লিবিয়ায় নারী অভিবাসীদের ধর্ষণ-নির্যাতনের অভিযোগ

উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ায় অবস্থানরত কন্যা শিশুসহ অন্যান্য নারী অভিবাসীরা হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণের মুখোমুখি হয়েছেন। এসব অভিবাসীর মানবাধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের বহনকারী বিভিন্ন ধরনের নৌযানকে লিবিয়ায় ফেরত পাঠানো স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিবিয়ায় অবস্থানরত কন্যাশিশু ও অন্যান্য অভিবাসীরা হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ কিংবা গৃহদাসত্বে নিপতিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে বৈশ্বিক এই সংস্থা।
২০১১ সালে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো-সমর্থিত আন্দোলনে তৎকালীন শাসক মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফির পতনের পর থেকে ব্যাপক অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হয়েছে লিবিয়া। উন্নত জীবনের আশায় সংঘাত ও দারিদ্র্য থেকে পালিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমাতে চাওয়া অভিবাসীদের জন্য ভূমধ্যসাগর পেরোনোর অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে দেশটি। ২০১৪ সাল থেকে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাতে দেশটি পশ্চিম ও পূর্ব দুই অংশে বিভক্ত রয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও এর সদস্যরাষ্ট্রগুলো অভিবাসীদের ঢল ঠেকাতে লিবিয়ার উপকূলরক্ষী বাহিনীকে সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। পাশাপাশি লিবিয়ার সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতেও অর্থায়ন করা হয়েছে। দেশটির কোস্টগার্ডের সদস্যরা সমুদ্রে উদ্ধার অভিবাসীদের আটক কেন্দ্রে ফিরিয়ে নেয়।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয় ও লিবিয়া সহায়তা মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে সক্রিয় বিভিন্ন অপরাধী পাচারচক্র প্রায়ই অভিবাসীদের ধরে নিয়ে যায় ও অপহরণ করে। আর এই অপরাধীদের সঙ্গে প্রায়ই লিবীয় কর্তৃপক্ষ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অপরাধী নেটওয়ার্কের যোগসূত্র রয়েছে।
জেনেভায় এক ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয়ের মুখপাত্র থামিন আল-খিতান বলেন, ‘‘তাদের পরিবার থেকে আলাদা ও গ্রেপ্তার করা হয় এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই, অনেক সময় বন্দুকের মুখে আটক কেন্দ্রে পাঠানো হয়; যা কার্যত স্বেচ্ছাচারী আটক।’’
তবে এই বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে জেনেভায় নিযুক্ত লিবিয়ার মিশন এবং ত্রিপোলিভিত্তিক জাতীয় ঐক্য সরকার তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স। এর আগে, অভিবাসীদের ওপর যেকোনও ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে লিবীয় কর্তৃপক্ষ।
ইউরোপীয় কমিশনের এক মুখপাত্রও মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক সাড়া দেননি। প্রতিবেদনটি আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ১৬টি দেশের প্রায় ১০০ জন অভিবাসী, আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি করেছে জাতিসংঘ। ওই অভিবাসীদের লিবিয়ার ভেতরে ও বাইরে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে পূর্ব লিবিয়ার তবরুকে একটি পাচারকেন্দ্রে ছয় সপ্তাহের বেশি আটক থাকা ইরিত্রীয় এক নারীর বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘আমি চাইতাম আমার মৃত্যু হোক। এটি ছিল নরকের মতো এক যাত্রা।’’
ওই নারী বলেন, ‘‘আটককেন্দ্রে বহু পুরুষ আমাকে বহুবার ধর্ষণ করেছে। ১৪ বছর বয়সী মেয়েরাও প্রতিদিন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। পরিবার মুক্তিপণ পরিশোধ করার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন।
প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিনা মজুরিতে বা পর্যাপ্ত খাবার ছাড়াই এক পুরুষকে কাজ করতে বাধ্য করার ঘটনা এবং মায়েদের কাছ থেকে কন্যাশিশুদের আলাদা করে নেওয়ার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।
জেনেভায় ব্রিফিংয়ে লিবিয়ায় জাতিসংঘ মিশনের মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিনিধি সুকি নাগরা বলেন, পুরুষরা নারীদের সঙ্গে অপমানজনক আচরণ করেছেন। যেমন, ধর্ষণের আগে তাদের অন্য নারী ও পুরুষ অভিবাসীদের সামনে কাপড় খুলতে বাধ্য করা, প্রকাশ্যে ধর্ষণ, নির্যাতন ও মারধর করা হয়।
সূত্র: রয়টার্স।
এসএস