ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে ভূপাতিত মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত শুক্রবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অভিযান চালাতে গিয়ে দেশটির সামরিক বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন ওই ক্রু সদস্য। শনিবার রাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের ইতিহাসের ‘‘অন্যতম সাহসী অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান’’ পরিচালনা করে ওই ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করেছে।
বিজ্ঞাপন
এরপর রোববার সকালের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানে নিখোঁজ ক্রু সদস্যকে উদ্ধারের খবর নিশ্চিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ওই কর্মকর্তা বর্তমানে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুস্থ আছেন!
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে মার্কিন ওই ক্রু সদস্যকে উদ্ধারের রোমহর্ষক অভিযানের তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিমানটিতে দুজন ক্রু সদস্য ছিলেন এবং তারা উভয়েই বিমান থেকে প্যারাসুট নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। তাদের একজনকে আগেই মার্কিন বাহিনী উদ্ধার করে।
বিজ্ঞাপন
ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মার্কিন ওই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান এবং এটি কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখন প্রকাশ্যে আসছে। এই অভিযানের বিষয়ে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে তা নিচে তুলে ধরা হলো...
• কীভাবে ওই কর্মকর্তাকে উদ্ধার করা হলো?
দক্ষিণ ইরানে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর নিখোঁজ ক্রু সদস্যকে খুঁজে পেতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এক প্রকার প্রতিযোগিতায় নামে। মার্কিন এই উদ্ধার অভিযানের সঠিক পরিস্থিতি এখনও অস্পষ্ট। তবে অভিযানের বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি এটিকে দক্ষিণ ইরানে বিশাল কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (সিএসএআর) মিশন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিজ্ঞাপন
বিবিসি জানতে পেরেছে, উদ্ধার অভিযান চলাকালীন মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং বিমান থেকে ইজেক্ট করার সময় পাইলট আহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভূপাতিত বিমানের ক্রু সদস্যদের উদ্ধার করা মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং মিত্রদের জন্য অন্যতম জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ; যা কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (সিএসএআর) নামে পরিচিত। এই সিএসএআর মিশনের পেছনে থাকা বিমানবাহিনীর ইউনিটগুলোতে সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে উচ্চ শিক্ষিত এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যরা কাজ করেন।
এসব মিশন সাধারণত হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়; যা শত্রু ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে নিচু হয়ে উড়ে যায়। পাশাপাশি অন্যান্য সামরিক বিমান ওই এলাকায় হামলা চালায় এবং টহল দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, ওই পাইলট একজন কর্নেল। তিনি ইরানের দুর্গম পাহাড়ে শত্রু সীমানার ভেতর ছিলেন এবং আমাদের শত্রুরা তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল; যারা প্রতি ঘণ্টায় তার আরও কাছে চলে আসছিল।
মার্কিন এই প্রেসিডেন্ট বলেন, উদ্ধারের পরিকল্পনা করা ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তারা ২৪ ঘণ্টা ওই বৈমানিকের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ট্রাম্প বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে কয়েক ডজন বিমান পাঠিয়েছিল। কোনও মার্কিনির প্রাণহানি কিংবা আহত হওয়া ছাড়াই এই অভিযান সম্পন্ন হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বলেছে, নিখোঁজ পাইলটকে খোঁজার সময় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সৈন্যরা একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেন। দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন ড্রোনটি ইরানের দক্ষিণ ইসফাহান প্রদেশে বিধ্বস্ত হয়েছে বলে আইআরজিসির জনসংযোগ দপ্তর জানিয়েছে।
এর আগে ইরান বলেছিল, তেহরান নিখোঁজ আমেরিকান পাইলটকে জীবিত খুঁজে পেতে চায় এবং তাকে পেতে সাহায্য করার জন্য নাগরিকদের পুরস্কারের ঘোষণা দেয়। বিধ্বস্ত বিমানের ক্রু সদস্যরা এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন।
থিংক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের সামরিক বিশ্লেষণ বিষয়ক পরিচালক জেনিফার কাভানাঘ বিবিসিকে বলেন, এই ধরনের পরিস্থিতিতে পাইলটকের এক নম্বর অগ্রাধিকার হলো বেঁচে থাকা এবং বন্দিদশা এড়ানো।
তিনি বলেন, তাদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় যে, শারীরিকভাবে সক্ষম এবং নড়াচড়া করতে অক্ষম হওয়ার মতো গুরুতর আহত না হলে তারা যেন ইজেক্ট করার স্থান থেকে যত দ্রুত সম্ভব দূরে সরে যায় এবং নিজেদের নিরাপদ রাখার জন্য লুকিয়ে ফেলে।
কাভানাঘ বলেন, তারা টিকে থাকার কলাকৌশল সম্পর্কেও প্রশিক্ষিত; যাতে তারা খাবার বা পানি ছাড়াই চলতে পারে অথবা স্থানীয় ভূখণ্ড থেকে যতটা সম্ভব খাবার খুঁজে নিতে পারে।
• কখন এবং কোথায় বিমানটি ভূপাতিত হয়?
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গত শুক্রবার প্রথম দাবি করে, দেশটির সামরিক বাহিনী দক্ষিণাঞ্চলে একটি মার্কিন বিমান ভূপাতিত করেছে। এফ-১৫ বিমানটি ঠিক কোথায় ভূপাতিত হয়েছে তা নিশ্চিত করা হয়নি। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে কোহগিলুয়েহ ও বোয়ের-আহমাদ এবং খুজেস্তান; এই দুটি সম্ভাব্য প্রদেশের নাম জানানো হয়।
ভূপাতিত ওই বিমানে দুজন ক্রু সদস্য ছিলেন। বিমানের পাইলটকে আগের একটি অভিযানে উদ্ধার করা হয়। ওই অভিযানে একটি এ-১০ ওয়ারথগ বিমানও অংশ নিয়েছিল; যা উপসাগরের ওপর আক্রান্ত হয় এবং উদ্ধারের আগে এর পাইলট নিরাপদে বেরিয়ে আসেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম বলছে, এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান থেকে উদ্ধার পাইলটকে বহনকারী একটি হেলিকপ্টার ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে আক্রান্ত হয় এবং এতে বিমানের ক্রু সদস্যরা আহত হন। তবে সেটি নিরাপদে অবতরণ করতে সক্ষম হয়।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বলেছে, দেশটির পাহাড়ে বসবাসকারী যাযাবর উপজাতিরা দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারে গুলি চালিয়েছে; যা মার্কিন উদ্ধার অভিযানের অংশ ছিল।
বিবিসি ভেরিফাই শুক্রবারের একটি ভিডিও যাচাই-বাছাই করে দেখেছে। যেখানে দেখা যায়, অন্তত তিনজন সশস্ত্র ব্যক্তি দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারের দিকে গুলি ছুড়ছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা বলেছে, ইরানের শীর্ষ যৌথ সামরিক কমান্ড নতুন ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার কৃতিত্ব দিয়েছে। কোহগিলুয়েহ ও বোয়ের-আহমাদ অঞ্চলটি ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমের পার্বত্য প্রদেশ। এই প্রদেশে যাযাবরসহ ৭ লাখের বেশি মানুষের বসবাস রয়েছে।
প্রত্যন্ত উচ্চভূমিতে বন্য প্রাণী এবং চুরি থেকে তাদের পশুর পাল ও ক্যাম্প রক্ষা করার জন্য ওই এলাকার যাযাবররা রাইফেল বহন করে থাকেন। ইরানের তেল এবং অন্যান্য শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত খুজেস্তান প্রদেশ। সেখানে ৪৭ লাখের বেশি মানুষ বাস করেন। তাদের মধ্যে আরব, পার্সিয়ান, লোর এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জনগণ রয়েছে।
• বিমানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা জানা গেল
এফ-১৫ই বিমানটি আকাশ থেকে মাটি এবং আকাশ থেকে আকাশ—উভয় ধরনের মিশনের জন্য নকশা করা হয়েছে। সম্ভবত ইরানি ড্রোন এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার জন্য প্রতিরক্ষামূলক কাজে জড়িত ছিল মার্কিন এই যুদ্ধবিমান।
আকাশ থেকে ভূমিতে হামলার ক্ষেত্রে বিমানটি লেজার এবং জিপিএস চালিত নির্ভুল যুদ্ধাস্ত্রের পাশাপাশি অন্যান্য বোমা নিক্ষেপ করতে পারে। এই বিমানে দুজন ক্রু থাকেন।তাদের একজন পাইলট এবং অন্যজন পেছনের আসনের অস্ত্র ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা। অস্ত্র কর্মকর্তাকে ‘উইজো’ বলা হয়, তিনি লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন এবং অস্ত্রগুলো যথাযথ আক্রমণের জন্য প্রোগ্রাম করা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করেন।
যুদ্ধবিমানে এই দুই-ক্রু ব্যবস্থা কাজের চাপ ভাগাভাগি করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে পাইলট যখন শত্রুর হুমকি এড়িয়ে বিমান চালানোর চেষ্টা করেন, সেই সময় এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
ঠিক কী কারণে এই মার্কিন বিমানটি ভূপাতিত হয়েছে তা এখনও জানা যায়নি। তবে ইরানের সামরিক বাহিনী যদি এই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে থাকে, সেক্ষেত্রে এখানে সম্ভবত স্থল থেকে আকাশে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র কাজ করেছে।
সূত্র: বিবিসি।
এসএস
