‘চ্যালেঞ্জ’ হয়ে উঠছে হাসপাতালে সংক্রমণ, বিএমইউয়ে কন্ট্রোল কমিটি

চিকিৎসা নিতে এসে যেন কেউ নতুন সংক্রমণে না আক্রান্ত হয়— এটাই আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার ন্যূনতম শর্ত। কিন্তু বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে হাসপাতালে অর্জিত সংক্রমণ (নোসোকোমিয়াল ইনফেকশন) এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। এ ধরনের সংক্রমণ প্রতিরোধে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) এবার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে। গঠিত হয়েছে শক্তিশালী ইনফেকশন কন্ট্রোল কমিটি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে রাখা হয়েছে আলাদা বরাদ্দ, আর শুরু হয়েছে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।
সোমবার (৩০ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এ’ব্লক অডিটোরিয়ামে নোসোকোমিয়াল ইনফেকশনের বর্তমান প্রবণতা ও প্রতিরোধ কৌশল নিয়ে আয়োজিত সেন্ট্রাল সেমিনারে এসব তথ্য জানান বিএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম।
সেমিনারের প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য বলেন, রোগী চিকিৎসা নিতে এসে ইনফেকশনে আক্রান্ত হবে—এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিএমইউ প্রশাসন এই বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ইনফেকশন কন্ট্রোলকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করতে ইতোমধ্যে কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং নতুন অর্থবছরের বাজেটে আলাদা অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই লড়াইয়ে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে ক্লিনার পর্যন্ত—সবার সমান ভূমিকা রয়েছে। প্রতিরোধই একমাত্র পথ এবং এজন্য জনসচেতনতা, প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত অডিট ও মনিটরিং চালু করতে হবে।
উপাচার্য জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন সংক্রমণ প্রতিরোধে যেকোনো গবেষণা ও প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সংক্রমণ প্রতিরোধের বিষয়টি চিকিৎসার মান উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন— উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার, মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. শামীম আহমেদ এবং রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম। সেমিনার আয়োজন করে সেন্ট্রাল সেমিনার সাব কমিটি এবং সভাপতিত্ব করেন কমিটির চেয়ারপারসন অধ্যাপক ডা. আফজালুন নেছা। সঞ্চালনা করেন ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. খালেদ মাহবুব মোর্শেদ মামুন।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন- এ্যানেসথেশিয়া, এনালজেশিয়া অ্যান্ড ইনটেসিভ কেয়ার বিভাগের অধ্যাপক ডা. মন্তোষ কুমার মণ্ডল। তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না, বরং রোগীকে করে তোলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট। এতে ইনফেকশন হলে কার্যকর ওষুধই পাওয়া যায় না, রোগীর মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তিনি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ প্রোগ্রাম চালু করার ওপর জোর দেন এবং বলেন, এটা এখন নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।
মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহেদা আনোয়ার বলেন, হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য হ্যান্ড হাইজিন, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) সহজলভ্যতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্টেরিলাইজেশন এবং পরিবেশগত নজরদারি—এই সবগুলো বিষয়কেই সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে একটি আইপিসি (ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল) টিম গঠন করা হয়েছে, যারা নিয়মিত নীতিমালা প্রণয়ন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের টিকাদান কার্যক্রম চালাবে।
ডা. শাহেদা আনোয়ার বলেন, আইপিসি কার্যক্রম বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও শক্তিশালী নেতৃত্ব ও সুশৃঙ্খল নীতি অনুসরণ করে তা অতিক্রম করা সম্ভব। প্রয়োজনে আইপিসি বিষয়ক আরও গবেষণা বাড়াতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নোসোকোমিয়াল ইনফেকশন এমন এক ধরনের সংক্রমণ যা হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি হওয়ার পর রোগীর শরীরে প্রবেশ করে। এটি রোগীর পূর্ব-বিদ্যমান রোগের অংশ নয় এবং অনেক সময় রোগী ছাড়পত্র পাওয়ার পরও এই সংক্রমণের শিকার হন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি ১০ জন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে অন্তত একজন কোনো না কোনো ইনফেকশনে আক্রান্ত হন, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য।
টিআই/এমএন