ইরানের অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড ‘খার্গ দ্বীপ’ : মহাপ্রলয় কি সন্নিকটে?

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে যখন ইরানজুড়ে সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলার বৃষ্টি নামছিল, তখন একটি বিশেষ স্থান দৃশ্যত অক্ষত ছিল। অত্যন্ত ক্ষুদ্র আয়তন হওয়া সত্ত্বেও খার্গ দ্বীপ ইরানের অর্থনৈতিক জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত। দেশের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০% এই দ্বীপ দিয়েই সম্পন্ন হয়। যার অর্থ হলো— এখানে যেকোনো ধরনের হামলা বড় ধরনের সংঘাত বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
বিজ্ঞাপন
তবে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটির সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তা এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, তেল বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত সাইটগুলোতে কোনো আঘাত হানা হয়নি। কিন্তু ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া অব্যাহত রাখে, তবে তিনি ওই তেল স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালাবেন।
কেন এই দ্বীপটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
খার্গ দ্বীপ হলো একটি প্রবাল দ্বীপ, যা আয়তনে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন শহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এটি পারস্য উপসাগরে ইরানের উপকূল থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার (১৫ মাইল) দূরে অবস্থিত।
বিজ্ঞাপন
প্রায় প্রতিদিন ইরানের প্রধান তেলক্ষেত্রগুলো (আহভাজ, মারুন ও গাচসারান) থেকে লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে এই দ্বীপে আসে। কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণের কারণে ইরানিদের কাছে এটি ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ নামে পরিচিত।
পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ক্ষুদ্র খার্গ দ্বীপ ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। গভীর সমুদ্রের সুবিধা থাকায় বিশাল সুপারট্যাঙ্কারগুলো এখান থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ করে। সামরিক দিক থেকে এটি অত্যন্ত সুরক্ষিত হওয়ায় একে ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ বলা হয়। এই স্থাপনাটি ধ্বংস হওয়ার অর্থ হলো ইরানের অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ড ভেঙে পড়া
এর দীর্ঘ জেটিগুলো সমুদ্রের এমন গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত যেখানে বিশালকার অয়েল সুপারট্যাঙ্কারগুলো অনায়াসেই ভিড়তে পারে, যা এই দ্বীপটিকে তেল বিতরণের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত করেছে। ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই এখান থেকে সম্পন্ন হয়।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিন ধরে এই দ্বীপটি ইরানের অর্থনীতির মূল চাবিকাঠি। ১৯৮৪ সালের একটি সিআইএ (CIA) নথিতে বলা হয়েছিল, এই স্থাপনাগুলো ‘ইরানের তেল ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এগুলোর সচল থাকা ইরানের অর্থনৈতিক সচ্ছলতার জন্য অপরিহার্য।’ সম্প্রতি ইসরায়েলি বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেছেন যে, এই টার্মিনালটি ধ্বংস করলে ‘ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে যাবে এবং সরকারের পতন ঘটবে।’
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরান বিশ্ববাজারের প্রায় ৪.৫ শতাংশ তেল সরবরাহ করে। তারা প্রতিদিন ৩৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং আরও ১৩ লাখ ব্যারেল কনডেনসেট ও অন্যান্য তরল জ্বালানি উত্তোলন করে।

স্যাটেলাইট চিত্র ও তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান TankerTrackers.com-এর মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই দ্বীপে ‘বিরতিহীনভাবে’ ট্যাঙ্কারে তেল লোড করা হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে মার্কিন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক জেপি মরগানের (JP Morgan) একটি নোটের বরাত দিয়ে জানানো হয় যে, ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার আগের সপ্তাহগুলোতে খার্গ থেকে তেল রপ্তানি রেকর্ড মাত্রার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।
বর্তমানে খার্গ দ্বীপের তেল মজুত করার ক্ষমতা প্রায় তিন কোটি ব্যারেল। গ্লোবাল ট্রেড অ্যানালিস্ট কেপলার (Kpler)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেখানে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে।
খার্গ দ্বীপে আসলে কী ঘটেছে?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত শুক্রবার ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী এমন একটি অভিযান চালিয়েছে যাকে তিনি ‘মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী বিমান হামলা’ বলে অভিহিত করেছেন। এই হামলায় খার্গ দ্বীপের সামরিক সম্পদগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের নিজের সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ পোস্ট করা একটি ভিডিও সিএনএন (CNN) যাচাই করে নিশ্চিত করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে খার্গ দ্বীপের বিমানবন্দর এবং রানওয়েতে মার্কিন বাহিনী হামলা চালাচ্ছে।
সম্প্রতি মার্কিন বাহিনী দ্বীপটির বিমানবন্দর ও ক্ষেপণাস্ত্র বাঙ্কারের মতো সামরিক অবকাঠামোতে শক্তিশালী হামলা চালালেও সচেতনভাবে তেল স্থাপনাগুলো এড়িয়ে গেছে। মূলত খার্গ দ্বীপকে ‘জিম্মি’ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখতে বাধ্য করতে চাইছেন। তবে সংঘাত বাড়লে এই তেল স্থাপনাগুলোই হতে পারে পরবর্তী বিধ্বংসী লক্ষ্যবস্তু
একজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা সিএনএন-কে জানিয়েছেন, এই হামলাগুলো ছিল ‘বিশাল মাত্রার’, তবে দ্বীপের তেল অবকাঠামোতে (Oil Infrastructure) আঘাত করা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল নৌ-মাইন মজুত করার স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র বাঙ্কার এবং অন্যান্য সামরিক অবকাঠামো।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ফার্স (Fars) নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ইরান জানিয়েছে যে দ্বীপে ১৫টিরও বেশি বিস্ফোরণ রেকর্ড করা হয়েছে, তবে তেল সংক্রান্ত কোনো স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
যাই হোক, ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়েছেন যে— ইরান যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া অব্যাহত রাখে, তবে তিনি দ্বীপের তেল সম্পদগুলোতেও (Oil Assets) হামলা চালাবেন।
তেলের দামে কী প্রভাব পড়বে?
ইরানের সামরিক কমান্ড সদর দপ্তরের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তাদের তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে যেকোনো ধরনের হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর তেল কোম্পানিগুলোর ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হবে।

সাবেক এক সেনা কর্মকর্তা সিএনএন-কে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা যুদ্ধের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মার্ক কিমিট বলেন, “পরিস্থিতি এখন কেবল ‘সামরিক বাহিনী বা সরকারকে হটিয়ে দেওয়া’র মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এখন আমরা সম্ভবত এই দেশটির অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছি।”
কিমিট আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত এই দ্বীপটিকে ‘জিম্মি’ করে রেখেছে যাতে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে দিতে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য যে, এই প্রণালী বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় ইতোমধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।
কিমিটের মতে, যদি তেলের অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তবে ‘এটা স্পষ্ট যে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বাকি সব অবকাঠামোতেও হামলা চালাবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আর সেই মুহূর্তে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।’
কেপলার (Kpler)-এর জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক মুয়ু জু সিএনএন-কে বলেন, যদি খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনাগুলো আক্রান্ত হয়, তবে সেগুলো পুনর্গঠন করতে ইরানের কয়েক মাস, এমনকি এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। তিনি আরও জানান, ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা হিসেবে এই ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লাগবে চীনের ওপর।
খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ২০ শতাংশ কমে যেতে পারে, যা জ্বালানির দামকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে। এর ফলে প্রধান ক্রেতা চীনসহ সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। জবাবে ইরানও এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তেলক্ষেত্রে পাল্টা হামলার হুমকি দিয়ে রেখেছে, যা বড় যুদ্ধের ইঙ্গিত
মুয়ু জু আরও যোগ করেন, ‘ইরান এখনও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। তাদের পক্ষে পর্যাপ্ত তহবিল, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি এবং বিশেষজ্ঞের সহায়তা পাওয়া বেশ কঠিন হবে, ফলে পুনর্গঠন কাজ তাদের জন্য অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়বে।’
পরবর্তীতে কী ঘটতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই অঞ্চলের তেল অবকাঠামোতে হামলা চালানোর যে হুমকি দিয়েছিল, তা কার্যকর করার মাধ্যমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। ইতোমধ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ওমান ও বাহরাইনের তেল মজুত করার ট্যাঙ্কারে আঘাত হেনেছে এবং পারস্য উপসাগরে তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও মালবাহী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।

ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (IRGC) সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যদি ইরানের জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হয়, তবে তারা পুরো অঞ্চলের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে ‘আগুন ধরিয়ে দেবে’।
ঠিক এমন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেই খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলাটি চালানো হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ২,৫০০ জন মেরিন সেনা ও নাবিকের একটি ‘র্যাপিড রেসপন্স’ (দ্রুত মোতায়েনযোগ্য) ইউনিট পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মার্ক কিমিট এই বাহিনী কর্তৃক খার্গ দ্বীপ দখল করে নেওয়ার একটি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন।
এই মেরিন ইউনিটটি ঠিক কী কাজে বা কোথায় মোতায়েন করা হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে সাধারণত এই ধরনের ইউনিটগুলো বড় আকারের উদ্ধার অভিযান বা সমুদ্র থেকে স্থলে বিশেষ অভিযান (যেমন— অতর্কিত হামলা বা দখল) পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হয়।
অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খার্গ দ্বীপ দখল করা বা সেখানে আক্রমণ বজায় রাখার জন্য বিশাল এক পদাতিক বাহিনীর প্রয়োজন হবে— যা মোতায়েন করার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত কিছুটা দ্বিধাবোধ করছে।
সূত্র : সিএনএন।
এমএআর/