বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৬৮ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ লাখ টন তেলই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়; বাকি ৫ লাখ টন পেট্রোল ও অকটেন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। আমদানি করা তেলের মধ্যে ১৫ লাখ টন হলো অপরিশোধিত (ক্রুড অয়েল), যা মূলত হরমুজ প্রণালি হয়ে বাংলাদেশে আসে।
বিজ্ঞাপন
বাকি ৪৭ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি অন্যান্য দেশ থেকে আনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ডিজেল, জেট ফুয়েল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল ও মেরিন ফুয়েল।
হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২২ শতাংশই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই রুটটি বন্ধ থাকায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। যদিও আজ (১ এপ্রিল) বাংলাদেশি কিছু জাহাজকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে ইরান। এই সংকটের মুখে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে এখন আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজার ওপরও জোর দিচ্ছে সরকার।
কোন জ্বালানি কতটুকু আমদানি হয়?
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ সাধারণত অপরিশোধিত (ক্রুড অয়েল) ও পরিশোধিত— এই দুই ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। আমদানি করা অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে শোধন করে ডিজেল, জেট ফুয়েল, ফার্নেস অয়েল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিন উৎপাদন করা হয়।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকাংশেই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। দেশের বার্ষিক চাহিদার প্রায় ২২ শতাংশ জ্বালানি তেল এই রুট দিয়ে আমদানি করা হয়। সৌদি আরব ও দুবাই থেকে আসা ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল এই প্রণালি হয়েই বাংলাদেশে পৌঁছায়। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই রুটটি বন্ধ থাকায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে ইরানের ইতিবাচক বার্তার ফলে অল্প পরিসরে তেল আসলেও ভবিষ্যৎ সরবরাহ ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা এখনও রয়ে গেছে
বিগত অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ১৫ লাখ ১০ হাজার ৯৪৪ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। বাংলাদেশ মূলত দুটি দেশ থেকে এই তেল সংগ্রহ করে থাকে— সৌদি আরব ও দুবাই। এর মধ্যে সৌদি আরবের ‘সৌদি আরামকো’ থেকে ৭ লাখ ৯৮ হাজার ৯৩৩ টন এবং দুবাইয়ের ‘আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি’ থেকে ৭ লাখ ১২ হাজার ৬১১ টন ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন

এই দুটি দেশের তেলই হরমুজ প্রণালি হয়ে বাংলাদেশে আসে।
অন্যদিকে, পরিশোধিত বা রিফাইনড তেল মূলত আটটি দেশ থেকে আমদানি করা হয়। বিপিসি মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং, চীনের পেট্রোচায়না ও ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর, দুবাইয়ের এমিরাটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি, ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকো যাপিন, থাইল্যান্ডের পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি ও ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন, সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়া ও সিনোচেন ইন্টারন্যাশনাল এবং ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড থেকে এই তেল সংগ্রহ করা হয়।
বিগত অর্থবছরের আমদানির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিপিসি ৩৩ লাখ ৪২ হাজার ১৪ টন ডিজেল, ৫ লাখ ৫২ হাজার ৩৮৭ টন জেট ফুয়েল, ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩ টন অকটেন, ৫ লাখ ৯১ হাজার ৩৬২ টন ফার্নেস অয়েল এবং ১৩ হাজার ৯৪২ টন মেরিন ফুয়েল আমদানি করেছে।
ভূ-রাজনৈতিক কারণে মধ্যপ্রাচ্যে ঘন ঘন তৈরি হওয়া অস্থিরতা বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সৌদি আরবের ‘রাস তানুরা’ শোধনাগারে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কড়া নজরদারি সরবরাহ ব্যবস্থায় ধাক্কা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা কেবল একটি রুটের ওপর নির্ভর না করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত বিকল্প উৎস খোঁজার ওপর জোর দিচ্ছেন। সংকট দীর্ঘায়িত হলে ইন্দোনেশিয়া বা এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর জন্য সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা অত্যন্ত জরুরি
গত বছরের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরেও বিপিসি ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা যথারীতি সৌদি আরব ও দুবাই থেকেই আসবে।

সরবরাহ ঝুঁকি কতটা?
বাংলাদেশ সৌদি আরবের যে শোধনাগার থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে, সেই ‘রাস তানুরা’ শোধনাগারে গত ২ মার্চ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার পর শোধনাগারটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে সৌদি আরব।
সাধারণত অপরিশোধিত তেলবাহী আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে বাংলাদেশে পৌঁছাতে ‘হরমুজ প্রণালি’ পার হতে হয়। কিন্তু বর্তমানে ওই অঞ্চলে ইরানের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও নজরদারি বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে তেল সরবরাহ নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও গত ১০ মার্চ ইরান আশ্বস্ত করেছে যে, বাংলাদেশি তেলবাহী জাহাজে তারা কোনো বাধা দেবে না।
ভূ-রাজনৈতিক কারণে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায়ই সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিশ্বের তেল উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বা সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো বিপাকে পড়ে। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা কেবল হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভর না করে তেল সরবরাহ নিশ্চিতে বিকল্প উৎসে জোর দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার ফলে বাংলাদেশ তেল সরবরাহে একটি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে আমাদের ইন্দোনেশিয়া বা এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে তেল আমদানির পরিমাণ বাড়াতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের অবশ্যই একটি বিকল্প উৎস পরিকল্পনা থাকা উচিত।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির (BPC) এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ইরানের ইতিবাচক বার্তার কারণে বাংলাদেশ আপাতত বড় কোনো ঝুঁকিতে নেই। বর্তমানে ওই রুট দিয়ে অল্প পরিসরে জ্বালানি তেল আসছে। তবে এই যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ওএফএ/এমএআর/
