ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টদের বাদ দিয়ে রিপোর্ট স্বাক্ষর নীতি ‘বৈষম্যমূলক’

প্যাথলজি রিপোর্টে স্বাক্ষর করার ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টদের বাদ দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জারি করা নতুন নির্দেশনাকে ‘বৈষম্যমূলক ও অবৈজ্ঞানিক’ বলে আখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট (বিএসিবি)।
এই নির্দেশনা আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বাতিল বা সংশোধনের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। অন্যথায় দেশের ডায়াগনস্টিক ল্যাব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকটের পাশাপাশি রোগীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ও আশঙ্কার কথা জানান সংগঠনটির নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিএসিবির আহ্বায়ক মো. মাহবুবুর রহমান।
লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) গত ৫ জানুয়ারি এবং ৭ জানুয়ারি (সংশোধিত) প্যাথলজি ল্যাব সংক্রান্ত একটি জরুরি নির্দেশনা জারি করেন। ওই নির্দেশনার ৫ নম্বর ইস্যুতে বলা হয়েছে– প্যাথলজি রিপোর্টে স্বাক্ষরকারীকে অবশ্যই বিএমডিসি নিবন্ধিত মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে।
বিএসিবি বলছে, এই সিদ্ধান্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ল্যাবরেটরি বাস্তবতার পরিপন্থী।
মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশে হিস্টোপ্যাথলজিস্ট, হেমাটোলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট এবং মেডিকেল ও নন-মেডিকেল ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টরা নিজ নিজ বিশেষজ্ঞ ক্ষেত্র অনুযায়ী রিপোর্টে স্বাক্ষর করে আসছেন। এটি একটি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় চর্চা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পেশাগত মানদণ্ড। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ ভারত ও শ্রীলঙ্কাতেও চিকিৎসকদের পাশাপাশি বায়োকেমিস্ট ও ল্যাব বিশেষজ্ঞরা রিপোর্টে স্বাক্ষর করে থাকেন। নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে এই অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের কার্যত অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে, যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য গভীর হুমকি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত পাঁচ দশক ধরে আধুনিক ল্যাবরেটরি সেবার বিকাশে ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। টেস্ট মেথড ভ্যালিডেশন, ইন্টারনাল কোয়ালিটি কন্ট্রোল (আইকিউসি), এক্সটারনাল কোয়ালিটি অ্যাসেসমেন্ট (ইকিউএএস) এবং ল্যাব অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থায় তাঁদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এমনকি করোনা মহামারির সময় সারা দেশে ডিএনএ ও পিসিআর ল্যাব পরিচালনায় তাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। বক্তারা উল্লেখ করেন, সরকার আইন করেই মলিকুলার বায়োলজি ও গামকা ল্যাবরেটরিতে বায়োকেমিস্টদের স্বীকৃতি দিয়েছে, যা বর্তমান নির্দেশনার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
বিএসিবি নেতারা স্পষ্ট করেন, তারা চিকিৎসকদের ল্যাব কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করছেন না। বরং চিকিৎসক ও বায়োকেমিস্টদের সমন্বিত অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। নির্দেশনাটি কার্যকর হলে দেশে নিবন্ধিত প্রায় ২৬ হাজার প্যাথলজি ল্যাবের বড় অংশের বায়োকেমিস্ট্রি ও ইমিউনোলজি বিভাগ অচল হয়ে পড়বে, কারণ এগুলো মূলত নন-মেডিকেল ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এর ফলে রিপোর্ট ডেলিভারিতে মারাত্মক বিলম্ব হবে এবং নির্ভুলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আইনগত দিক তুলে ধরে বক্তারা বলেন, প্রাইভেট ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২ অনুযায়ী ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টদের অধিকার বাতিলের কোনো বিধান নেই। বিএসিবির পক্ষ থেকে ৫ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে– নির্দেশনার ৫ নম্বর ইস্যু বাতিল, বায়োকেমিস্টদের স্বাক্ষর করার অধিকার বহাল, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন এবং ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টদের জন্য পৃথক কাউন্সিল গঠন।
সংবাদ সম্মেলনে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই নির্দেশনা বাতিল বা সংশোধন না হলে দেশের ডায়াগনস্টিক ল্যাব ব্যবস্থা এক গভীর সংকটে পড়বে। উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য কর্তৃপক্ষকেই দায় নিতে হবে এবং প্রয়োজনে সর্বাত্মক আন্দোলনে নামার ঘোষণা দেন সংগঠনটির নেতারা।
টিআই/বিআরইউ