রাজধানীর সায়দাবাদে অনুমোদনহীন বাস কাউন্টারের উচ্ছেদ অভিযানে ট্রেড লাইসেন্স দেখিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে চ্যালেঞ্জ করেছেন একাধিক কাউন্টারের মালিকরা। রাতারাতি তারা কাউন্টারের নাম মুছে দিয়ে ভিন্ন ব্যবসা পরিচালনা করবেন জানিয়ে দোকান বন্ধের বৈধতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
বিজ্ঞাপন
কেউ বলছেন ফলের দোকান করবেন, কেউ আবার চায়ের দোকান করার কথা জানাচ্ছেন। ট্রেড লাইসেন্সও নেওয়া রয়েছে সেই অনুযায়ী। এমন অভিনব প্রতারণা ও দীর্ঘ সময় কথার মারপ্যাঁচে ফেলা হয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে। তবে, এখনো পর্যন্ত তাদের দোকানে কাউন্টারের সরঞ্জাম বিদ্যমান থাকায় সবগুলো কাউন্টারই শেষ পর্যন্ত সিলগালা করা হয়।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল ) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সংলগ্ন এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) পরিচালিত দ্বিতীয় দিনের মোবাইল কোর্ট অভিযানে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়।
ডিএসসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবু আছলামের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়।
বিজ্ঞাপন
আজ সকাল ১১টা থেকে সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সংলগ্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনার কথা থাকলেও সেটি শুরু হয় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে। অভিযান শুরু হয় রয়েল কোচের একটি কাউন্টার সিলগালা করার মধ্য দিয়ে৷ এরপর আরো কয়েকটি কাউন্টারে সিলগালা করার পর যখন 'হানিফ' ও 'ইউনিক' পরিবহনের দুটি কাউন্টারের সামনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পৌঁছান, ঠিক তখনই ওই কাউন্টার দুটি যাদের নামে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া রয়েছে তারা বাঁধা দিতে এগিয়ে আসেন।
শুরুতেই দোকান সিলগালা করতে বাঁধা দেন স্টার লিমন এন্টারপ্রাইজ নামে পরিবহন ব্যবসা করতে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া ব্যবসায়ী মো. লিটন মিয়া। তিনি নির্বাহী মেজিস্ট্রেটকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, আমি পরিবহন মালিক নই, আমি ব্যবসা করার জন্য ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছি। আপনারা গতকাল মাইকিং করে বলেছেন রাস্তার পাশে পরিবহনের টিকিট বিক্রি করা যাবে। ঠিক আছে, আমি আর টিকিটও বিক্রি করবো না। আমি দোকানের ব্যানারও খুলে নিয়েছি। এখন আমি এখানে ফলের দোকান দিবো। আমি সিটি কর্পোরেশনকে নিয়মিত ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে ফি দিয়ে আসছি। আপনি তো চাইলেই এখন আমার দোকানে তালা দিতে পারেন না। এটি তো আইন অনুযায়ী আপনি করতে পারেন না।
বিজ্ঞাপন
ওই ব্যবসায়ী আরও বলেন, আমার দোকান তো রাস্তার মধ্যে নেই। আপনি কেন আমার দোকানে তালা দেবেন? আপনারা বলেছেন এখানে টিকিট বিক্রির কাউন্টার করা যাবে না, ভালো কথা, আমরা আর টিকিট বিক্রি করবো না। কিন্তু অন্য ব্যবসা করতে তো আপনারা বাঁধা দিতে পারেন না। আমি তো আমার দোকান চুক্তিতে বাড়ির মালিকের থেকে ভাড়া নিয়েছি। এটার ভাড়া তো আমাকে বাস মালিকরা দেয় না। এটা আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তাহলে আমি কাউন্টার ব্যবসা না করলেও কেন আমার দোকানে তালা দেবেন?
চায়ের দোকান দেওয়ার কথা বলে আরেকজন ব্যবসায়ী সায়েদাবাদ এলাকায় ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে গতকাল পর্যন্ত কাউন্টার ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। আজ অভিযান শুরুর আগেই তিনি দোকানের ব্যানার ছিড়ে ফেলেছেন। ওই ব্যবসায়ীর কাউন্টারও সিলগালা করা হয়েছে। অভিযোগ করে তিনি বলেন, আমার দোকান চায়ের ব্যবসা করার জন্য ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে। এতদিন আমরা বিভিন্ন পরিবহনের টিকিট কাটার ব্যবসা করেছি। আমাদেরকে জানানো হয়েছে এখানে কাউন্টার থাকবে না। আমরা সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। আমাদের ব্যানার ছিড়ে ফেলে দিয়েছি। এখন চায়ের দোকান দেব। চায়ের দোকান দেয়ার কথা বলার পরও আমার দোকানে তালা দেয়া হয়েছে। এটি আমাদের প্রতি জুলুর করা হয়েছে।
ইউনিক পরিবহনের মহসিন নামের একজন ম্যানেজার বলেন, আমাদেরকে কাউন্টারের ভিতরে জায়গা না দিয়েই উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আমাদের হাজার হাজার কর্মী বেকার হয়ে যাবে। আগে সরকারের আমাদের কর্মীদের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে,পরে উচ্ছেদ করুক। বড় বড় পরিবহন গ্রুপের জন্য ভিতরে আমাদের জায়গা হয়না। আমাদের ইউনিটক পরিবহনের ১২০টি গাড়ি। ভেতরে কাউন্টার আছে একটা, সেখানে একটা বাস রাখার জায়গা আমরা পাই না। সরকার ভেতরে আমাদের পর্যাপ্ত জায়গার ব্যবস্থা করে দিক, তারপর আমরা ভেতরে যাবো।
অভিযান চলাকালীন সময়ে দোকানে সিলগালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার বিষয়টি জানতে চাইলে ডিএসসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবু আছলাম সাংবাদিকদের বলেন, এটি তাদের ব্যক্তিগত মতামত। কেউ চাইলে চ্যালেঞ্জ করতেই পারেন। তবে আইনের বাইরে উনিও যেতে পারবেন না, আমরাও যেতে পারি না। আইনের মধ্যে থেকেই তাদের কাউন্টার সিলগালা করা হয়েছে।
অভিযান পরিচালনা শেষে ব্রিফিংয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরও বলেন, রাস্তায় কাউন্টার থাকার জন্য মানুষের অনেক অসুবিধা হয়। সেজন্য সরকার উদ্যোগ নিয়েছে রাস্তার পাশে আর কোনো কাউন্টার থাকবে না। আমাদের সরকারি যে টার্মিটাল রয়েছে, সেই নির্ধারিত স্থান থেকেই যেন যাত্রীরা উঠা-নামা করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করতে আমরা এই অভিযানে নেমেছি।
তিনি বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত সায়েদাবাদ এলাকার ১০০-এর মতো কাউন্টারের সিলগালা করেছি। কাউকে কোনো জরিমানা করা হয়নি। আমরা আপাতত কাউন্টার সিলগালা করে দিচ্ছি। পরবর্তীতেও আমাদের মনিটরিং অব্যাহত থাকবে। কেউ যদি পুনরায় রাস্তার পাশে কাউন্টার পরিচালনা করতে চায়, তাহলে জরিমানাসহ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে যেহেতু এখানে তারা দোকান ভাড়া নিয়েছে, তারা চাইলে অন্য ব্যবসা করতে পারবেন।
এমএমএইচ/এমএসএ
