চানখারপুল মামলার রায় নিয়ে যা বললেন চিফ প্রসিকিউটর

চব্বিশের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখারপুলে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রসিকিউশন। সাজা বাড়াতে আপিলে যাবেন বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দুপুরে রায় ঘোষণার পর প্রেস ব্রিফিংয়ে একথা জানান তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে চানখারপুল এলাকায় মুক্তিকামী ছাত্রজনতা যখন অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা করে পুলিশ। এ ঘটনার মামলা হয়েছিল। আসামিদের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। এতে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া যারা সরাসরি গুলিবর্ষণ করেছিলেন, যাদের গুলি চালাতে ভিডিওতে দেখা গেছে, যাদের নামে অস্ত্র ইস্যু ছিল না রাইফেল নিয়ে গুলি করেছেন; তাদের কম সাজা দেওয়া হয়েছে। একজনকে ছয় বছর, একজন চার বছর, বাকি তিন কনস্টেবলকে তিন বছর করে সাজা দিয়েছেন আদালত। আমরা মনে করি এ সাজা ন্যায়সংগত হয়নি। যদিও আদালতের আদেশ সবার ওপরই শিরোধার্য। তাই আমাদের মানতে হবে। যেহেতু আপিল বিভাগ রয়েছে, সেহেতু এ কম সাজার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আমরা আপিল করবো। তবে পুরোপুরি রায় পাওয়ার পর আরও পর্যালোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেবো।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে যেভাবে আমাদের তাজা তরুণরা জীবন দিয়েছেন এবং যারা সরাসরি গুলি চালিয়েছেন; তাদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর সাজা অল্প হওয়াটা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে আমরা মনে করছি। এ কারণে মনে করছি যে এটা আপিল করা প্রয়োজন। আমরা আপিল হয়তো করবো। কিন্তু বাকি তিনজনকে যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তা যথার্থ হয়েছে বলে মনে করি।
পাঁচজনেরই মৃত্যুদণ্ড চাইবেন; সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তাজুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রত্যেকের মৃত্যুদণ্ডই চাইবো। কারণ জুলাই অভ্যুত্থানে হাজার হাজার রাউন্ড বুলেট নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ১৪০০ শহীদ ও হাজারও মানুষ আহত হয়েছেন। সেখানে কার গুলিতে কে মারা গিয়েছে সেটা প্রমাণ করা মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই। আর সেটা প্রমাণিত না হওয়ার কারণে কেউ সাজা থেকে রেহাই পেতে পারে না। এটা হলো আইনের বিধান, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতি। সুতরাং আমরা মনে করছি এটা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে যাচ্ছে না। সে কারণেই আমরা আপিল করবো। কিন্তু তাদের অপরাধ যে প্রমাণিত হয়েছে এবং তা মানবতাবিরোধী-এ প্রসঙ্গে আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন তা সঠিক আছে। শুধুমাত্র সেনটেনসিংয়ের (দণ্ড নির্ধারণ) ব্যাপারে আমরা মনে করি সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া উচিত। সেখান থেকে এটা সেটেল হওয়া উচিত যে সরাসরি গুলি বর্ষণের পরও এই সেনটেনসিং থাকা উচিত কি না।
সুজনকে কেন তিন বছরের সাজা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আদালত এটা বলেছেন যে সুজন গুলি করেছে। উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। সবকিছুই আদালত বলেছেন যেটা প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পেরেছে। এক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু আদালত বলেছেন তারা কনস্টেবল ছিলেন। সুপিরিয়ররা তাদের কমান্ড করেছেন, তারা করতে বাধ্য হয়েছেন। এসব বিবেচনায় তাকে কম শাস্তি দিয়েছেন। যেটার ব্যাপারে আমাদের আপত্তি। তবে যারা সুপিরিয়র ছিলেন, তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে তারা সুপিরিয়র কমান্ডার ছিলেন। তাদের দায়িত্ব ছিল অধস্তনদের থামানো বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। তারা সেটা করেননি। উল্টো আদেশ দিয়েছেন। এজন্যই তাদের কমান্ড রেসপনসিবিলিটিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল আইনে কম সাজা দেওয়ার সুযোগ আছে কি না; এ নিয়ে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের আইন অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণিত হলে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড বা অন্য কোনো সাজা দিতে পারবেন। সুতরাং প্রথম শব্দটা ছিল মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু অপরাধ বিবেচনায় সাজা যথার্থ হলো কিনা সেটাই বিবেচ্য বিষয়। এ জায়গায় আমরা বলছি যথোপযুক্ত হয়নি। তাই আপিলের কথা ভাবছি। তবে আইন অনুযায়ী রায়ের ৩০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর আপিলের সুযোগ নেই।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এদিন দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম।
এছাড়া রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছর, শাহবাগ থানার তৎকালীন পরিদর্শক (অপারেশন) মো. আরশাদ হোসেনকে চার বছর এবং কনস্টেবল মো. সুজন, মো. ইমাজ হোসেন ইমন ও মো. নাসিরুল ইসলামের তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এর মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন আরশাদ, সুজন, ইমন ও নাসিরুল। হাবিব, আখতারুল, সুদীপ ও ইমরুল এখনও পলাতক।
এমআরআর/জেডএস