৬৪ জেলায় জরায়ুমুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিং সেবা সম্প্রসারণের ঘোষণা

জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে দেশের ৬৪ জেলায় স্ক্রিনিং সেবা সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হালিদা হানুম আখতার। তিনি বলেন, সময়মতো স্ক্রিনিং ও ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা গেলে এই ক্যান্সার পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু নারীদের নয়, পরিবারের পুরুষ সদস্যদেরও সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবে জরায়ুমুখ ক্যান্সার সচেতনতা দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। পরে ‘জননীর জন্য পদযাত্রা’ কর্মসূচির মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়।
ড. হালিদা হানুম আখতার বলেন, নারীদের অঙ্গভিত্তিক ক্যান্সারের মধ্যে ব্রেস্ট ক্যান্সারের পর জরায়ুমুখ ক্যান্সারই সবচেয়ে বেশি আশঙ্কাজনক। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এটি এমন একটি ক্যান্সার যা সচেতনতা, স্ক্রিনিং এবং টিকার মাধ্যমে আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। এই সুযোগ কাজে না লাগাতে পারলে তা হবে আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতা।
জরায়ুর গঠন ও রোগের ঝুঁকি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, জরায়ু দেখতে উল্টানো কলসির মতো, যার মুখটি নিচের দিকে থাকে। এই জরায়ুমুখ শরীরের অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি স্থানে অবস্থিত—এর পেছনে পায়খানার রাস্তা এবং সামনে প্রস্রাবের রাস্তা। ফলে জরায়ুমুখে ক্যান্সার হলে খুব দ্রুত আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে এবং রোগীর অবস্থা জটিল হয়ে ওঠে।
রোগের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি বলেন, মাসিকের সময় ছাড়াও অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ এবং মেনোপজের পর আবার রক্তক্ষরণ শুরু হওয়া জরায়ুমুখ ক্যান্সারের বড়ো সতর্ক সংকেত। তরুণ প্রজন্মকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এসব তথ্য যেন তারা তাদের মা, খালা, ফুফু, দাদি-নানিদের সঙ্গে শেয়ার করে এবং প্রয়োজনে স্ক্রিনিংয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করে।
পরিবারে পুরুষদের ভূমিকার ওপর জোর দিয়ে ড. হালিদা বলেন, আমাদের সমাজে সাধারণত আর্থিক সিদ্ধান্ত পুরুষদের হাতেই থাকে। অনেক নারী জানেন না কোথায় স্ক্রিনিং করাতে হবে বা খরচ কত। ফলে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা যদি সচেতন না হন, তাহলে নারীদের পক্ষে সময়মতো পরীক্ষা করানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে পুরুষদেরও সমানভাবে সচেতন ও সহযোগী হতে হবে।
রেড ক্রিসেন্টের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সারা দেশে ৬৮টি ইউনিট রয়েছে—এর মধ্যে ৬৪টি জেলা এবং ৪টি বিভাগীয় ইউনিট। পাশাপাশি রয়েছে ৬৪টি মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে ধাপে ধাপে ‘ভায়া’ টেস্টসহ প্রাথমিক স্ক্রিনিং সেবা চালু করা হবে। একই সঙ্গে রেড ক্রিসেন্টের বিপুলসংখ্যক তরুণ ভলান্টিয়ারকে সচেতনতা কার্যক্রমে যুক্ত করে তথ্যের বাহক হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
তিনি আরও বলেন, জরায়ুমুখ ক্যান্সারের একটি বড়ো সুবিধা হলো— এর কার্যকর টিকা রয়েছে, যা ১২ বছর বয়স থেকেই দেওয়া সম্ভব। যেখানে ব্রেস্ট ক্যান্সারের কোনো টিকা নেই, সেখানে এই সুযোগ নারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি তিনি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান। তার মতে, একটানা পাঁচ বছরের বেশি ইস্ট্রোজেনযুক্ত বড়ি সেবনে ক্যান্সারের ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনার বিকল্প পদ্ধতি কিংবা প্রয়োজনে পুরুষ সঙ্গীর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে।
ড. হালিদা হানুম আখতার বলেন, কেবল সাময়িক সচেতনতা কর্মসূচি নয়, জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে একটি টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, আমার লক্ষ্য হলো রোগ যেন না হয়। রোগী যেন রোগ নিয়ে ডাক্তারের কাছে কম আসে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, গণমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
টিআই/জেডএস