে ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে জন্ম নিয়েছিল ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ (দুদক)। সেই থেকে আজ পর্যন্ত মোট সাতটি কমিশন এই সংস্থার হাল ধরেছে। তবে, দুই দশকের এই পথচলায় ‘স্বাধীন’ তকমা থাকলেও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় দেখা গেছে চরম অস্থিরতা।
দুদকের আইনে প্রথমে কমিশনের মেয়াদ চার বছর এবং পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, সাতটি কমিশনের মধ্যে মাত্র তিনটি কমিশন তাদের নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছে। বাকি চারটি কমিশনই মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগে হয় পদত্যাগ করেছে, না হয় নাটকীয়ভাবে বিদায় নিয়েছে।
সংস্থার পেশাদারিত্ব ও ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সফলভাবে মেয়াদ শেষ করতে পেরেছিলেন— গোলাম রহমান, মো. বদিউজ্জামান ও ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন।
অন্যদিকে, বিচারপতি সুলতান হোসেন খান, সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী, মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ ও ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন মেয়াদ পূরণ করার অনেক আগেই আকস্মিকভাবে বিদায় নিতে হয়েছে কিংবা পদত্যাগ করেছে।
২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ২০ বছরে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মোট সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে। তবে মজার বিষয় হলো, আইনি সুরক্ষা থাকলেও সাতজন চেয়ারম্যানের মধ্যে মাত্র তিনজন (গোলাম রহমান, মো. বদিউজ্জামান ও ইকবাল মাহমুদ) তাদের নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছেন। বাকি চারজনকেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা অন্য কোনো কারণে মেয়াদের অনেক আগেই পদত্যাগ করতে হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে
পদত্যাগের বিষয়ে শেষ মুহূর্তে মুখ খুলেছেন বিদায়ী চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপের কথা অস্বীকার করে তিনি জানিয়েছেন, নবনির্বাচিত সরকারের পথ প্রশস্ত করতেই এই সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, ‘আমরা অনুভব করেছি যে, গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের নিজস্ব কিছু প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে সরকার নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে আরও অধিকতর যোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে কমিশন পুনর্গঠন করবে। এতে দুদকের যেমন ভালো হবে, তেমনি রাষ্ট্রেরও মঙ্গল হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
টিআইবি’র প্রতিক্রিয়া : ‘হতাশাজনক কিন্তু অবাক হওয়ার কিছু নেই’
দুদক চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের এই আকস্মিক পদত্যাগকে হতাশাজনক বললেও একে অপ্রত্যাশিত মনে করছেন না ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তার মতে, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতিরই অংশ।
‘আমাদের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি সংস্থাগুলোকে নিজেদের পছন্দের বলয়ে রাখার একটি পুরনো প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত রাখা যাবে— এমন মানসিকতা আমাদের দেশে এখনও গড়ে ওঠেনি। তাই এটি মোটেও নতুন কোনো বিষয় নয়।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, যারা এই সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারছেন না, তারা মূলত ‘স্বল্পমেয়াদি সুফল’ পাওয়ার নেশায় মত্ত। এটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী ফল বয়ে আনবে। এখন বড় প্রশ্ন হলো— পরবর্তী নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হয় এবং দুদকের স্বাধীনতার বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের যে বড় বড় অঙ্গীকার ছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন কতটুকু ঘটে।
দুদকের সাত কমিশনের ইতিহাস
বিচারপতি সুলতান হোসেন খান : এক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ বিলুপ্ত করে ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন। প্রথম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। চার বছরের মেয়াদ পূরণের আগেই ২০০৭ সালে ‘এক-এগারোর’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পদত্যাগ করে তাকে চলে যেতে হয়।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন গত ১৫ মাসে বিগত সরকারের রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অভিযান চালিয়েছে। এই সময়ে প্রায় ১৫ হাজার অভিযোগ জমা পড়ে এবং প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভিআইপি ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিশেষ করে দেশ-বিদেশের প্রায় সাড়ে তিনশ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ২৮ হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করা ছিল এই কমিশনের সবচেয়ে বড় সাফল্য
সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী : ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে পুনর্গঠিত হয় কমিশন। তৎকালীন সময়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব হতে দেখা গেছে কমিশনকে। তার সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই নেত্রীসহ শীর্ষ অধিকাংশ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। দুর্নীতিবিরোধী তার এমন ভূমিকা একদিকে আলোচনার জন্ম দিলেও অন্যদিকে সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ২ এপ্রিল চৌধুরী পদত্যাগ করেন। অর্থাৎ মেয়াদ পূরণের আগেই ফিরে যেতে হয় তাকে।
গোলাম রহমান : ২০০৯ সালে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান সাবেক সচিব গোলাম রহমান। তৎকালীন সময়ে চার বছরের মেয়াদ শেষে তিনি ২০১৩ সালের ২৩ জুন দায়িত্ব শেষ করেন। তার সময়ে আলোচিত হল-মার্ক কেলেঙ্কারি, ডেসটিনি কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কাজ করতে হয়েছিল। অনেকটা সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা সংস্থাটির চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের আলোচিত বক্তব্য ছিল ‘দুদককে দখ-দন্তহীন বাঘের’ সঙ্গে তুলনা করা।
মো. বদিউজ্জামান : গোলাম রহমানের পর দুদক কমিশনার মো. বদিউজ্জামানকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রথমে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে এবং পরে ২০১৩ সালের ২৬ জুন তাকে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তার স্থলে দুদকের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদকে। ২০১৬ সালের ১৩ মার্চ পর্যন্ত দুদক চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন বদিউজ্জামান। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক ছিলেন দুবার। বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মহাপরিচালকও ছিলেন তিনি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন প্রকাশ করেছিলেন বদিউজ্জামান। দুদক চেয়ারম্যান থাকার সময় তার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অভিযোগ হচ্ছে— ‘পদ্মা সেতু দুর্নীতির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া’।
ইকবাল মাহমুদ : ২০১৬ সালের মার্চে নিয়োগ পান অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সচিব ইকবাল মাহমুদ। ২০১৬ সালের ১০ মার্চ যোগ দিয়ে ২০২১ সালের ১৪ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ওই কমিশনের আমলে দুর্নীতির আসামিদের গ্রেপ্তারের বড় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। তার বক্তব্য ছিল, ‘দুদকের আসামি হয় জামিন, না হয় জেলে থাকবে’। বিরোধী দলের নেতাদের হয়রানি করার অভিযোগও উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। এছাড়া আমলাদের সুরক্ষা এবং গণহারে অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ : ২০২১ সালের মার্চে সাবেক সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ যখন দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন জনমনে এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সাবেক জেলা জজ মো. জহুরুল হক এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালে যুক্ত হন সাবেক সচিব মোছা. আছিয়া খাতুন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ ঘোষণা করেছিলেন— ‘প্রভাবশালী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না’। কিন্তু বাস্তবতা ছিল তার ঠিক উল্টো।
দুদকের এই বারবার ছন্দপতনকে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির ফসল হিসেবে দেখছে টিআইবি। নজরদারি সংস্থাগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার পুরনো প্রবণতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলো বের হতে পারছে না। ফলে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা যেমন কঠিন হচ্ছে, তেমনি বারবার নেতৃত্বের পরিবর্তন চলমান বড় বড় অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজের স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করছে। শেষ পর্যন্ত এই সংস্কৃতি রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী ফল বয়ে আনছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন
মঈনউদ্দীন কমিশনের পুরো মেয়াদজুড়েই দেখা গেছে এক ধরনের ‘কৌশলী নীরবতা’। বিভিন্ন মেগা প্রকল্প, নিয়োগ বাণিজ্য ও অর্থপাচারের বড় বড় কেলেঙ্কারি গণমাধ্যমে উঠে এলেও সংস্থাটিকে তেমন কোনো শক্ত পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। বরং রাঘববোয়ালদের পাশ কাটিয়ে চুনোপুঁটি ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ধরতেই বেশি ব্যস্ত ছিল পুরো কমিশন। সবচেয়ে বড় অভিযোগটি উঠেছে ‘দায়মুক্তি’ দেওয়া নিয়ে। জানা গেছে, তার আমলে প্রায় দুই শতাধিক আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কমিশন তার হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধারের একটি মরিয়া চেষ্টা চালায়। মাত্র তিন মাসের মধ্যে প্রায় দেড় শতাধিক মন্ত্রী, এমপি ও আমলার বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি করে অনুসন্ধান শুরু করা হয়। তবে এই ‘ভোল পাল্টানো’ পদক্ষেপে জনমনে আস্থা ফেরানো সম্ভব হয়নি। অবশেষে ৩০ অক্টোবর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দুপুর ২টার দিকে কোনো ধরনের আগাম ঘোষণা ছাড়াই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয় পুরো কমিশন। বিদায়বেলায়ও দেখা গেছে এক বিচিত্র চিত্র— চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন ও কমিশনার আছিয়া খাতুন প্রধান ফটক দিয়ে বের হলেও, অপর কমিশনার জহুরুল হক সংস্থাটির পেছনের ফায়ার সেফটির ‘লাল গেট’ দিয়ে একরকম পালিয়েই অফিস ত্যাগ করেন। তাদের এই নীরব ও নাটকীয় বিদায়ের মাধ্যমেই অবসান ঘটে দুদকের একটি বিতর্কিত মেয়াদের।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন : ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাল ধরেন সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি যখন দুদকে আসেন, তখন তার সামনে ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। তার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী এবং হাফিজ আহসান ফরিদ। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই কমিশন নিয়ে নানা গুঞ্জন থাকলেও, ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব পাওয়ার ১৫ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন তারা।
মোমেন কমিশনের ১৫ মাসের মেয়াদকাল ছিল মূলত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের রাঘববোয়ালদের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে কমিশনটি অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই স্বল্প সময়ে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১৫ হাজারেরও বেশি অভিযোগ জমা পড়েছিল। দুদকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এত ব্যাপক পরিসরে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। কমিশনের শক্ত পদক্ষেপে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভিআইপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আইনি জালে আটকা পড়েছে। এই তালিকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে বিগত সরকারের প্রায় সব প্রভাবশালী মন্ত্রী, সাবেক ক্ষমতাধর আমলা এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতিরা রয়েছেন।
মোমেন কমিশনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার কার্যক্রম। দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত অর্থপাচারকারী, ঋণখেলাপি এবং সরকারি অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে এই কমিশন। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে তিনশ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ জনস্বার্থে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করা ছিল কমিশনের অন্যতম বড় অর্জন।
অনিশ্চয়তার মুখে দুদক : ছন্দপতন নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?
মোমেন কমিশনের এই আকস্মিক বিদায়কে কেবল সাধারণ পদত্যাগ হিসেবে দেখছেন না দুদকের খোদ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংস্থাটির একজন সিনিয়র কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘মোমেন কমিশনের এই প্রস্থান কেবল নিছক পদত্যাগ নয়, বরং এটি দুদকের ইতিহাসে একই ঘটনার বারবার ফিরে আসার একটি নেতিবাচক নজির। এমন অস্থিতিশীলতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ, যখনই নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটে, তখনই চলমান বড় বড় অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজের স্বাভাবিক গতি বা ছন্দপতন হয়।’
প্রশাসনিক এই অস্থিরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আইন অনুযায়ী দুদক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন বারবার এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়? স্বাধীনতার যে আইনি কাঠামো আমরা মুখে বলি, বাস্তবে কি তা টেকসই হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা আছে? আর এই গ্যারান্টিই বা দেবে কে?’
তিনি আরও মনে করেন, বারবার নেতৃত্বের এই পালাবদল দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। এখন দেখার বিষয়, নতুন যে কমিশন দায়িত্ব নেবে, তারা কতটুকু প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে সক্ষম হয়।
আরএম/জেডএস/এমএআর/