২০৫০ সালের আগেই জরায়ুমুখ ক্যান্সার নির্মূল সম্ভব

জরায়ুমুখের ক্যান্সার নির্মূলে বাংলাদেশে প্রয়োজন কেবল চিকিৎসা অবকাঠামো নয়, বরং একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন- এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তাদের মতে, বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে সন্তান ধারণ, ধূমপান ও চিকিৎসা পেতে দীর্ঘসূত্রতা এই রোগ নির্মূলের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। এসব বিষয়ে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে প্রতিরোধযোগ্য এই ক্যান্সারে আরও বহু নারী অকারণে প্রাণ হারাবেন।
জরায়ুমুখের ক্যান্সার সচেতনতা দিবস উপলক্ষ্যে শনিবার (১০ জানুয়ারি) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব মত উঠে আসে। পরে ‘জননীর জন্য পদযাত্রা’র মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়।
আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী কোনো রোগে আক্রান্তের হার যদি প্রতি এক লাখে চারজনের নিচে নামিয়ে আনা যায়, তবে সেটিকে ‘এলিমিনেশন’ বা নির্মূল বলা যায়। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনটি বিষয় একসঙ্গে বাস্তবায়ন জরুরি—ভ্যাকসিনেশন, স্ক্রিনিং এবং সময়মতো চিকিৎসা।
তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কৌশল অনুযায়ী ১০ বছর বয়সি বা পঞ্চম শ্রেণির অন্তত ৯০ শতাংশ কিশোরীকে এইচপিভি টিকার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ৩৫ ও ৪৫ বছর বয়সে অন্তত ৭০ শতাংশ নারীর এইচপিভি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে স্ক্রিনিং নিশ্চিত করতে হবে এবং আক্রান্তদের অন্তত ৯০ শতাংশের সঠিক চিকিৎসা দিতে হবে।
দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অধ্যাপক হাবিবুল্লাহ তালুকদার বলেন, বর্তমানে একজন ক্যান্সার রোগীকে রেডিওথেরাপির জন্য ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তিনি বলেন, যে দেশ সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাক্ষর করেছে, সেখানে যদি একজন রোগীকে এক বছর পরের তারিখ দেওয়া হয়, তাহলে সেটাকে এক ধরনের গণহত্যা বললেও ভুল হবে না।
আলোচনায় গাইনাকোলোজিক্যাল অনকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি ও কমিউনিটি অনকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের ট্রাস্টি ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ডা. সাবেরা খাতুন বলেন, সঠিক পরিকল্পনা ও সম্মিলিত উদ্যোগ নিলে ২০৫০ সালের অনেক আগেই বাংলাদেশকে জরায়ুমুখ ক্যান্সারমুক্ত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, গবেষণার হিসেবে হয়ত ২০৫০ বা ২০৫২ সাল বলা হচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারি, তাহলে তার আগেই এই ক্যান্সারকে সমাজ থেকে সরিয়ে ফেলতে পারব।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনে কেবল হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। সচেতনতাকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে।
অধ্যাপক সাবেরা খাতুন জানান, দেশে বর্তমানে গড় বিবাহের বয়স ১৬ বছর এবং প্রথম সন্তান নেওয়ার গড় বয়স ১৯ বছর—যা জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া পুরুষদের ধূমপানের কারণে নারীদের পরোক্ষ ক্ষতি, বাল্যবিবাহ এবং দীর্ঘদিন জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবনের বিরূপ প্রভাব নিয়েও সমাজকে সচেতন করতে হবে।
ভ্যাকসিনেশনের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার বর্তমানে ১০ বছর বয়সী বা পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রীদের বিনামূল্যে এইচপিভি ভ্যাকসিন দিচ্ছে, যা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে ১১ থেকে ২০ বছর বয়সি বিপুলসংখ্যক কিশোরী এই কর্মসূচির বাইরে রয়ে যাচ্ছে। এই বয়সসীমার মেয়েদের ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা ও এনজিওগুলোকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
চিকিৎসা সংকটের দিকটি তুলে ধরে অধ্যাপক সাবেরা খাতুন বলেন, জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত ১০০ জন রোগীর মধ্যে মাত্র ৩০ জনের অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়। বাকি ৭০ শতাংশ রোগীর জন্য রেডিওথেরাপি অপরিহার্য হলেও দেশে এই সেবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। তিনি বলেন, রেডিওথেরাপির সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আন্দোলন দরকার। শুধু চিকিৎসক নয়, যারা সামাজিকভাবে কাজ করেন—সবারই এই দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরতে হবে।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান ড. হালিদা হানুম আখতার। প্রধান আলোচক ছিলেন কমিউনিটি অনকোলজি সেন্টার ট্রাস্টের চেয়ারপারসন অধ্যাপক সারিয়া তাসনিম।
আলোচনা সভা শেষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে ‘জননীর জন্য পদযাত্রা’ শুরু হয়ে মগবাজার চৌরাস্তা পর্যন্ত যায়। এতে অংশগ্রহণকারীরা জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধ, স্ক্রিনিং ও সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করেন। কর্মসূচির আয়োজন করে কমিউনিটি অনকোলজি সেন্টার ট্রাস্ট ও ওয়ার্ল্ড ক্যান্সার সোসাইটি, বাংলাদেশ।
টিআই/এমএন