ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ কতটা সম্ভব?

ইরানের চলমান তীব্র বিক্ষোভে অংশ নেওয়া লোকজনের ওপর সহিংস দমন-পীড়ন চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত দুই সপ্তাহে বার বার এই হুমকি দিয়েছেন। বুধবার সন্ধ্যার মধ্যেই কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কিছু সদস্যকে অন্যত্র চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা এবং ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া নিয়ে আশঙ্কা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির প্রতিবাদে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। এরপর ধীরে ধীরে সেই বিক্ষোভ ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ইরানের ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হয়েছে। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে ট্রাম্প লিখেছেন, সাহায্য ‘পথে রয়েছে’। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই পোস্টে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আসন্ন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে যদি সত্যিই ইরানে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কী কী বিকল্প রয়েছে এবং সেগুলো কতটা বাস্তবসম্মত?
• ট্রাম্প কী বলেছেন?
মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘‘ইরানি দেশপ্রেমিকরা, বিক্ষোভ চালিয়ে যান, আপনারা প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নিন!!! খুনী ও নির্যাতনকারীদের নাম সংরক্ষণ করুন। তাদের বড় মাশুল দিতে হবে। বিক্ষোভকারীদের অর্থহীন হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব বৈঠক বাতিল করেছি। সহায়তা পথেই আছে। মিগা!!! প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প।’’
পোস্টে ‘মিগা’ বলতে ‘মেইক ইরান গ্রেট এগেইন’ বোঝানো হয়েছে; যা ট্রাম্পের ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানের অনুকরণ।
এই ‘সহায়তা’ কী ধরনের হবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত কোনও তথ্য দেননি। তবে গত ২ জানুয়ারি ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সহিংস উপায়ে হত্যা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। তিনি লেখেন, আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং যেকোনও সময় এগোতে প্রস্তুত রয়েছি।
• কী বলছে ট্রাম্প প্রশাসন?
সোমবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কূটনীতি ইরানের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের প্রথম পছন্দ হলেও প্রয়োজনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে দ্বিধা করবেন না।
লেভিট বলেন, আকাশপথে হামলা কমান্ডার-ইন-চিফের সামনে থাকা বহু বিকল্পের একটি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পই দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে বলেছেন, তেহরানের রাস্তায় মানুষ হত্যা দেখতে চান না তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটাই এখন দেখা যাচ্ছে।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রসঙ্গে লেভিট বলেন, এটা ইরানের চেয়ে ভালো কেউ জানে না।
২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার পর ১৩ জুন থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত ওই যুদ্ধ চলে। তবে এখনকার পরিস্থিতি গত বছরের জুনের মতো নয়। এরপর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমেছে।
• কেন কমেছে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি?
বিশ্বের সবচেয়ে বড় মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড গত ২৪ জুন ভার্জিনিয়ার নরফোক ছেড়ে ভূমধ্যসাগরে পারি জমায়। এর মাধ্যমে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ব্যাপক জোরদার করা হয়।
তবে বর্তমানে ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডের (সাউথকম) আওতায় ‘অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ারের’ অংশ হিসেবে ক্যারিবীয় অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে। নভেম্বর থেকে লাতিন আমেরিকার উপকূলে অভিযান পরিচালনা করছে সাউথকম।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, এই অভিযান লাতিন আমেরিকায় মাদক সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যারিবীয় সাগরে ভেনেজুয়েলার নৌযানে অন্তত ৩০ বার হামলা চালানো হয়েছে। যদিও মাদক বহনের অভিযোগের পক্ষে কোনও প্রমাণ দেয়নি মার্কিন বাহিনী।
গত ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো তুলে নিয়ে যায়। ট্রাম্প প্রশাসন তাকে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। নিউইয়র্কে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক পাচারের অভিযোগের বিচার চলছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড যদি ঘণ্টায় গড়ে ২০ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলে তাহলে ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে ভূমধ্যসাগরে যেতে প্রায় ১০ দিন লাগতে পারে।
সিএসআইএস বলছে, সেখান থেকে পারস্য উপসাগর ও ইরানের উপকূলে পৌঁছাতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। আল-জাজিরার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সম্পাদক অ্যালেক্স গ্যাটোপোলাস বলেছেন, সুয়েজ খাল পেরোতে হলে সময় আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, আমি মনে করি না তারা এটিকে ইরানের এত কাছে নিয়ে যাবে। কারণ এতে ইরানের জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালে চলে আসবে এই রণতরী। জেরাল্ড ফোর্ড ছাড়াও ভূমধ্যসাগর থেকে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্ট্রাইক গ্রুপের জাহাজগুলোও ক্যারিবীয় সাগরে সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আঘাত হানার সক্ষমতা গত জুনের তুলনায় বর্তমানে অনেক কম।
গত বছরের মার্চে ইরান ও হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে উত্তেজনার মাঝে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা জোরদার করে যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট সেন্টকম এলাকায় পাঠানো হয়। তবে গত ৩০ অক্টোবর ওই ইউনিটটির সামরিক রসদ বৃদ্ধির জন্য আবারও দক্ষিণ কোরিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
• মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কী সামরিক উপস্থিতি আছে?
যুদ্ধজাহাজ সরিয়ে নেওয়া হলেও মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়ী ও অস্থায়ী অন্তত ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এখনও রয়েছে। গত জুন থেকে এখন পর্যন্ত এ অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
এর মধ্যে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, বুধবারের মধ্যে কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি থেকে কিছু মার্কিন সেনাকে সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। তবে এর কারণ স্পষ্ট নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় এই মার্কিন ঘাঁটিতে ১০ হাজার সৈন্য রয়েছে। গত বছরের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান এই ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল।
মার্কিন এক কূটনীতিক বলেছেন, এটি একটি অবস্থানগত পরিবর্তন; আনুষ্ঠানিক সরিয়ে নেওয়া নয়। এর আগে, মার্কিন বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান থেকে অন্তত দুটি ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় ১৪টি ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা ফেলেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের এখনও এই ধরনের হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে।
• ইরানের নেতৃত্বকে কি লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে?
অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য-এশিয়াবিষয়ক রাজনীতির অধ্যাপক শাহরাম আকবরজাদেহ আল-জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প স্বল্পমেয়াদি, দ্রুত এবং মার্কিন সৈন্যদের জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পছন্দ করেন।
ভেনেজুয়েলা থেকে মাদুরোকে অপহরণ এবং ২০২০ সালে বাগদাদে ড্রোন হামলায় আইআরজিসির কুদস ফোর্স প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার উদাহরণ দেন এই অধ্যাপক। গত জুনে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছিলেন, আমরা জানি তথাকথিত ‘সর্বোচ্চ নেতা’ কোথায় লুকিয়ে আছেন। পোস্টে তিনি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কথা বলেন।
তিনি লেখেন, খামেনি সহজ লক্ষ্য, কিন্তু আপাতত নিরাপদ। আমরা এখনই তাকে হত্যা করব না। তবে আমরা চাই না বেসামরিক মানুষ বা মার্কিন সেনাদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হোক। আমাদের ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে।
আকবরজাদেহ বলেন, সর্বোচ্চ নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনা থাকলে ট্রাম্পকে অনিবার্য প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তার মতে, সর্বোচ্চ নেতাকে অপসারণ করা হলে ক্ষমতার শূন্যতায় আইআরজিসিই সবচেয়ে সম্ভাব্য শক্তি হিসেবে দেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে; যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ইরান হয়তো প্রকাশ্য সামরিক শাসনে চলে যাবে, যা বর্তমান ধর্মীয় নেতৃত্বের চেয়েও ওয়াশিংটনের প্রতি বেশি বৈরী হবে।
• স্থল হামলা কি সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইরানে সেনা পাঠানো একেবারে অসম্ভব। আকবরজাদেহ বলেন, ট্রাম্প রাষ্ট্র গঠনকারী নন। তিনি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অঙ্গীকারে বিশ্বাস করেন না। আফগানিস্তান থেকে তিনি সরে এসেছেন। তাই ইরানে স্থল সেনা পাঠানো তার জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে।
ট্রাম্পের শাসনামলে আফগানিস্তানে ২০০১ সালে শুরু হওয়া দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ।
২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবান কাতারের দোহায় একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ২০২১ সালে জো বাইডেনের শাসনামলে সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়।
সূত্র: আল-জাজিরা।
এসএস