ছেলের মাথায় হাত বুলাতে গিয়ে আঙুল ঢুকে যায় গুলির ক্ষতে

ছেলে সিফাতকে নিয়ে বাজার করতে বেরিয়েছিলেন কামাল হাওলাদার। থমথমে পরিবেশে দোকানপাট বন্ধ থাকায় কেনা হলো না কিছুই। সিগারেট কিনতে কয়েক কদম দূরে যান বাবা। এ ফাঁকে সহপাঠীদের সঙ্গে ছাত্রদের মিছিলে দাঁড়ান ছেলে। হঠাৎ গুলির শব্দে কামাল দৌড়ে গিয়ে দেখেন- গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছে সিফাত। রক্তমাখা শরীরে শেষবারের মতো ছেলেকে কোলে তুলে নেন তিনি। ফিরতে হয় নিথর দেহ নিয়ে।
জুলাই অভ্যুত্থানে ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন ৫২ বছর বয়সী কামাল। চব্বিশের জুলাই-আগস্টে কারফিউ দিয়ে গণহত্যায় উসকানিসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে প্রথম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ ছিল রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি)। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে সিফাতের বাবার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
জবানবন্দিতে কামাল হাওলাদার বলেন, আমি শহীদ সিফাতের বাবা। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই দুপুর ১টা ১০ মিনিটে কাঁচাবাজার করার উদ্দেশে মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বরে আসি আমরা। ওই সময় চারদিকে দোকানপাট বন্ধ ছিল। পাশে থাকা ছোট টং দোকানে সিগারেট কিনতে যাই আমি। আমার ছেলে মিরপুর-১০ নম্বরে আন্দোলনরত ছাত্রদের মিছিলে যোগ দেয়। সিগারেট হাতে নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে দেখি তিনদিক থেকে তিনটি মিছিল আসছিল। উত্তর দিক থেকে একটি মিছিল আসে। একটিতে এমপি নিখিল ছিলেন। তার হাতে অস্ত্রসহ অন্যদের হাতে অস্ত্র-লাঠি ছিল।
তিনি বলেন, একই দিক থেকে আরেকটি মিছিলে এমপি কামাল মজুমদারের ছেলেসহ অন্যরা ছিলেন। তারা গুলি করতে করতে ছাত্রদের দিকে আসেন। তৃতীয় মিছিলটি দক্ষিণ থেকে উত্তরে আসে। নেতৃত্বে ছিলেন মানিকগঞ্জ-১ আসনের এমপি এসএম জাহিদ ও জনি কমিশনার এবং তাদের লোকজন। তারাও গুলি করতে করতে আসছিলেন। তিনটি মিছিল তিন দিক থেকে ছাত্রদের ঘিরে ফেলা হয়। এ সময় আমি গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাই। হঠাৎ শুনতে পাই যে, সিফাত গুলি খাইছে। আমি দৌড়ে সেখানে যাই। দেখতে পাই আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছে। আরও একজন চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে জবাই করা মুরগির মতো ছটফট করছিল। তার চোখ বের হয়ে গেছে।
সিফাতের বাবা বলেন, আমি আমার ছেলেকে কোলে নেই। তার রক্তে আমার শরীর ভিজে যায়। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে গুলির অবস্থান খুঁজতে থাকি। এমন সময় গুলির ক্ষতস্থানে আমার দুই আঙুল ঢুকে যায়। একপর্যায়ে তার মুখে ফুঁ দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করি। ওই সময় ছেলেকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে পার্শ্ববর্তী জিয়া ভবনে নিয়ে যান জনি কমিশনার, রুহুল আমিন হাওলাদারসহ আওয়ামী লীগ নেতারা। পরে সবার অনুরোধে ছেলেকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনি। এরপর চোখে গুলিবিদ্ধ হওয়া ছেলেসহ সিফাতকে রিকশায় করে আল হেলাল হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে আমার ছেলের মাথায় ব্যান্ডেজ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ বা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন চিকিৎসকরা। পরে রিকশায় করে সোহরাওয়ার্দীতে নেই। সেখানে সিফাতকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন কামাল হাওলাদার।
সাক্ষী বলেন, মৃত ঘোষণার পর সিফাতকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে মিরপুর-১০ নম্বরে আমাদের বাসায় নিয়ে আসি। কিন্তু তাকে গোসল করাতে ও জানাজা পড়াতে দেননি আওয়ামী লীগ নেতারা। এরপর অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে গ্রামে নিয়ে জানাজা পড়িয়ে কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
কামাল বলেন, আমার ছেলেসহ শত শত হত্যার জন্য দায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের, আনিসুল-সালমানসহ অন্যান্যের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। সালমান-আনিসুলসহ অন্যদের পরামর্শে যদি কারফিউ জারি না করা হতো, তাহলে আমার ছেলেসহ অন্যরা নিহত হতো না।
এমআরআর/জেডএস