হাঙ্গেরির জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অর্বান। এর মাধ্যমে ইউরোপের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত এই দেশটিতে অবসান হচ্ছে অর্বানের ১৬ বছরের শাসনামল।
বিজ্ঞাপন
গতকাল হাঙ্গেরির জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেছে দেশটির নির্বাচন কমিশন। সেই ফলাফল বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, নিজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী পিটার ম্যাগিয়ারের কাছে পরাজিত হয়েছেন অর্বান।
হাঙ্গেরির জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল ফিডেজ পার্টির প্রার্থী ছিলেন অর্বান; আর ম্যাগিয়ার ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থি রাজনৈতিক দল তিসজা পার্টির প্রার্থী।
১৯৬৩ সালে রাজধানী বুদাপেস্টের পশ্চিমাঞ্চলে একটি গ্রামে জন্ম নেওয়া অর্বান পড়াশোনা করেছেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে দেশে ফিরে আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন তিনি, পাশাপাশি ফুটবলও খেলতেন। এক সময় রাজনীতিতেও যোগ দেন অর্বান।
বিজ্ঞাপন
তিনি যখন রাজনীতিতে আসেন, সে সময় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শীতল যুদ্ধ চলছিল। ব্যাপকমাত্রায় কমিউনিস্টবিরোধী হওয়ায় রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই হাঙ্গেরির মার্কিন লবির রাজনীতিবিদ ছিলেন তিনি।
১৯৯৮ সালের প্রথমবারের মতো হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী হন অর্বান। সেসময় তার বয়স ছিল মাত্র ৩৫ বছর। তার প্রথম মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের নেৃতত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগ দেয় হাঙ্গেরি।
তবে এই সাফল্য সত্ত্বেও ২০০২ সালের নির্বাচনে পরাজিত হন অর্বান। টানা আট বছর বিরোধী দলে থাকার পর ২০১০ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ফের প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। তারপর থেকে গতকালের আগ পর্যন্ত টানা ১৬ বছর হাঙ্গেরির সরকারপ্রধান পদে ছিলেন অর্বান।
বিজ্ঞাপন
ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা
ভিক্টর অর্বান অভিবাসনবিরোধী নীতির কট্টর সমর্থক। মুসলিমদের প্রতি তার মনোভাবও বিরূপ। ২০১৫ সালে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যখন জোয়ারের মতো মুসলিম অভিবাসীরা ইউরোপে আসতে শুরু করেছিল, সে সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ইইউ জোটের সব রাষ্ট্রকে বাধ্যতামূলক অভিবাসীদের গ্রহণ করতে হবে। কোন রাষ্ট্র কতসংখ্যক অভিবাসী গ্রহণ করবে— তার কোটাও নির্দিষ্ট করেছিল ইইউ।
সে সময় ইইউ’র এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন অর্বান। এই সূত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। এখনও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক বজায় আছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশাপাশি ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, ফ্রান্সের অন্যতমী শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও সংসদীয় নেতা ম্যারিন লা পেন এবং জার্মানির নেত্রী অ্যালিস ওয়েইডেলের সঙ্গেও সুসম্পর্ক আছে অর্বানের। এরা প্রত্যেকেই কট্টরপন্থি এবং ব্যাপকভাবে অভিবাসনবিরোধী।
অর্বানের সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সেভাবে কখনও প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও অনেকে তাকে পুতিনের সমর্থক মনে করেন। কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তিনি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ছিলেন। ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ ইইউ’র অনেক অনুদান আটকে দিয়েছেন অর্বান।
পরাজয়ের কারণ
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, অর্বানের পরাজয়ের প্রধান কারণ হাঙ্গেরির অর্থনৈতিক দুরাবস্থা। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর হাঙ্গেরি মূল্যস্ফীতি শুরু হয় এবং বর্তমানে সেই মূল্যস্ফীতি তীব্র রূপ নিয়েছে। হাঙ্গেরি জনগণের জীবনযাত্রাও দিন দিন কষ্টকর হয়ে উঠছে, কারণ মজুরি-বেতন বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। হাঙ্গেরিতে মজুরি-বেতন ইইউভুক্ত ২৭টি দেশের মধ্যে তৃতীয় সর্বনিম্ন।
হাঙ্গেরির তরুণ প্রজন্ম তাই এবার অর্বানকে ভোট দেয়নি। তরুণদের কাছে যে অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছেন, তা নিজেও বুঝতে পেরেছেন তিনি। নির্বাচনের ফলাফল জানানোর পর এক প্রতিক্রিয়ায় হাঙ্গেরির সাবেক িএই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “আমি জানি যে তরুণ প্রজন্ম তাদের অভিভাবদের বিপক্ষে গেছে। এটা ভবিষ্যতে দেশে রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি করতে পারে।”
সূত্র : রয়টার্স
এসএমডব্লিউ
